ইউটিউব, চ্যাটজিপিটি ও গুগল রিসার্চ করে মাশরুম চাষে সফল শ্রীমঙ্গলের তিন তরুণ

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪৮ পিএম

নিজের উপর আত্মবিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম, সাফল্যের জন্য প্রচন্ড জেদ ও ভাগ্যের ন্যূনতম সহায়তা থাকলে সফলতার তিলক ললাটে অঙ্কিত হয়েই হয়। যার প্রমাণ মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৩ নম্বর শ্রীমঙ্গল ইউনিয়নের পশ্চিম ভাড়াউড়া গ্রামের তিন তরুণ এমদাদুল হক মিলন, সাখাওয়াত হোসেন ও মো. তানিম মিয়া। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে মাত্র অর্ধ লক্ষাধিক টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করা মাত্র ২৭০ বর্গফুটের একটি ঘরই এখন তিন তরুণকে ইস্পিত সফলতার স্বপ্ন দেখাচ্ছে।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুরে মৌলভীবাজার জেলা সদর থেকে প্রায় ২৩ কিলোমিটার এবং শ্রীমঙ্গল শহর থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দুরে অবস্থিত পশ্চিম ভাড়াউড়া গ্রামের মাশরুম চাষের জন্য নির্মিত টিনের ঘরে প্রবেশ করে দেখা যায় দুইপ্রান্তে দুই সারিতে ঝুলে রয়েছে অনেকগুলো মাশরুমের পলিব্যাগ। উদ্যোক্তারা জানান, মাত্র ৫০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে একটি ২৭০ বর্গফুটের ঘরে তাঁরা চলতি বছরের এপ্রিল মাস থেকে শুরু করেছেন অয়েস্টার মাশরুম চাষ। 

Mushroom

এর মধ্যে উদ্যোক্তা এমদাদুল হক মিলন (২৪) মৌলভীবাজার সরকারি কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এবং মো. সাখাওয়াত হোসেন (২৫) শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করে এবং মো. তানিম মিয়া (২৪) অস্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেঅর্থনৈতিক কারনে আর শিক্ষাজীবন চালু রাখতে ব্যর্থ হন। তারা সরকারি-বেসরকারি চাকরির আশা না করে পরিবারের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনয়নে কোন ধরণের প্রশিক্ষণ গ্রহণ ছাড়াই শুধুমাত্র ইউটিউব, চ্যাটজিপিটি ও গুগল রিসার্চ করে শুরু করেছেন মাশরুমের চাষ। 

শুরুতে তাদের পরিকল্পনা ছিল গরু ও ছাগলের খামার করার। কিন্তু গরু-ছাগলের খামার করতে অনেক পুঁজি লাগে, যা সংগ্রহ করা তাদের বা তাদের পরিবারের পক্ষে সম্ভবপর নয়। পরে তাদের এক স্যারের পরামর্শে তারা মাশরুম চাষাবাদে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তবে মাশরুম চাষের অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ কোনটাই তাদের ছিল না। কিন্তু এই তিন তরুণ দমে যাবারও পাত্র নন। ইউটিউব, চ্যাটজিপিটি ও গুগল রিসার্চ করে তারা মাশরুম চাষের আদ্যোপ্রান্ত জেনে নেন এবং একটি টিনের ঘর প্রস্তুত করেন। শ্রীমঙ্গলের উষ্ণ আবহাওয়ায় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ইউটিউব দেখে ওই ঘরে লাগানো হয় বায়ু নিষ্কাশন পাখা বা এডজাস্ট ফ্যান এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানি ছিটানোর যন্ত্র। ওই ঘরটির লাইন, ফ্যান, পানির যন্ত্র সবগুলোই নিয়ন্ত্রণ করা যায় মোবাইল এপসের মাধ্যমে।

 ইতোমধ্যে প্রকল্প থেকে মাশরুম বিক্রিও শুরু করেছেন তারা। ব্যাপক সাড়াও পাচ্ছেন। বাজারে প্রতি কেজি মাশরুম পাইকারি বিক্রি করছেন ৪০০ টাকা করে। সরজমিনে পরিদর্শনকালে এলাকার তরুণ হাসান বলেন, ‘আমার জীবনে এই প্রথমবার মাশরুম চাষ দেখলাম। আমার খুবই ভালো লেগেছে। আমিও একটা এরকম কিছু একটা করার ট্রাই করমু। আর তাদের এই প্রজেক্টটা মোটামুটি ভালোই। আমাদের এলাকায় নতুন একটা কিছু চাষ করা ওর, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি ওর। এটা আশা করি সবার লাগি বেটার।’ 

দৈনিক দেশ রূপান্তরের সাতে আলাপকালে তরুণ উদ্যোক্তা মো. তানিম মিয়া বলেন, ‘প্রচন্ড গরমের কারণে আমরার উৎপাদনটা একটু কমতাছে। যদি গভর্মেন্ট থেকে আমরারে একটু সহযোগিতা করা হয় এবং কুলিং সিস্টেম করা যায় তাহলে আমরা আরো বেশিভাবে উৎপাদন করতে পারব। আর অনেক বেকার আছে, তাদেরকেও আমরা একটা কাজের একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারব। বেকারত্ব দূর করতে পারব।’

তরুণ উদ্যোক্তা সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমরার এইদিকে মাশরুম চাষের পরিকল্পনা প্রথমে ছিল না। আমরার প্রথম পরিকল্পনা ছিল যে আমরা গরুর খামার আর ছাগলের খামার দিব। তো বিগ বাজেটের কারণে আমরা এই পরিকল্পনা নিয়ে সামনের দিকে যাইতে পারি নাই। কারণ এটাতে মোটা অঙ্কের একটা বাজেট লাগে। পরে আমরা আমাদের একজন স্যার আছে সেই স্যারের সাথে যোগাযোগ করলাম। স্যারে কইলো যে স্বল্পমূল্যে যদি তোমরা ছুটমোট একটা বাজেটে শুরু করতে চাও তাইলে তোমরা মাশরুমের দিক দিয়ে একটু ট্রাই করতে পারো। স্যারের কথা শুনে আমরা এই নিয়া ইউটিউবে, চ্যাটজিপিটি তারপরে গুগলের রিসার্চ করি। এসব নিয়া রিসার্চ করার পরে আমরা দেখি যে না ঠিক আছে এটা খুবই লাভজনক। আর এটার বাজেটও খুবই কম। খুবই কম বাজেট থাকার কারণে আমরা এটা শুরু করছিলাম। শুরুতে আমরার প্রায় এখন পর্যন্ত ৫০ হাজার প্লাস টাকা খরচ হইছে। আর আমরার সেলটা মোটামুটি অনেক ভালো। আমরা অনেক রেসপন্স পাইতাছি। এটার ফলন করতে গেলে সেলের সমস্যা হয়। তবে সেলের বিষয়টা আমরার খুবই ভালো। আমরা অনেক ভালো রেসপন্স পাইতাছি অর্ডারের।’ 

তিন তরুণের স্বপ্নের মাশরুম প্রকল্পের বিষয়ে দৈনিক দেশ রূপান্তরের সাথে আলাপকালে শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘মাশরুম এক ধরনের ছত্রাক। এর অধিকাংশ প্রজাতি ব্যাসিডিওমাইকোটা এবং কিছু প্রজাতি অ্যাসকোমাইকোটার অন্তর্ভুক্ত। অন্যান্য সবুজ উদ্ভিদের মতো সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে খাদ্য তৈরি করতে মাশরুমের সূর্যের আলোর প্রয়োজন হয় না। মাশরুম চাষে শ্রীমঙ্গলের তিন তরুণের আগ্রহ খুবই ইতিবাচক বলে আমরা মনে করছি। তবে সঠিক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান নিয়ে মাশরুম চাষে উদ্বুব্ধ হলে এ খাতে ভালো করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। আমরা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে ওই তিন তরুণকে সাধুবাদ জানাই। তাদের খামার পরিদর্শন করেছি। তাদেরকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সরকারি কোন সহযোগিতার সুযোগ হলে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তিন তরুণের এই প্রকল্পকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হবে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত