গাঙচিলের কথা

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪৫ এএম

ঊনত্রিশ বছর আগের ঘটনা। ১৯৯৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার পুরান বাউশিয়ায় গ্রামের বাড়ি এসেছি। গ্রামের শেষ প্রান্তে মেঘনার শাখা নদী পাড়ে হাইস্কুল। এই শাখা নদীটিকে লোকজন ‘ময়নারকান্দির গাং’ বলে ডাকে। গিয়েছিলাম ক্যামেরা হাতে। স্কুলের ঘাট থেকে একটি নৌকা নিয়ে ঘণ্টা দুয়েক গাঙয়ে ঘুরেছিলাম। রৌদ্রোজ্জ্বল সকালে গাঙয়ে পাখিদের সঙ্গে চমৎকার সময় কেটেছিল। ওখানে যত পাখি দেখেছিলাম তার মধ্যে বড় দস্যু ঈগল, ছোট পানকৌড়ি, বদরকৈতর ও মাথায় জুলফিযুক্ত এক প্রজাতির গাঙচিলের কথাই মনে আছে। ১৯ বছর পর ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে রাজশাহীর পদ্মার চরে জুলফিযুক্ত পাখিগুলোকে ওদের প্রজনন পালকে দেখেছিলাম।

২০১৯ সালের পহেলা নভেম্বর সকালে মুন্সীগঞ্জের কালিপুরা চর, মেঘনার মোহনা ও নামা পদ্মায় জলচর পাখি পর্যবেক্ষণের জন্য আমরা কয়েকজন চিতলিয়া নদী দিয়ে রওনা হলাম। ইঞ্জিন নৌকা প্রায় পনেরো মিনিট চলার পর কালিপুরা চরের কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম। নদীর মধ্যে কয়েকটি স্থানে বেশ কিছু বাঁশ পোঁতা ছিল। পোঁতা বাঁশের ওপর আড়াআড়িভাবে আরও কিছু বাঁশ বাঁধা। এ রকম প্রায় পাঁচ থেকে ছয়টি স্থানে বাঁশ পোঁতা দেখলাম। সম্ভবত জেলেরা মাছ ধরার জন্য এই ব্যবস্থা করেছে। বাঁশের স্থাপনাগুলো পার হয়ে কিছুটা সামনে এগিয়ে যেতেই লক্ষ্য করলাম পেছনের একটা স্থাপনায় বাঁশের ওপর বেশ কিছু ছোট সাদাটে পাখি বসে আছে। মাঝিকে দ্রুত নৌকা ঘোরাতে বললাম। সবাই যার যার লম্বা লেন্সযুক্ত ক্যামেরা নিয়ে প্রস্তুত। নৌকা বাঁশগুলোর কাছাকাছি যেতেই সবগুলো ক্যামেরার শাটার একসঙ্গে গর্জে উঠল! এই গর্জন চলল প্রায় সতেরো মিনিট। বাঁশের ওপর বসা পাখিগুলোকে চিনতে একটু ও সমস্যা হলো না। কারণ এগুলো ছিল আমার গ্রামের গাঙয়ে দেখা সেই একই প্রজাতির পাখি।

সবশেষ পাখিগুলোকে দেখলাম দুই বছর আগে ২০২৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ছোট নডি নামে আলাভোলা নতুন একটি পাখির খোঁজে কক্সবাজার গিয়ে। প্রথমে বাঁকখালী নদীর মোহনায়, এরপর তাজিয়াকাটায় ও সবশেষে সোনাদিয়া দ্বীপপুঞ্জের বেলেকেরদিয়া চরে পাখিগুলোর কিছু চমৎকার ছবি তুললাম। 

আমার গ্রাম, রাজশাহী, মুন্সীগঞ্জ ও সোনাদিয়ায় দেখা এই পাখিটি হলো এ দেশের বহুল দৃশ্যমান ও স্বল্প ঝুঁকিসম্পন্ন পরিযায়ী পাখি ফোকদাহরি গাংচিল। দরিয়ার চিল, দইরালির চিল, ফোকদাহরি পানিপায়রা বা গাঙচিল নামেও পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গে বলে ঢেঁকচিল। ইংরেজি নাম Whiskered Tern। বৈজ্ঞানিক নাম Chlidonias hybrida| । ভারতীয় উপমহাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ, আফ্রিকা, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ায় পাখিটির বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে।

প্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহের দৈর্ঘ্য ২৩-২৯ সেন্টিমিটার ও প্রসারিত ডানা ৬৪-৭০ সেন্টিমিটার। ওজন ৬০-১০০ গ্রাম। প্রজননকাল বাদে অন্য সময় মাথা বাদে পুরো দেহের পালক ফ্যাকাশে ধূসর। মাথার চাঁদি সাদা, তার ওপর কালো ডোরা। কান-ঢাকনির কালো পট্টি মাথার চাঁদির পেছন পর্যন্ত চলে গেছে। ডানার বাইরের প্রান্ত-পালক কালচে। ঠোঁট ও পা কালচে। প্রজনন মৌসুমে পিঠ, কোমর ও লেজ রূপালি-ধূসর হয়। দেহের নিচটা হয় কালচে-ধূসর। মাথার টুপি কালো ও গাল হয় সাদা। চোখ কালচে ধূসরাভ-বাদামি বর্ণ ধারণ করে। ঠোঁট হয় কালচে-লাল। পা ও পায়ের পাতা হয় প্রবাল লাল। নখ হয় কালো। স্ত্রী ও পুরুষের চেহারা অভিন্ন। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির কাঁধ-ঢাকনি, পিঠ ও ডানা-ঢাকনি বাদামি; এ ছাড়া চিবুকে গাঢ় ছোপ থাকে। 

ফোকদাহরি গাঙচিল সারা দেশের উপকূলীয় এলাকাসহ সব লোনা ও স্বাদুপানির জলাভূমিতে ছোট বা বড় ঝাঁকে বিচরণ করে। জলচর ও আকাশচারী পাখিগুলো পানির ওপর দিয়ে উড়ে উড়ে ছোঁ মেরে মাছ, কাঁকড়া, ব্যাঙাচি, ফড়িং, জলজ কীটপতঙ্গ ইত্যাদি ধরে খায়। খাবারের জন্য অনেক সময় জেলে নৌকার পিছু নেয়। তীক্ষè কণ্ঠে ‘ক্রিইপ ---’ শব্দে ডাকে।

মে থেকে আগস্ট প্রজননকাল। এ সময় এরা নিজ আবাস এলাকার স্বাদুপানির জলাভূমিতে ভাসমান উদ্ভিদের ওপর জলজ আগাছা ও উদ্ভিদ দ্রব্য স্তূপ করে বাসা বানায়। ডিম পাড়ে দুই থেকে-তিনটি। ডিমের রঙ গাঢ় ছিট ছোপসহ বাদামি বা সাগর-সবুজ। ডিম ফোটে ১৮-২১ দিনে। বাসা বানানো, ডিমে তা দেয়া ও ছানাদের লালনপালন স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে করে। ডিম থেকে ফোটার তিন থেকে আট দিনের মধ্যে ছানারা বাসা ছাড়ে। প্রায় ২০ দিনে দেহের পুরো পালক গজায়। আয়ুষ্কাল প্রায় দশ বছর।

লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত