অবরোধ-সংঘাতে পর্যটকশূন্য সাজেক, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪৬ এএম

রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক এখন পর্যটকশূন্য। সড়ক অবরোধকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ ও পর্যটকদের আটকে পড়ার ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি স্থবির হয়ে পড়েছে পর্যটন ব্যবসা। গত বৃহস্পতিবার নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় প্রায় ৩ হাজার পর্যটককে সাজেক থেকে খাগড়াছড়ি সদরে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ থাকায় রিসোর্ট-কটেজ, জিপ, পরিবহন ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। নভেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া পর্যটনের ভরা মৌসুমের আগে এ পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগের সুফল পাওয়া নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন উদ্যোক্তারা।

সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-সন্তু লারমা) সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়াসহ বিভিন্ন দাবিতে গত ১১ অক্টোবর থেকে সড়ক অবরোধের কর্মসূচি পালন করে আসছে। দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত রাখা হলেও দাবি পূরণ না হওয়ার অভিযোগে ২২ অক্টোবর থেকে আবারও অবরোধ শুরু হয়। এতে সাজেকের সঙ্গে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা হয়ে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়। পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে জেলা প্রশাসন সাজেক ভ্যালিতে পর্যটকদের যাতায়াত সাময়িকভাবে বন্ধ রাখে।

সাজেক পর্যটন কেন্দ্র বন্ধের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গতকাল শুক্রবার বিকেলে খাগড়াছড়িতে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, পরিবহন মালিক, চালক ও স্থানীয়রা। তারা বলেছেন, পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকায় পর্যটননির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে। তারা পর্যটন খাত রক্ষা, স্থানীয় মানুষের জীবিকা সুরক্ষা এবং পর্যটন কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ কামনা করেন।

গত বৃহস্পতিবার পর্যটকদের ফিরিয়ে নেওয়ার সময় উজো বাজার এলাকায় অবরোধকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, পর্যটকদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী ও পুলিশের টহল দল অবরোধকারীদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেয়। আলোচনা চলাকালে অবরোধকারীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। পরে বেলা ১১টার দিকে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে ৩০ থেকে ৪০ রাউন্ড গুলি ছোড়েন বলে আইএসপিআরের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। এ সময় সেনাবাহিনী আত্মরক্ষা ও পর্যটকদের নিরাপত্তায় পাল্টা গুলি চালায়। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বিত প্রচেষ্টায় পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে জানায় আইএসপিআর। এ ধরনের সহিংসতা পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও জননিরাপত্তার পাশাপাশি পর্যটনশিল্প এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকায় বিরূপ প্রভাব ফেলছে বলে উল্লেখ করা হয় বিবৃতিতে।

গতকাল শুক্রবার সাজেক সড়কে অবরোধ অব্যাহত থাকলেও অবরোধকারীদের অবস্থান দেখা যায়নি। তবে যান চলাচল বন্ধ ছিল। রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাজেকের বিভিন্ন পয়েন্টে টহল দিচ্ছে। সাজেকের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

এদিকে অবরোধকারীদের ওপর হামলা, লাঠিচার্জ এবং ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরের প্রতিবাদে আজ শনিবার সকাল ৫টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় সড়ক ও নৌপথে আধাবেলা অবরোধের ডাক দিয়েছে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ।

সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির সহ-সাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা বলেন, অবরোধের কারণে পর্যটকদের সাজেক ছেড়ে যেতে হয়েছে। অনেকে আগাম বুকিং বাতিল করেছেন। এতে ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী কেনাকাটা ও উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারজাত করতেও ভোগান্তি হচ্ছে।

সাজেক পরিবহন কাউন্টারের ব্যবস্থাপক মো. আরিফ জানান, প্রতিদিন কমপক্ষে ১০০ থেকে ১৫০টি পর্যটকবাহী জিপ সাজেকের উদ্দেশে যাত্রা করত। পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ থাকায় এসব গাড়ির চালক ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। পর্যটনকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল রেস্তোরাঁ, খাবারের দোকান, স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং অন্যান্য সেবামূলক কর্মকা-েও এর প্রভাব পড়ছে।

সাজেক কটেজ মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা জন বলেন, অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে সাজেকের সুনাম ক্ষুণœ হচ্ছে। মানুষের মধ্যে সাজেক নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হলে পর্যটক কমে যাবে। এতে সাজেকের ওপর নির্ভরশীল অসংখ্য মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং অনেকের কর্মসংস্থানও হুমকির মুখে পড়বে।

তিনি বলেন, প্রশাসনের উচিত স্থানীয় ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে সমন্বয় করে সাজেকের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা। কারণ বছরের এই সময়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩ হাজার পর্যটক সাজেক ভ্রমণ করেন।

রাহুল চাকমা জনের হিসাবে, খাগড়াছড়ি থেকে সাজেকে যাতায়াত, থাকা ও খাওয়াসহ একজন পর্যটকের পেছনে গড়ে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা খরচ হয়। সে হিসাবে পর্যটন বন্ধ থাকায় প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ থেকে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে পর্যটক না থাকলেও হোটেল-কটেজের কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ ও রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য খরচ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

পর্যটন কেন্দ্র বন্ধের প্রতিবাদে খাগড়াছড়িতে বিক্ষোভ : সাজেক পর্যটনকেন্দ্র বন্ধের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গতকাল শুক্রবার বিকেলে খাগড়াছড়িতে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, পরিবহন মালিক, চালক ও স্থানীয়রা। সাজেক বাস কাউন্টারের সামনে থেকে মিছিলটি শুরু হয়ে শহরের শাপলা চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে এক সমাবেশে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও পরিবহন খাতের প্রতিনিধিরা বলেন, সাজেক পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকায় পর্যটননির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে। পর্যটন খাতের সঙ্গে জড়িত বহু মানুষের আয়-রোজগার পর্যটকদের আগমনের ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘদিন পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ থাকলে ব্যবসায়ী, পরিবহন মালিক, চালকসহ স্থানীয় অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়বে। তারা পর্যটন খাত রক্ষা, স্থানীয় মানুষের জীবিকা সুরক্ষা এবং পর্যটন কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ কামনা করেন। সমাবেশে বক্তব্য দেন পার্বত্য যানবাহন মালিক সমিতির সভাপতি আইয়ুশ শান্তি চাকমা,  সম-অধিকার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মো. আসাদ উল্লাহ, সিএনজি মালিক সমিতির সভাপতি জসীম উদ্দিন, ই-ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি উজ্জ্বল প্রমুখ।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত