ফ্রান্সে সহিংসতা ঠেকাতে ৭০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী

প্যারিসে গুলিতে নিহত ১

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪৭ এএম

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস শহরের কিছু এলাকায় চলাচলে বিধিনিষেধ জারি রেখে আগামী সোমবার পর্যন্ত আংশিক কারফিউয়ের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে, মার্সেই ও লিওঁ শহরে শনি ও রবিবার সপ্তাহিক ছুটির সময় সবধরনের বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রাজধানীতে আবারও বিক্ষোভের আশঙ্কায় আজ শনিবার ল্যুভ, ওর্সে ও পিকাসো জাদুঘরও বন্ধ থাকবে। শনিবারের বিক্ষোভ ঠেকাতে দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডারমেরি সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ।

জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় এবং স্কুলের পরিস্থিতির প্রতিবাদে গত সপ্তাহে ফ্রান্সজুড়ে বড় আকারের বিক্ষোভ হয়। তবে দাঙ্গা ও লুটপাটের কারণে সেই বিক্ষোভের মূল দাবি আড়ালে চলে যায়। ওই সহিংসতায় বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ঐতিহাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অস্থিরতার রেশ এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি ফ্রান্স।

রাজধানী প্যারিসের অদূরে গতকাল শুক্রবার গুলিতে একজন নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছেন। ঘটনায় জড়িত অভিযোগে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শনিবার ডাকা বড় বিক্ষোভের আগে এই ঘটনা ঘটল। তবে ওই বিক্ষোভের সঙ্গে এই ঘটনার যোগসূত্র আছে কি না, তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি।

ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্টিয়ান ল্যকরনু জানিয়েছেন, প্যারিসের পশ্চিমে ট্রাপেস এলাকায় ‘অত্যন্ত গুরুতর ঘটনাটি’ এ ঘটনা ঘটেছে। সামাজিক মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, এ ঘটনায় সন্দেহভাজন হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। ন্যাশনাল অ্যান্টি-টেররিজম প্রসিকিউটর অফিস পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

পুলিশের বরাত দিয়ে সংবাদ সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, এক ব্যক্তি গাড়ি চালিয়ে ঘটনাস্থলে গুলি চালান। পরে স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঘটনাস্থলের কাছের আরেক শহর কোইনিয়ার্স থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ফরাসি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। তাদের মধ্যে ১২ বছরের এক শিশুও থাকতে পারে।

এদিকে ফ্রান্সের শনিবারের বিক্ষোভ ও সমাবেশকে কেন্দ্র করে মার্কিন নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এবং প্যারিসে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস। বৃহস্পতিবার প্যারিসে মার্কিন দূতাবাসের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চলমান বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি ফ্রান্সে সহিংসতা ও অস্থিরতার ঘটনা ঘটেছে এবং এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। ফ্রান্সের সরকার ‘অবৈধ’ বিক্ষোভ দমনে পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তবে শ্রমিক সংগঠনের মতো গোষ্ঠীগুলোর আয়োজিত সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়ে যাওয়ায় বিক্ষোভ ও অস্থিরতাপূর্ণ এলাকা ফ্রান্সে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের এড়িয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, ‘পাশাপাশি জনসমাগমপূর্ণ স্থান এবং যেখানে পুলিশের উপস্থিতি বেশি, সেসব এলাকা থেকেও দূরে থাকুন।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁ বলেছেন, যেসব এলাকায় পুরোপুরি বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়নি, সেখানে শনিবার কেবল অনুমোদিত শ্রমিক সংগঠনগুলোর বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হবে। শনিবারের বিক্ষোভ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে বৃহস্পতিবার গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা ও মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেন ম্যাখোঁ। তিনি বলেন, ‘সাধারণভাবে সুপারিশ হলো, কোনো বিক্ষোভ হওয়া উচিত নয়। শ্রমিক সংগঠন হিসেবে যারা বিক্ষোভ চালিয়ে যেতে চায়, তাদের জন্য কর্তৃপক্ষ বিকল্প ব্যবস্থা করবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যেসব বিক্ষোভ শ্রমিক সংগঠনের আয়োজনে হবে না, সম্ভব হলে সেগুলো নিষিদ্ধ করা হবে।’ ম্যাখোঁ বামপন্থি কট্টর গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, তারা প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটানোর উদ্দেশ্যে ‘রাজনৈতিক, এমনকি রাষ্ট্রদ্রোহমূলক কর্মকা-’ সংঘটিত করছে।

গত সপ্তাহের দাঙ্গার পর বেশ কয়েকটি শহরে কারফিউ জারি করা হয়। সরকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে চায় বলে জানান ম্যাখোঁ। সে সময়কার বিক্ষোভের বড় একটি অংশের পেছনে ছিল ‘জিলে জন’ বা ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন। প্যারিস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই আন্দোলনের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত বেশ কয়েকটি মিছিল নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

গত সপ্তাহের তুলনায় এবার পুলিশের মোতায়েন ২০ শতাংশ বাড়ানো হবে বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ। অস্থিরতার ব্যাপকতা সম্পর্কে সরকার আগে থেকে ধারণা করতে ব্যর্থ হয়েছে এমন অভিযোগ ওঠার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডারমেরি সদস্য মোতায়েন করা হবে।

ফ্রান্সের বিচারবিষয়ক মন্ত্রী জেরাল্ড ডার্মানান বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, গত সপ্তাহের সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে দোষী সাব্যস্ত হওয়া ২১৭ জনকে কারাদ- দেওয়া হয়েছে। এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি জানান, ফ্রান্সজুড়ে ২ হাজার ৭০০ জনকে গ্রেপ্তার এবং ১ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। লে ফিগারো পত্রিকার বরাতে তিনি বলেন, আটক ব্যক্তিদের অর্ধেকেরই অপরাধের কোনো রেকর্ড আগে ছিল না।

প্যারিস পুলিশ জানিয়েছে, গত সপ্তাহের বিক্ষোভকারীরা যে প্লাস দ্য লা রিপাবলিক এলাকায় জড়ো হয়েছিলেন, সেখানে এবং লে আল শপিং এলাকায় সোমবার পর্যন্ত কারফিউ বাড়ানো হবে।

রাজধানীর প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্থানীয় সময় রাত ১১টা থেকে পরদিন সকাল ৬টা পর্যন্ত এই দুই এলাকায় চলাচল নিষিদ্ধ থাকবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ ও প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লোকর্নুর নির্দেশে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

গত সপ্তাহের দাঙ্গার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে শনিবার মার্সেই শহরে গণপরিবহন চলাচল বন্ধ রাখা হবে। সে সময় ফ্রান্সের যেসব শহরে সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতা হয়েছিল, মার্সেই ছিল তার অন্যতম। সেখানে ৫০০টির বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রোউন অঞ্চলের প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শনিবার রাত ১১টা থেকে পরদিন ভোর ৫টা পর্যন্ত অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য জারি করা কারফিউ সবার ক্ষেত্রে কার্যকর করা হবে।

এ সপ্তাহে দক্ষিণের মার্সেই, বোর্দো, নিস ও লিওনের পাশাপাশি উত্তরের লিলসহ বিভিন্ন শহরে তরুণদের চলাচল এবং জনসমাবেশের ওপর বিভিন্ন ধরনের আংশিক কারফিউ ও বিধিনিষেধ কার্যকর ছিল।

জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদে গত ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ মানুষ অংশ নেন। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত