 হর্নে সর্বনাশ

শব্দযন্ত্রণার অবসানে চাই জরুরি ব্যবস্থা

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৯ এএম

যানবাহনের হর্নের বিকট শব্দে মানুষ যন্ত্রণায় আছেন। শহর-গ্রাম সবখানে একই অবস্থা। পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও নাগরিক পরিষেবা উন্নয়ন বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তিন মাস আগে, গত ১৮ জুলাই, উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে বিস্তারিত নির্দেশনা দেন। তার নির্দেশনায় ইতিমধ্যে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক লাইট সিস্টেম রাজধানীর অনেকগুলো সড়কের মোড়ে চালু হয়েছে। এতে ট্রাফিক ব্যবস্থা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসতে শুরু করেছে। নাগরিকরা সুফল পাচ্ছেন। শব্দদূষণও পরিবেশ দূষণের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। দেশ রূপান্তরে শনিবার প্রকাশিত ‘অবৈধ হর্নে সর্বনাশ’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাস, ট্রাক, লরি, ব্যক্তিগত গাড়ি, ব্যাটারিচালিত অটো ও মোটরবাইকের অতিমাত্রার হর্নের বিকট শব্দ শিশুসহ সব বয়সের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে। এতে তাদের মানসিক ক্ষতির পাশাপাশি স্থায়ী স্বাস্থ্যগত ক্ষতির ঝুঁকিও আছে।

কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা ঢাকায় যানবাহন থেকে তৈরি শব্দদূষণের কারণে জনস্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশ^স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা অনুযায়ী, মানুষের হরমোন আকস্মিক শব্দদূষণে প্রভাবিত হয়ে অস্বাভাবিক হার্টবিট, উচ্চরক্তচাপ ও হৃদরোগের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। শব্দযন্ত্রণা শিশুর ঘুম, শ্রবণ, মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তির ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী মারাত্মক ক্ষতি করে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা ২০২২ সালে বিশে^ শীর্ষ শব্দদূষণের নগরগুলোর র‌্যাংকিংয়ে এক নম্বরে ছিল। দুঃখজনক হলো, বাংলাদেশের রাজধানীর এ অবস্থান এখনো বদলায়নি। ঢাকায় যানবাহন ব্যবহারে তৈরি শব্দদূষণের তীব্রতা ১১৯ ডেসিবল, যা অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। অথচ মানবদেহের জন্য সহনীয় অনুমোদিত শব্দদূষণের মাত্রা ৫৫ ডেসিবল। 

শব্দদূষণসহ পরিবেশ দূষণের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সরকারি বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ আছে; আছে আইন। যানবাহনে হুটার ও হাইড্রোলিক হর্নসহ যেসব হর্ন দিয়ে বেপরোয়া চালকরা দিন-রাত শব্দযন্ত্রণা তৈরি করে, সেসব হর্নের অধিকাংশের উৎপাদন, আমদানি, বিক্রি ও ব্যবহার বেআইনি। অ্যাম্বুলেন্স, অগ্নিনির্বাপক, উদ্ধারকাজ ও রাষ্ট্রীয় জরুরি কাজে ব্যবহৃত মোটরযান ছাড়া অন্য মোটরযানে তীব্র, কর্কশ, আকস্মিক, বিকট বা ভীতিকর শব্দের হর্ন সংযোজন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ। এসব হর্ন সংযুক্ত থাকলে চালকরা বেপরোয়া গতিতে মোটরযান চালাতে উৎসাহিত হয়। এতে সড়ক দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেশ বেড়ে যায়। এসব হর্নের ব্যবহার বন্ধে পুলিশসহ বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ অভিযান চালায়। জরিমানা করে। কিন্তু এসব হর্ন লাগানো ও বাজানো অনেক মালিক ও চালকের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। জরিমানায়ও দমছেন না অনেক চালক। হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ ‘নীরব এলাকা’ চিহ্নিত স্থানেও তারা হর্ন বাজান। এসব কারণে সরকার শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে; যা যানবাহন নিখুঁতভাবে শনাক্ত ও আইনি ব্যবস্থা নিতে সহায়ক হতে পারে। 

সড়ক পরিবহন আইনে (২০১৮) ও শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা (২০২৫) অনুযায়ী, অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি শব্দ সৃষ্টিকারী ডিভাইস উৎপাদন, আমদানি, মজুদ, প্রদর্শন, বিক্রি ও ব্যবহারে নানা রকম শাস্তির ব্যবস্থা আছে। অপরাধের মাত্রাভেদে দুই  লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা ও দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান আছে। ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকে পর্যায়ক্রমে দোষসূচক পয়েন্ট কেটে লাইসেন্স বাতিলের ব্যবস্থাও আছে। গাড়ি জব্দ ও ডিভাইস খুলে নেওয়া যায়। আমরা মনে করি, আইন ও বিধিগুলো কঠোরভাবে প্রয়োগ করা দরকার।

খুব প্রয়োজন না হলে হর্ন বাজানো অনেক সমাজে একধরনের ‘অসভ্য’ আচরণ হিসেবে গণ্য হয়; এটা অধিকাংশ মালিক জানেন। তারপরও, মালিকের টাকায় ও উৎসাহে এমন হর্ন লাগানো হয়ে থাকে। তাই মালিকদেরও কার্যকরভাবে শাস্তির আওতায় আনা বেশি কার্যকর হতে পারে। এ ধরনের ডিভাইস সংযুক্ত পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট যানবাহনের ফিটনেস লাইসেন্স বাতিলের বিধান করা যায়।    

শব্দদূষণ ও অননুমোদিত হর্নের উৎপাদন, আমদানি, বেচাকেনা ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ যে শুধু পুলিশের কাজ নয়, এটি সরকার জানে। শুধু শাস্তি দিয়ে এই গণউপদ্রব বন্ধ করা দুরূহ, এটাও প্রায় সবাই জানেন। তাই শাস্তির পাশাপাশি সচেতনতা তৈরিও প্রয়োজন। একইসঙ্গে বিআরটিএ, পরিবেশ অধিদপ্তর, ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষ সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে এই গণউপদ্রব থেকে মানুষকে নিষ্কৃতি দেওয়া কঠিন। আমাদের আশা, সবাই এ বিষয়ে আন্তরিকভাবে সচেষ্ট হবেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত