সভ্য সমাজে ধর্ম, মানুষের বিশ্বাস ও নৈতিকতা আত্মিক প্রশান্তির উৎস। ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান করা জরুরি। কিন্তু সেই অনুভূতির নাম করে কাউকে হত্যা, নির্যাতন বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। কোনো ব্যক্তি ধর্ম অবমাননা করেছেন, এমন অভিযোগ উঠলেও তার অপরাধ নির্ধারণের দায়িত্ব জনতার নয়। এই দায়িত্ব রাষ্ট্রের আইন, তদন্তকারী সংস্থা ও বিচার বিভাগের। দুঃখজনক হচ্ছে, মাঝেমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ার পর উত্তেজনা, হামলা, ভাঙচুর ও গণপিটুনির ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তির জীবন বিপন্ন করে না; সমাজের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, নাগরিক নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। সাতক্ষীরায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যার সাম্প্রতিক ঘটনা বৃহত্তর বাস্তবতার আলোকে পর্যালোচনা করা দরকার।
২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার কুলিয়া এলাকায় ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মারধর করা হয়। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। কিন্তু রাতের দিকে উত্তেজিত জনতা হেলথ কমপ্লেক্স থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে শামীমকে আবার বেধড়ক মারধর করে। পরে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। এভাবে সেদিন কিছু সংখ্যক তথাকথিত জনতার আদালতে আইনের মৃত্যু ঘটে। হাসপাতালের চিকিৎসক ও পুলিশ বলেছে, দ্বিতীয় দফার হামলায় বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেয়। ঘটনার সূত্রপাত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও কথোপকথন নিয়ে। অভিযোগ, ওই কথোপকথনে ধর্ম সম্পর্কে আপত্তিকর বক্তব্য ছিল। অন্যদিকে নিহত ব্যক্তির পরিবারের দাবি, পারিবারিক বিরোধের পর শামীমের আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দিয়েছিল। তিনি আগে থেকেই মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছিলেন। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত দুজনকে পুলিশ ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে। হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্বাদানকারী জনৈক ফজলুল হক আমিনীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে।
ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো প্রথম হামলার পর পুলিশ একজন আহত মানুষকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করলেও, দ্বিতীয় দফায় হামলা থেকে তাকে রক্ষা করতে পারেনি। হাসপাতাল এমন এক স্থান, যেখানে আহত ব্যক্তির নিরাপত্তা ও চিকিৎসা নিশ্চিত হওয়ার কথা। সেখানে জনতার হাতে একজন চিকিৎসাধীন ব্যক্তির মৃত্যু শুধু অপরাধীর দায় নয়, নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে হলে কে প্রথম অভিযোগ তুলেছিল, কে উত্তেজনা ছড়িয়েছিল, কে জনতাকে সংগঠিত করেছিল, কারা মারধর করেছে এবং চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোথায় ব্যর্থতা ঘটেছে সবকিছু নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। উল্লেখ্য, দেশে ধর্ম অবমাননার দায়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা এটি প্রথম নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, দেশে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে সহিংসতা সৃষ্টি এত সহজ কেন? ধর্ম মানুষের গভীর আবেগ ও পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত। ফলে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ব্যক্তিগত অপমানের অনুভূতিকে ছাড়িয়ে কখনো কখনো সমষ্টিগত ক্ষোভে পরিণত হয়। এই আবেগ কাজে লাগিয়ে বিশেষ শ্রেণির ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, দ্রুত মানুষকে সংগঠিত করতে পারে। কিন্তু ধর্মীয় অনুভূতি যত গভীরই হোক, তা কাউকে অপরাধের বিচারক ও শাস্তিদাতা হওয়ার অধিকার দেয় না। তবে ধর্ম অবমাননার যেকোনো অভিযোগ সেটা সত্য কিংবা মিথ্যা হোক, মানুষকে তা সহজে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। আমাদের দেশে এক ধরনের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে যে, ‘ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে কটু কথা বলেছে’; এ কথাটি যদি প্রচার করা যায়, তাহলে যেকোনো বিপর্যয় ঘটানো সম্ভব। কোন কথায় মানুষ কতটা উত্তেজিত হয়, তা দুষ্কৃতকারীদের ভালো করে জানা আছে এবং তারা এই কৌশল প্রয়োগ করে উদ্দেশ্য হাসিল করেন।
অতীতে সংঘটিত ঘটনাবলি পর্যালোচনা করলে সহজেই এ ধরনের সহিংসতার পেছনের কতগুলো কারণ চিহ্নিত করা যায়। প্রথমত, অভিযোগ ও প্রমাণের পার্থক্য ভুলে যাওয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো অডিও-ভিডিও বা স্ক্রিনশট প্রকাশিত হলে, প্রকৃত ঘটনা যাচাই না করে অনেকে তাকে চূড়ান্ত সত্য বলে ধরে নেন। এসব যাচাই-বাছাই না করে সিদ্ধান্ত নেওয়া বিপজ্জনক। দেশে ধর্মীয় আবেগকে সংগঠিত শক্তিতে রূপান্তর করা সহজ। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ধর্ম রক্ষার আহ্বান জানিয়ে জনতাকে জড়ো করলে, মানুষ ব্যক্তিগত বিচারবোধের বদলে দলগত আবেগের অনুসারী হয়ে ওঠে। ভিড়ের মধ্যে ব্যক্তিগত দায়বোধও অনেক সময় দুর্বল হয়ে যায়। বিচারহীনতার ধারণা, এ ধরনের ঘটনায় জড়িত হওয়ার প্রবণতা উৎসাহিত করতে পারে। মানুষ যদি মনে করে, অপরাধ করে পার পাওয়া যায় অথবা উত্তেজিত জনতার বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ হবে না, তাহলে সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ে।
সাতক্ষীরার ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, ক্ষোভ শুধু অনলাইনে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বাস্তবে সংঘটিত সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। এর ফলে সমস্যাটিকে শুধু মানুষের ধর্মীয় আবেগ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে চলবে না। তার সঙ্গে আইন প্রয়োগ, জনসমাবেশের গতিবিধি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা খতিয়ে দেখতে হবে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে সাতক্ষীরার দেবহাটায় শামীমকে পিটিয়ে হত্যা শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়; এটি আইনের শাসন ও মানবিকতার মুখে চপেটাঘাত। অভিযোগ উঠলেই কি কেউ অপরাধী? অপরাধী হলেও শাস্তি দেওয়ার অধিকার কি উত্তেজিত জনতার আছে? জনতা যখন নিজেরাই বিচারক ও শাস্তিদাতা হয়ে ওঠে, তখন আদালত উপেক্ষিত ও আইনের কর্তৃত্ব পদদলিত হয়। এখানে ভয়াবহতা হলো, প্রথম হামলার পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শামীমের ওপর দ্বিতীয় দফায় হামলা চালানো। জীবন রক্ষার আশ্রয় হাসপাতালেও যদি একজন মানুষ এসব দুষ্কৃতকারীদের হাত থেকে রক্ষা না পান, তাহলে দেশের নাগরিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কোথায়? ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা জরুরি; কিন্তু ধর্মের নামে হত্যা, ধর্মের মর্যাদা রক্ষা করে না। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ আদালতের কাজ। তাই নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিচার এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। গুজব ও উসকানি যেন আর কোনো প্রাণ কেড়ে নিতে না পারে, সে জন্য অবিলম্বে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ জনতার হাতে বিচার তুলে দিলে প্রাণহানি ঘটে; ন্যায়বিচার দুর্বল হয়, নাগরিক নিরাপত্তা ভেঙে পড়ে এবং আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কী করতে পারে? ধর্মীয় অভিযোগকে কেন্দ্র করে এ ধরনের ঘটনা বন্ধ করতে সরকারের প্রয়োজন তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উদ্যোগ এবং দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত। সাতক্ষীরার ঘটনায় প্রত্যক্ষ হামলাকারী, জনতাকে সংগঠিতকারী, উসকানিমূলক বক্তব্যদাতা এবং সহিংসতায় সহায়তাকারীদের ভূমিকা আলাদাভাবে তদন্ত করতে হবে। ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ, অডিওর সত্যতা যাচাই এবং সাক্ষীদের বক্তব্য গ্রহণ জরুরি। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনি পদক্ষেপ এ ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সহায়ক হবে। দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করতে হবে। গ্রেপ্তার চূড়ান্ত সাফল্য নয়। তদন্ত, অভিযোগপত্র, বিচার এবং রায় প্রতিটি পর্যায়ে আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। ধর্মীয় পরিচয়, রাজনৈতিক অবস্থান বা সামাজিক প্রভাব যেন বিচারকে প্রভাবিত না করে। এ ক্ষেত্রে ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্বকে যুক্ত করা যেতে পারে। মসজিদের ইমাম, আলেম, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে জনসচেতনতায় সম্পৃক্ত করতে হবে। ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান করার পাশাপাশি কারও উসকানিতে কাউকে আক্রমণ করা যে অন্যায়, তা স্পষ্টভাবে প্রচার করা প্রয়োজন। পুলিশ ও প্রশাসনের জবাবদিহিও নিশ্চিত করা দরকার। সহিংসতার আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও, দায়িত্ব পালনে অবহেলা হয়েছে কি না তা নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আহত ব্যক্তিকে জনতার হাত থেকে কেন রক্ষা করা গেল না, তারও তদন্ত হওয়া দরকার। ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান করার নামে একজন মানুষকে যদি পিটিয়ে হত্যা করা হয়, তবে সমাজে ন্যায়বিচার ও মানবিকতার অবস্থান কোথায়? ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আইনের শাসন পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। বরং ন্যায়বিচার, সংযম ও মানুষের জীবনের মর্যাদা রক্ষা এসব একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি। যে সমাজে জনতা শাস্তি কার্যকর করে, সেখানে নিরপরাধ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সাতক্ষীরার হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, দায়ীদের বিচার এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার জবাবদিহি জরুরি। পাশাপাশি প্রয়োজন এমন সামাজিক সংস্কৃতি, যেখানে ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্যের প্রতিবাদ হবে যুক্তি, আইন ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সহিংসতা দিয়ে নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার ঠেকিয়ে প্রতিটি নাগরিকের জীবন, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের অধিকার রক্ষা করা। এই নীতিই হতে পারে, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার সবচেয়ে কার্যকর ভিত্তি।
লেখক : ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক