পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, হাজারো প্রাণীর অনন্য ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল। তবে কালের বিবর্তনে জলবায়ুর চরম পরিবর্তন, লবণাক্ততার আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি এবং মানুষের অনিয়ন্ত্রিত শিকার ও বন ধ্বংসের কারণে সুন্দরবনের এই অনন্য জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে। এক সময় যে বনের প্রতিটি কোণ প্রাণীদের কোলাহলে মুখরিত থাকত, সেখানে আজ কেবলই নীরবতা বাড়ছে। পরিবেশবিদদের গবেষণায় দেখা গেছে, গত এক শতাব্দীতে সুন্দরবনের প্রায় ৪০ শতাংশ প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বন্যপ্রাণীর ওপর। যেসব পশুপাখি একসময় এই অঞ্চলে অবাধে বিচরণ করত, তাদের বেশ কিছু প্রজাতি ইতিমধ্যে সুন্দরবন তথা বাংলাদেশ থেকে সম্পূর্ণ বা আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, যা সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। সুন্দরবনের স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ইতিহাসের দিকে তাকালে এক সময়ের যে সমৃদ্ধ চিত্র পাওয়া যায়, তা রূপকথার মতো শোনায়। আজ থেকে শত বছর আগে, বিশেষ করে ১৯০৮ সালের দিকে সুন্দরবনের কর্দমাক্ত ম্যানগ্রোভ অঞ্চলে জাভান গণ্ডার প্রচুর দেখা যেত; যা আজ বাংলাদেশ থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত। শুধু গণ্ডার নয়, এই বনের জলাভূমি ও চরাঞ্চলের পরিচিত মুখ বন্য মোষ এবং দল বেঁধে ঘুরে বেড়ানো সোয়াম্প হরিণ বা বারোসিঙ্গাও আজ সুন্দরবন থেকে পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। এক সময় বনের ছোট গুল্মজাতীয় উদ্ভিদের আড়ালে লুকিয়ে থাকা হগ হরিণ এবং বিশাল আকৃতির গৌর বা ভারতীয় বাইসনও এই বাস্তুতন্ত্র থেকে চিরতরে বিলুপ্ত। এমনকি, রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের পাশাপাশি যে চিতাবাঘ ও ওলবাঘ সুন্দরবনের শিকারি প্রাণীর ভারসাম্য রক্ষা করত, তাদেরও অস্তিত্ব নেই। একটি নির্দিষ্ট বনাঞ্চল থেকে এভাবে একের পর এক বড় স্তন্যপায়ী প্রাণী বিলুপ্ত হওয়া প্রমাণ করে, বনের খাদ্যশৃঙ্খল কতটা ভেঙে পড়েছে এবং বনের আয়তন প্রাণীদের ধারণক্ষমতার তুলনায় কতটা সংকুচিত হয়ে এসেছে।
পাখিদের কলকাকলিতে মুখর সুন্দরবনের আকাশও আজ তার আদি রূপ হারাচ্ছে। প্রকৃতির ঝাড়ুদার হিসেবে পরিচিত রাজ শকুন (ইন্ডিয়ান ভলচার) এক সময় সুন্দরবন ও এর আশপাশের এলাকায় প্রচুর দেখা যেত। কিন্তু গবাদিপশুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত ক্ষতিকর ওষুধ ও খাদ্যে বিষক্রিয়র কারণে উপকারী এই পাখিটি আজ সুন্দরবন তথা সমগ্র দেশ থেকে প্রায় বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। শুধু আকাশে নয়, সুন্দরবনের অববাহিকা ও নদী তীরবর্তী জলাশয়গুলো থেকেও পিংক-হেডেড ডাক এবং বিভিন্ন প্রজাতির বুনো হাঁস চিরতরে হারিয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) তথ্যমতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সুন্দরবনে পরিযায়ী পাখির আগমন গত দুই দশকে প্রায় ৬০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। পাখিদের এই প্রস্থান কেবল বনের সৌন্দর্যহানি নয়; বরং উদ্ভিদের পরাগায়ন ব্যাহত হওয়া এবং ক্ষতিকর পোকামাকড়ের বংশবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ, যা বনের প্রাকৃতিক পুনরুৎপাদন প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। সুন্দরবনের প্রাণস্পন্দন লুকিয়ে আছে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদ-নদীতে। কিন্তু এখানকার সরীসৃপ ও জলজ প্রাণীদের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। এক সময় সুন্দরবনের প্রবহমান মিষ্টি পানি ও নদীর মোহনাগুলোতে প্রচুর ঘড়িয়াল দেখা যেত। কিন্তু উজানে বাঁধ নির্মাণ এবং ফারাক্কার প্রভাবে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় সুন্দরবনের মূল চ্যানেলগুলো থেকে এরা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। একই সঙ্গে, সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততার ভারসাম্য তীব্রভাবে পরিবর্তনের ফলে ‘মগর’ বা সাধারণ কুমিরও সুন্দরবনের জলসীমা থেকে হারিয়ে গেছে। সুন্দরবনের পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেড়ে যাওয়ায় কেবল কুমির বা ঘড়িয়াল নয়, বরং নদীর ওপর নির্ভরশীল কয়েকশ প্রজাতির মাছ এবং জলজ উদ্ভিদ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। জলজ পরিবেশের এই বিপর্যয় প্রমাণ করে, জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সুন্দরবনের ওপর কতটা প্রত্যক্ষ ও নিষ্ঠুর আঘাত হানছে।
বর্তমানে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে; কারণ কেবল পূর্বে বিলুপ্ত হওয়া প্রাণীই নয়, সুন্দরবনের অনেক বাসিন্দা মহাবিপন্ন তালিকার অন্তর্ভুক্ত। জাতীয় অহংকার রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, বাঘডাশ, বিরল প্রজাতির ফিনফুট পাখি এবং বিভিন্ন প্রজাতির কচ্ছপ ও ডলফিন চরম ঝুঁকির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। সুন্দরবনে বর্তমানে বাঘের সংখ্যা আশঙ্কাজনক স্তরে রয়েছে, যা বনের সামগ্রিক স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের স্পষ্ট সংকেত। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা যেভাবে বাড়ছে, তাতে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, ২০৭০ সালের মধ্যে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের উপযুক্ত আবাসস্থল সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। মানুষের অনিয়ন্ত্রিত অনুপ্রবেশ, চোরা শিকারিদের দৌরাত্ম্য এবং কাঠ পাচার যদি এখনই কঠোরভাবে বন্ধ করা না যায়, তবে আগামী প্রজন্ম হয়তো এই প্রাণীগুলোকে শুধু বইয়ের পাতায় বা আলোকচিত্রে দেখবে। সুন্দরবন না বাঁচলে, এ দেশ প্রকৃতির তাণ্ডবে অরক্ষিত হয়ে পড়বে। সিডর, আইলা বা আম্পানের মতো প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়গুলোর গতিবেগ কমিয়ে দিয়ে সুন্দরবন বারবার লাখো মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করেছে। অথচ আমরা প্রতিনিয়ত বনের ক্ষতি করে নিজেদের বিপদ ডেকে আনছি। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে, এখনই আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল সঠিকভাবে ব্যবহার করে নদীগুলোর মিষ্টি পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বনের চারপাশের শিল্পায়ন বন্ধ করে, চোরা শিকারিদের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি গ্রহণ করতে হবে। সুন্দরবন রক্ষায় কেবল সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, এর জন্য প্রয়োজন স্থানীয় অধিবাসী ও সাধারণ জনগণের সম্মিলিত সচেতনতা ও অংশগ্রহণ।
লেখক : কবি ও কলামিস্ট