নাই নিরাপত্তা, সংকট রয়েছে নিরাপদ আবাসন ব্যবস্থা। চিহ্নিত নয় গোসলের নিরপদ জোন, অপ্রতুল লাইফ গার্ড ও দমকল বাহিনীর লোকবল, নাই ডুবুরি দল, নাই প্রশাসনিক সমন্বয়, নাই সুষম পরিবেশ, সর্বত্র নাই নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা, এমনকি নাই পেশাদারিত্বের প্রতিফলন। চারদিকের এত সব নাই-এর বিপরীতে কক্সবাজারের পর্যটন চলছে শুধু প্রকৃতির ভরসায়। এমনটাই দাবি করছেন কক্সবাজারের হোটেল মোটেল মালিক ও পর্যটনসেবীসহ খোদ স্থানীয় সংসদ সদস্য।
সংশ্লিষ্টদের এই দাবির বাস্তব ও নির্মম প্রতিফলন দেখা গেছে গত এক সপ্তাহে। গেল ১৭ অক্টোবর ইনানী পাটুয়ারটেকের টুপটুপ রিসোর্টের ভয়াবহ অগ্নিকা-ে ১০ জনের পোড়া মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন একজন। এর চার দিন পরেই ২১ অক্টোবর হিমছড়ির জাদুঘরসংলগ্ন সমুদসৈকতে গোসলে নেমে ৫ জন পর্যটকের প্রাণহানি ঘটে। এত সব নাইকে পেছনে ফেলে পর্যটকদের জন্য নিরাপদ কক্সবাজার তৈরি করতে গতকাল জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রায় চার শতাধিক হোটেল মোটেলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন পর্যটন করপোরেশন, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, কউক, কক্সবাজার পৌরসভাসহ নানা সংস্থার প্রতিনিধিরা।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসন, পর্যটন করপোরেশন ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পর্যটন রাজধানী হিসেবে খ্যাত কক্সবাজার জেলায় কমপক্ষে ৫০টি অধিক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। সৈকতের লাবণী পয়েন্টে কমপক্ষে ১০ জন পর্যটকের সঙ্গে কথা হয়। তাদের দাবি, ভ্রমণের জন্য এখন আর নিরাপদ নয় কক্সবাজার। তবুও ছুটি কাটাতে কোথাও যেতে হয়। তাই আসা। এখানকার কক্ষ ভাড়া ও খাবার খরচ অনেক বেশি। এ ছাড়া পরিবেশও হিবিজিবি। সুগন্ধা পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, রাজশাহীর নবদম্পতি আসিফ ইকবাল ও ইসমত ইসুর সঙ্গে। তারা বলেন, রাস্তার ধারে ময়লার পাহাড়, সৈকতে নামতে ড্রেনের পানি পার হতে হয়। এ ছাড়া এই শহরে কোনো কিছুর নিয়ম মেনে চলে না। চট্টগ্রাম থেকে আগত একটি কলেজের ৫ শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা মেরিন ড্রাইভের সৌন্দর্য দেখতে পাটুয়ারটেক, দরিয়া নগর ও হিমছড়ি গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে কোনো বিচকর্মী, পুলিশ কিংবা প্রশাসনের কাউকে দেখিনি। এমনকি এসব জায়গায় জোয়ার-ভাটার পতাকাও ছিল না।’
বগুড়া থেকে আগত আরিফ ও বৃষ্টি বলেন, ‘এখানে তো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়া আর কিছুই নাই। তা দেখতে কিংবা উপভোগ করতে যে পরিবেশ দরকার তাও নিশ্চিত করতে পারেনি প্রশাসন।’
এ বিষয়ে কক্সবাজার হোটেল মোটেল অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কলিম উল্লাহ বলেন, গত এক সপ্তাহে আগুন ও সমুদ্রে গোসলে নেমে কক্সবাজারে ১৫ জন নিহত এবং একজন নিখোঁজ হয়েছেন। এটি আমাদের জন্য লজ্জার। প্রশাসনের উচিত সব ব্যবসায়ীকে নিয়ম-নীতির আওতায় আনা। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই শহরের পর্যটনে সবচেয়ে বড় সমস্যা প্রশাসনের সমন্বয়হীনতা। এ কারণে বিভিন্ন অনুমোদন নিতে ব্যবসায়ীদের হিমশিম খেতে হয়।
কক্সবাজার সিটি কলেজের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টের সাবেক বিভাগীয় প্রধান মইনুল হাসান পলাশ বলেন, উঁচু উঁচু ভবন উঠলেই পর্যটন হয় না। মূলত পর্যটনের প্রাথমিক ভিত্তি হচ্ছে ৪টি। নিরাপত্তা , সুষম পরিবেশ, নিরাপদ খাদ্য ও পেশাদারত্ব। এর কোনোটিই এখন কক্সবাজারে নেই। আসলেই নাইয়ের লিস্ট এত বড় বলে শেষ করা যাবে না। নিরাপদ আবাসন ব্যবস্থার সংকট, গোসলে নেমে ডুবতে থাকা পর্যটকদের উদ্ধারে প্রশিক্ষিত ডুবুরিদল নেই, সামান্যসংখ্যক লাইফ গার্ড থাকলেও সৈকতে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই।
হোটেল মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, পর্যটনের জন্য যে প্রাথমিক স্তম্ভ দরকার তা নেই এটা সত্য। এর জন্য শুধু ব্যবসায়ীরাই দায়ী নন, প্রশাসনের সমন্বয়হীনতাও দায়ী। তিনি বলেন, একটি হোটেল ও রেস্তোরাঁর অনুমোদনের জন্য ১৭টি সংস্থার অনুমোদন লাগে। এর জন্য অফিসে অফিসে দৌড়াতে দৌড়াতে উদ্যোক্তারা হয়রান হয়ে যান। বিষয়টি নিয়ে গতকাল জেলা প্রশাসনের বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। আমরা ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারের দাবি জানিয়েছি।
পর্যটন করপোরেশনের কক্সবাজারের ম্যানেজার ও বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য সচিব রায়হান উদ্দিন আহমদ বলেন, বিচকর্মীর ৮ জনের ডুবুরি প্রশিক্ষণ রয়েছে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লাইফগার্ড সদস্যরা পানিতে ভেসে যাওয়া লোকজনকে উদ্ধারে কাজ করেন। এ বিষয়ে সি সেইভ লাইফ গার্ডের কক্সবাজারেরর আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক ইমতিয়াজ মাহমুদ বলেন, আমাদের সদস্য কম হওয়ায় আমরা শহরের লাবণী পয়েন্ট থেকে কলাতলী পয়েন্টেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রেখেছি।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজারের উপ-সহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মুরশেদ আলম বলেন, কক্সবাজারে একদিকে পর্যটন শহর, অন্যদিকে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত। এখানকার জন্য ১০০ জনের একটি দমকল বাহিনী দরকার। কিন্তু এর বিপরীতে রয়েছে কক্সবাজারে প্রথম শ্রেণির ফায়ার সার্ভিস, যার জনবল ৩৫ জন। এর মধ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কিছু জায়গায় আমাদের লোক দিতে হয়েছে। আমাদের ডুবুরিদল নাই। প্রয়োজন হলে চট্টগ্রাম থেকে আনতে হয়।
ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার চান ব্যবসায়ীরা : পর্যটনের জন্য নিরাপদ কক্সবাজার তৈরি করতে ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার চান পর্যটন ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল। বিষয়টি সুপারিশ হিসেবে একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা প্রশাসন। এ বিষয়ে হোটেল-রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, কক্সবাজারে নিরাপদ পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তুলতে দুটি প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে ইসি আইন। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে একটি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনে সরকারের কমপক্ষে ১৭টি সংস্থার দ্বারে দ্বারে দৌড়ানো। কিন্তু ইসি আইন থাকায় পরিবেশ ছাড়পত্র না মেলায় কউকের অনুমোদন পাওয়া যায় না। আবার কউকের অনুমোদন না থাকায় আর কোনো অনুমোদনের আবেদনই করা যায় না। আমরা এটা থেকে পরিত্রাণ চাই। তাই গতকালের বৈঠকে চার শতাধিক ব্যবসায়ীর প্রতিনিধিরা ইসি আইন বাতিল কিংবা শীতল করার সুপারিশ করেছেন। পাশাপাশি আমরা ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার চালুর কথা বলেছি। আমাদের দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করে একই কথা বলেছেন সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল।
বর্তমানে কক্সবাজারে পর্যটনের জন্য কিছুই নেই স্বীকার করে সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, নিরাপদ পর্যটন নগরী গড়ে তুলতে হলে ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার চালু করতে হবে। যেখান থেকে স্টক হোল্ডাররা সহজেই সেবা পাবেন। এ ছাড়া পর্যটনকে বাড়াতে হলে ইসি আইনকে শিথিল করতে হবে। এই দুটি বিষয় নিয়ে গতকালের অংশীজনদের সভায় কথা বলেছি।
এ বিষয়ে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, নিরাপদ পর্যটন নগরী গড়তে গতকাল কক্সবাজারের হোটেল মোটেল রিসোর্টসহ রেস্তোরাঁর প্রায় চার শতাধিক অংশীজনদের সঙ্গে গতকাল বৈঠক হয়েছে। ব্যবসায়ীরা ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারের সুপারিশ করেছেন। আমরা এই সেন্টার কীভাবে করা যায় এর জন্য একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সভায় উপস্থিত অংশীজনসহ সবাইকে দ্রুত প্রয়োজনীয় অনুমোদন সংগ্রহ করতে বলেছি। তারা আমাদের কাছ থকে মাস তিনেক সময় চেয়েছেন। তবে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি চলতি সপ্তাহ থেকে যাদের ন্যূনতম অনুমোদন নেই, সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা হবে।