ঢাকা, গাজীপুর এবং সাভার এলাকায় তুরাগ নদের দূষণ নিয়ন্ত্রণে ১৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি কারিগরি প্রকল্প নিতে যাচ্ছে সরকার। প্রকল্পের আওতায় ১৭৩ কারখানার বর্জ্য শোধনাগারের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা হবে। এ ছাড়া অনলাইনে রিয়েল টাইম নদের দূষণ পর্যবেক্ষণ এবং নদের পাড়ে বর্জ্য ফেলা বন্ধে ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি করা হবে। আজ রবিবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা রয়েছে। এতে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক সভাপতি তারেক রহমান। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, গাজীপুর, টঙ্গী ও আশুলিয়া এলাকার অধিকাংশ ডাইং ও ওয়াশিং কারখানায় শোধনাগার (ইপিপি) থাকলেও, খরচ বাঁচাতে তা রাতে বা গোপনে বন্ধ রাখা হয়। ফলে বিষাক্ত রাসায়নিক সরাসরি নদে পড়ে পানির রঙ আলকাতরার মতো কালো ও দুর্গন্ধময় করে তুলেছে। পানিতে অক্সিজেন শূন্যের কারণে জলজ বাস্তুতন্ত্র সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। এমনকি নদের আশপাশের এলাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও এখন এই দূষণের কারণে ঝুঁকির মুখে। চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগব্যাধি নদপাড়ের বাসিন্দাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। এর প্রতিকারে প্রশাসন মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেও স্থায়ী নেতা ও কারখানা মালিকদের প্রভাবে তা থেমে যায়।
সচেতন মহল মনে করেন, সরকার প্রকল্প বা প্রতিকারের উদ্যোগ গ্রহণ করলেও তার সুফল জনগণ পাচ্ছে না। এ জন্য টেকসই সমাধানের গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা। বিশেষ করে, নিয়মিত তদারকি ও সরকারি দপ্তরের প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এদিকে পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘মেট্রো ঢাকা ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম : তুরাগ নদের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় সমন্বিত দূষণ পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োগ ব্যবস্থা’ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে পরিবেশ অধিদপ্তর। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১৭৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পঋণ থেকে নেওয়া হবে। বাকি ১০ লাখ টাকা সরকারি অর্থায়ন থেকে ব্যয় করা হবে। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় তুরাগ নদের দূষণপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে দূষণের হটস্পটের মানচিত্র তৈরি করা হবে। নদতীরের চিহ্নিত ১৭৩টি কারখানার ইটিপির কার্যকারিতা যাচাই এবং পানির মান তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। এ ছাড়া ড্রোনের মাধ্যমে নদের তীরবর্তী এলাকায় বর্জ্য ফেলার কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে। একই সঙ্গে দূষণের মূল উৎস ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা এবং পরিবেশগত বিধিবিধান লঙ্ঘন করে নদে বর্জ্য ফেলছে এমন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করা হবে।
এ ছাড়া দূষণ নিয়ন্ত্রণে অন্তত ১০০টি অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি ও অভিযান পরিচালনা, নোটিস জারি এবং বেআইনি কার্যক্রমের জন্য শিল্পকারখানাকে জরিমানা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের অন্যতম কার্যক্রম হলো শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর পানির মান পর্যবেক্ষণে একটি রিয়েল টাইম অনলাইন ব্যবস্থা স্থাপন, নৌযানের মাধ্যমে টহল এবং নদের তলদেশ পরিষ্কার করা। এ ছাড়া ভূ-পৃষ্ঠের পানির মান পর্যবেক্ষণ নির্দেশিকা তৈরি করা এবং প্রকল্প চলাকালে অন্তত ৩৬ বার পানির নমুনা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পাশাপাশি প্রকল্পটিতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের ৩৩৩-৪ হেল্পলাইনকে সমন্বিত অভিযোগ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থায় উন্নীত করা হবে। এ ছাড়া কার্বন নিঃসরণ কমানোর সুযোগ ও কার্বন বাণিজ্যের সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো মূল্যায়ন করা হবে। অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব কার্যক্রম গ্রহণকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত করতে ‘গ্রিন স্টার রেটিং’ দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
প্রকল্প গ্রহণের যৌক্তিকতা বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগরীর পাশ দিয়ে প্রবাহিত বংশী নদীর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপনদী তুরাগ একসময় কৃষি, মৎস্য আহরণ ও গৃহস্থালীর কাজে মিঠাপানির অন্যতম উৎস ছিল। তবে গত কয়েক দশকে দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের কারণে নদটি দূষণ ও দখলের শিকার হচ্ছে। এতে নদের পরিবেশগত ভারসাম্য ও জলজ প্রাণীর আবাসস্থল হুমকির মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দূষণ নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ আইনপ্রয়োগ এবং বর্জ্যপানি শোধনের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে সরকার ‘মেট্রো ঢাকা ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম’ শীর্ষক একটি সমন্বিত প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এ কর্মসূচির অংশ হিসেবে তুরাগ নদের পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় দূষণ পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণে ‘মেট্রো ঢাকা ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম : তুরাগ নদের পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় সমন্বিত দূষণ পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োগ ব্যবস্থা’ শীর্ষক প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।
প্রকল্প প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকল্প নেওয়া মানেই এক শ্রেণির ব্যক্তি গোষ্ঠীর পকেট ভারী করা ছাড়া আর কিছু নয়। যে সমস্যা সমাধানে এখন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, এমন আরও অনেক প্রকল্প ইতিপূর্বে নেওয়া হয়েছে। যার সুফল সরকারি কর্মকর্তা আর স্থানীয় প্রভাবশালীরা পেয়েছে, জনগণ বা তুরাগ নদের কোনো উপকারে আসেনি। এর অন্যতম উদাহরণ রাজধানীর হাজারিবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তর। সেখানে এক যুগের বেশি সময়ে হাজারের বেশি কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ফলে পাশের ধলেশ্বরী নদী দূষণ বেড়েছে। ওই এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত হচ্ছে। এখন তুরাগ নদের আশপাশের ১৭৩টি কারখানার বর্জ্য দেখভালের জন্য ১৮৪ কোটি টাকার প্রকল্প আসছে। এতে পরিবেশের উন্নতি কতটুকু হবে তা নিয়ে আমরা সন্দিহান। কারণ সরকার শুধু প্রকল্প করবে আর টাকা খরচ করবে! এর মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো উন্নতি হবে কি না বা যেসব কারখানা মালিকদের কারণে দূষণ ছড়াচ্ছে তাদের থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় হবে কি না? বা তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে কি না? এ প্রশ্নের উত্তর অনিশ্চিত। ফলে এ প্রকল্পের মাধ্যমে টেকসই কোনো সমাধান আসবে বলে মনে করি না। আমাদের কথা হচ্ছে, সরকার দূষণ কামাতে অর্থ ব্যয় করবে, ঠিক আছে। কিন্তু, যাদের কারণে এ দূষণ, জনভোগান্তি তাদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ের দৃশ্যমান উন্নতি জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে।