গ্যাসকূপ খননে বাড়াবাড়ি

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫২ এএম

জ্বালানি খাতের উন্নয়নে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনকারী কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে ১৫০টি কূপ খননের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। জ¦ালানি মন্ত্রণালয় চায় পেট্রোবাংলা এই ১৫০টি কূপের পর আরও ১৫০টি কূপ খনন করুক। বাস্তবতা হচ্ছে প্রথম যে ১৫০টি কূপ খননের কথা বলা হচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে ৪৫টি পুরনো কূপের সংস্কার, যা কারিগরি দিক থেকে বলা হয় ‘ওয়ার্কওভার’। বাকি ১০৫টির মধ্যে ৫৯টি কূপ খননের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে কূপ খননের পরিকল্পনা ঘুরছে ৪৬টির মধ্যে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কূপ খননের আগে দ্বিতীয় ও তৃতীয় মাত্রার ভূকম্পন জরিপ এবং ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা করতে হয়, যা অনেক এলাকায় এখনো শেষ হয়নি।

বাপেক্স, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি (বিজিএফসিএল) এবং সিলেট গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি (এসজিএফসিএল) গত ২০ বছরে এত অল্প সময়ে এত বেশিসংখ্যক কূপ খনন করেনি। একই সঙ্গে নতুন করে আরও ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এত বেশিসংখ্যক কূপ খনন করার জায়গাই নেই দেশে। তা সত্ত্বেও সরকারের চাহিদামতো একটি খসড়া পরিকল্পনা জ্বালানি বিভাগে পাঠিয়েছে কোম্পানিগুলো। সব মিলিয়ে সরকারি গ্যাস উত্তোলন কোম্পানিগুলো এখন ৮১টি কূপ থেকে গ্যাস তুলছে।

পেট্রোবাংলা, বাপেক্স, বিজিএফসিএল এবং এসজিএফসিএল থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, বিগত সরকারের সময় গৃহীত পরিকল্পনার কিছু কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। এ পরিকল্পনার এক-তৃতীয়াংশ, ৪৫টি কূপ খনন নয়, ওয়ার্কওভার বা মেরামতের জন্য। পুরনো কূপ থেকে উত্তোলনের একপর্যায়ে যখন গ্যাস কমে আসে, তখন ওয়ার্কওভার করা হয়। এতে কোথাও কোথাও গ্যাসের উৎপাদন বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গ্যাসকূপ খননের সংখ্যা বাড়িয়ে দেখাতে ওয়ার্কওভারকেও খনন হিসেবে উল্লেখ করত। এখনো তাই করা হচ্ছে।

সরকারের ১৫০টি কূপ খনন পরিকল্পনাটি কার কাছে রয়েছে, জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, পেট্রোবাংলা থেকে সব বিষয় সমন্বয় করা হয়। তিনি (শোয়েব) গ্যাসকূপ খনন করে গ্যাস পাওয়ার পরের অংশ (পরিচালন) দেখেন। তিনি জানান, পরিকল্পনাটি রয়েছে তাদের পরিকল্পনা বিভাগের পরিচালকের দপ্তরে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (পরিকল্পনা) মো. আব্দুল মান্নান পাটওয়ারীর কাছে একই প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, পরিকল্পনাটি রয়েছে পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েবের কাছে। প্রকৌশলী শোয়েবকে উদ্ধৃত করে যখন এ প্রতিবেদক বলেন, ‘পরিকল্পনাটি পরিকল্পনা বিভাগেই অর্থাৎ আপনার কাছে রয়েছে,’ তখন আব্দুল মান্নান পাটওয়ারী দাবি করেন ‘না, এটি শোয়েবের কাছেই রয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে জানান, শিল্পে গ্যাসসংকট ঠেকাতে সরকার নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন ও ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে। তারেক রহমান বলেন, ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খনন, ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি সাইসমিক সার্ভে এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

১৫০টি গ্যাসকূপ খননে সরকারের পরিকল্পনার কথা গত এক মাসে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর দুই উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ও মাহদী আমিন আলাদাভাবে উল্লেখ করেছেন। 

সরকারের পক্ষ থেকে সংসদে যেসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়, সাধারণত সেসব তথ্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ জাতীয় সংসদের চাহিদামতো যাচাই-বাছাই করে সরবরাহ করার কথা। এ ক্ষেত্রেও জাতীয় সংসদে তথ্য সরবরাহ করার কথা জ্বালানি বিভাগের। আবার এ তথ্য জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে সরবরাহ করার কথা পেট্রোবাংলার। পেট্রোবাংলায় তথ্য আসার কথা তিনটি সরকারি গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কোম্পানি থেকে।

বাপেক্স : দেশের একমাত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলন কোম্পানি বাপেক্স। পরিকল্পনার ১৫০ কূপের মধ্যে ৮৯টিই বাপেক্সের। এ ৮৯টির মধ্যে ১৬টি ওয়ার্কওভার। বাকি ৭৩টি কূপের মধ্যে অনুসন্ধান কূপ ১৬টি, মূল্যায়ন ও উন্নয়ন কূপ ১৪টি এবং একটি উন্নয়ন কূপ। সব মিলিয়ে ৩১টি কূপ খননের প্রাথমিক পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়েছে। এ ছাড়া সাতটি কূপের কাজ শেষ হয়েছে।

বাকি ৩৫টি কূপের পরিকল্পনা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। অর্থাৎ কোথায় খনন করা হবে, কবে হবে, আদৌ খনন করা যাবে কি না এসব বিষয়ে এখনো বাপেক্সের কাছে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেই।

বাপেক্সের পরিকল্পনা ও আইসিটি বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রউফ বলেন, কূপ খনন করার আগে জরিপ ও সমীক্ষা করতে হয়। সেসব কাজ এখনো শেষ হয়নি। তাই ৩৫টি কূপ খননের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি।

গ্যাসকূপ খনন আর ওয়ার্কওভার একই জিনিস না হলেও কেন ওয়ার্কওভারকে খনন বলা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রথম যিনি বলেছেন, তিনি হয়তো ভুল করে বলে ফেলেছেন; এরপর সবাই বলছেন। এই প্রকল্প আগের সরকারের সময়েও নেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি।

বাপেক্স এখন সাতটি খনি থেকে দৈনিক ৭১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস তুলছে। বাপেক্সের উৎপাদনরত কূপের সংখ্যা ১৮টি।

বিজিএফসিএল : সরকারের ১৫০ কূপ খনন পরিকল্পনায় বিজিএফসিএলের ৩২টি কূপ রয়েছে। এর মধ্যে ১২টিই ওয়ার্কওভার। অর্থাৎ খনন করা কূপের মেরামত। ইতিমধ্যে পাঁচটি কূপের ওয়ার্কওভারের কাজ শেষ হয়েছে। বাকি সাতটির ওয়ার্কওভারের জন্য একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এই সাতটির মধ্যে পাঁচটির ওয়ার্কওভারের অনুমোদন পাওয়া গেছে। বাকি দুটির ওয়ার্কওভারের জন্য ডিপিডি তৈরি করা হচ্ছে।

৩২ কূপ থেকে ১২টি ওয়ার্কওভার বাদ দিলে বাকি থাকে ২০টি কূপ। এ ২০ কূপের মধ্যে একটি কূপ খনন ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। সেখান থেকে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। একটি কূপ (তিতাস-২৯)  খনন শেষে এখন টেস্টিং (পরীক্ষা) করা হচ্ছে। টেস্টিং শেষ হলে এখান থেকেও গ্যাস পাওয়ার আশা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে তিতাসে প্রথম ডিপ ড্রিলিং করা হচ্ছে। এখন কূপটি পাঁচ হাজার মিটার পর্যন্ত খনন করা হয়েছে। আরও ৬০০ মিটার খনন করা হবে। আরও দুটি কূপের (তিতাস-৩২, তিতাস-৩৩) খনন প্রকল্প অনুমোদনের জন্য আগামীকাল ২৫ অক্টোবর একনেকে ওঠার কথা রয়েছে। তিতাস-৩৪, তিতাস-৩৫ ও তিতাস-৩৬ খননের পরিকল্পনাও রয়েছে।

এর বাইরে বিজিএফসিএল হবিগঞ্জ এবং বানিয়াচংসহ আশপাশের এলাকায় তৃতীয় মাত্রার ভূকম্পন জরিপ করছে। এই জরিপের ফলের ওপর ভিত্তি করে ৪টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এখানে আরও ৮টি কূপের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

ওয়ার্কওভার কীভাবে খনন হয়, জানতে চাইলে বিজিএফসিএলের মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) প্রকৌশলী মো. আবুল কাসেম খান বলেন, কেউ হয়তো না বুঝে বলতে পারেন। তবে ওয়ার্কওভারেও গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। যেসব কূপের উৎপাদন কমে যায়, সেগুলো সংস্কার করে উৎপাদন বাড়ানো হয়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে কেউ বলতে পারেন।

পেট্রোবাংলার দৈনিক উৎপাদন প্রতিবেদন বলছে, বিজিএফসিএল পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্রের ৪৪টি কূপ থেকে এখন দৈনিক ৪৭৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করছে।

এসজিএফসিএল : এ কোম্পানির ২৯টি কূপ রয়েছে। ২৯ কূপের মধ্যে ১৩টির কাজ শেষ হয়েছে। এই ১৩টির মধ্যে ৮টি ওয়ার্কওভার। অনুসন্ধান ও মূল্যায়ন কূপ হচ্ছে পাঁচটি। ২৯ কূপের মধ্যে ১৩টির কাজ শেষ হলে বাকি থাকে ১৬টি কূপ। এই ১৬ কূপের মধ্যে আবার দুটি ওয়ার্কওভার। অর্থাৎ কূপ খনন করা হবে ১৪টি। এই ১৪টির মধ্যে আগামী ফেব্রুয়ারি ও এপ্রিলে দুটি কূপের খনন শুরু হতে পারে। বাকি ১২টি কূপের প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি ও স্থান নির্ধারণের কাজ চলছে।

এসজিএফসিএলের মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) প্রকৌশলী মো. একরামুল হক এ বিষয়ে জানান, এখন পর্যন্ত ৩৫টি কূপ খনন হয়েছে। এর মধ্যে ২৮টি কূপে গ্যাস পাওয়া  গেছে। এখন ১৯টি কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। বাকি কূপগুলো থেকে গ্যাস উত্তোলন করা যাচ্ছে না। কূপগুলো ওয়ার্কওভার করতে হবে। অর্থাৎ এখানেও ১০টি কূপের ওয়ার্কওভার করতে হবে।

জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার সাবেক পরিচালক মকবুল-ই-ইলাহী বলেন, ১৫০টি কূপের মধ্যে যদি ৪৫টি ওয়ার্কওভার হয়, তাহলে খননের সংখ্যা নেমে আসে ১০৫-এ। তবে কোনোভাবেই ওয়ার্কওভার নতুন কূপ খনন নয়। এটি পুরোনো কূপের সংস্কার।

তিনি বলেন, ১০৫টি কূপ কোথায় কোথায় খনন করা হবে, তা আগে নির্ধারণ করতে হবে। সেটি নির্ধারণ করার পর কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তা ঠিক করতে হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত