শেষের ‘শুরু’ যাত্রাশিল্পে

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৭ এএম

দেশের ঐতিহ্যবাহী যাত্রাশিল্প এখন নানা সংকটে। প্রশাসনিক অনুমতি পেতে জটিলতা, নতুন পালা মঞ্চায়নে অনীহা, আয়োজক সংকট এবং যাত্রা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণার কারণে কমেছে নিয়মিত প্রদর্শনী। নিবন্ধিত যাত্রাদলের সংখ্যা থাকলেও মাঠপর্যায়ে সক্রিয় দলের সংখ্যা নগণ্য। এতে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন যাত্রাশিল্পী, যাত্রাদল মালিক ও দলসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন কোনোমতে টিকে আছে ২০ থেকে ২৫টি যাত্রাদল। অথচ দেশে নিবন্ধিত যাত্রাদলের সংখ্যা ২ শতাধিক বেশি। সার্বিক পরিস্থিতিতে আগামী কয়েক বছরে যাত্রাশিল্পের সংকট আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। পাশাপাশি এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদ দিয়েছেন তারা।     

যাত্রা গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত যাত্রাদল রয়েছে ২২৭টি। এর মধ্যে প্রায় ১৯টি দলের মালিক মারা গেছেন। আরও ১৩ থেকে ১৪টি দলের নিবন্ধনের মেয়াদ শেষ হলেও নবায়ন করা হয়নি। চলতি মৌসুমে সংগঠিতভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে আনুমানিক ২০ থেকে ২৫টি দল।

যাত্রা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যাত্রা প্রদর্শনীর অন্যতম বাধা প্রশাসনিক অনুমতির জটিলতা। কোনো এলাকায় যাত্রার আয়োজন করতে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের মতামত বা প্রতিবেদন পেতে দেরি হলে আয়োজন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। দিনের পর দিন প্রশাসনে ধরনা দিতে হয়। কখনো স্থানীয় পর্যায়ের বিরোধিতার কারণেও আয়োজকেরা অনুষ্ঠান থেকে সরে আসেন। ফলে ব্যয় ও প্রস্তুতি নিয়েও শেষ পর্যন্ত প্রদর্শনী আয়োজন করা সম্ভব হয় না। অনুমতির অনিশ্চয়তায় দল মালিকেরাও নতুন পালা তৈরি, মহড়া ও নতুন শিল্পী যুক্ত করার ক্ষেত্রে আগ্রহ হারাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে পুরনো পালা নতুন নামে প্রচার করা হচ্ছে। এতে দর্শকেরও প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না। যাত্রার মূল পরিবেশনার বদলে নাচের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতাও শিল্পটির সংকট আর ঘনিভূত হচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিভিন্ন সময়ে যাত্রাশিল্পীদের প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। তবে যাত্রাশিল্পী ও গবেষকদের মতে, প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নিয়মিত প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা জরুরি। যাত্রার সংগীতনির্ভর পরিবেশনরীতি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে সংলাপ ও অভিনয়নির্ভর ধারাও পেয়েছে। এই বৈচিত্র্য ধরে রাখতে প্রয়োজন নতুন পালা, দক্ষ শিল্পী এবং নিয়মিত চর্চা।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, যাত্রাশিল্পকে সচল করতে অনুমতি প্রক্রিয়া সহজ করা, স্থানীয় পর্যায়ে আয়োজনের সুযোগ বাড়ানো, দলগুলোকে নতুন পালা তৈরিতে উৎসাহ দেওয়া এবং দর্শকের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। তাদের মতে, যাত্রার প্রতি নেতিবাচক ধারণা দূর করে শিল্পটির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও পরিবেশনাশৈলী তুলে ধরতে পারলে এ ঐতিহ্যবাহী শিল্পধারাকে আবারও সক্রিয় করা সম্ভব।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক কামাল উদ্দিন কবির বলেন, ‘যাত্রা নিয়ে সমাজের একটি অংশের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। বিশেষ করে আশির দশকের শেষ দিকে যাত্রায় “প্রিন্সেস’দের নাচের ব্যবহার বাড়ার পর এই ধারণা আরও প্রবল হয়। অথচ যাত্রা বাংলার নিজস্ব পরিবেশনাশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারা। এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে নাট্যশিক্ষার পাঠ্যক্রমে যাত্রার ইতিহাস, পালা ও পরিবেশনরীতি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।’ তিনি জানান, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের লোকসংগীত, নৃত্য ও নাট্যধারার সঙ্গে পরিচিত করতে ‘বাংলার গীতিরঙ্গ’ নামে একটি বিষয় যুক্ত করা হয়েছে।”

এদিকে যাত্রাশিল্পীদের জন্য নিয়মিত কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় অনেকে পেশা পরিবর্তন করেছেন। কেউ কেউ মৌসুমি আয়োজনের অপেক্ষায় থাকেন। তবে প্রদর্শনী অনিয়মিত হওয়ায় তাদের আয় ও পেশাগত ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যাত্রার আয়োজন কমে যাওয়ার পেছনে গ্রামীণ মেলা ও উৎসবের সংখ্যা কমে যাওয়াকেও একটি কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে শীতকালীন গ্রামীণ আয়োজনে যাত্রাপালা নিয়মিত মঞ্চস্থ হতো। এখন অনেক এলাকায় সেই আয়োজন নেই। ফলে দলগুলোর প্রদর্শনীর সুযোগও সীমিত হয়েছে।

‘দেশ অপেরা’র প্রদীপ কান্তি দে বলেন, ‘দেশের যাত্রা দলগুলো এখনো কোনো রকমে টিকে আছে।’ যাত্রা গবেষক, পালাকার ও যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদের সহসভাপতি এম এম মজিদ বলেন, ‘দুর্গাপূজার সপ্তমী থেকে চৈত্র মাসের শেষ দিন পর্যন্ত যাত্রার মূল মৌসুম। এখনো মেলা, পূজা ও স্থানীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে যাত্রার আয়োজন হচ্ছে, তবে তা আগের তুলনায় অনেক কম। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের বড় মেলাগুলোতে একসময় নিয়মিত যাত্রাপালা হতো। মাসব্যাপী মেলায় একাধিক দল পালাক্রমে মঞ্চায়নের সুযোগ পেত। এখন মেলা কমে যাওয়ায় যাত্রার মঞ্চায়নও কমেছে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত