অক্টোবরের বঙ্গোপসাগর ১৩৫ বছরে ১৯ ঘূর্ণিঝড়

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৮ এএম

ঘূর্ণিঝড় ‘মোনথা’ গত বছরের ২৮ অক্টোবর ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আঘাত করেছিল। এর আগে ঘূর্ণিঝড় ‘দানা’ ভারতের ওড়িশা উপকূলে আঘাত করেছিল ২০২৪ সালের ২৫ অক্টোবর। শুধু এই দুটি নয় বিগত ১৩৫ বছরের ইতিহাসে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ৯৭টি ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে ৭৮টি আঘাত করেছে অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশা উপকূলে এবং ১৯টির গন্তব্য ছিল বাংলাদেশ উপকূল। এর মধ্যে ২০২২ সালের ২৫ অক্টোবরের ‘সিত্রাং’ ভোলা উপকূলে আঘাত করেছিল। তাহলে এবার সৃষ্ট হতে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়ের গন্তব্য কোন দিকে?

ঘূর্ণিঝড় নিয়ে সবচেয়ে বেশি গবেষণা করা আবহাওয়াবিদদের মধ্যে অন্যতম হলেন ড. আবুল কালাম মল্লিক। আবহাওয়া অধিদপ্তরের এই সিনিয়র আবহাওয়াবিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজ রাতে (গতকাল শনিবার) নিম্নচাপ এবং আগামীকাল (রবিবার) গভীর নিম্নচাপে রূপ নেওয়া ঝড়টি রবিবার মধ্যরাতের পর বা সোমবার সকালে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে।’

ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিলে এর গতিপথ কী হবে? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ১৯৭১ সাল থেকে এ পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে ৬৪টি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হলেও এর মধ্যে মাত্র ১৩টি ঘূর্ণিঝড়ের গন্তব্য ছিল বাংলাদেশ উপকূলে। অর্থাৎ আমাদের উপকূলে এই সময়ের ঝড় কম আসে।

এবার সৃষ্ট হতে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়টি কি বাংলাদেশ উপকূলে আসতে পারে? এই প্রশ্নের জবাবে আবুল কালাম মল্লিক বলেন, এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে না আসার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ তখন নিম্নচাপ সৃষ্টির কেন্দ্রে পশ্চিমা ঘূর্ণিবাত বাতাসের যে গতি ও অবস্থান থাকবে তা আমাদের (উত্তর-পূর্ব) দিকে বাঁক নেওয়ার পর্যায়ে থাকবে না। ঊর্ধ্বাকাশের ওই বাতাসই ঘূর্ণিঝড়ের দিক নিয়ন্ত্রণ করে।’

ঊর্ধ্বাকাশের সেই বাতাস সম্পর্কে জানতে কথা হয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক সমরেন্দ্র কর্মকারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়ের দিক মূলত নির্ভর করে ভূ-পৃষ্ঠের ৩০ থেকে ৪০ হাজার ফুট ওপরে থাকা উল্টো ঘূর্ণিঝড়ের বাতাসের ওপর। সেই উল্টো ঘূর্ণিঝড়ের দিক মূলত পথ দেখিয়ে দেয় সাগরে সৃষ্ট হওয়া ঘূর্ণিঝড়টি কোন দিকে বাঁক নেবে। যদি সেই উল্টো ঘূর্ণিঝড়ের অবস্থান বাংলাদেশ কিংবা ভারতের বিহারের ওপর থাকে তাহলে তা বাংলাদেশের দিকে বাঁক নিয়ে থাকে। তবে অক্টোবরের বেশিরভাগ ঘূর্ণিঝড়ের দিক থাকে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ-ওড়িশার দিকে।’

তিনি আরও বলেন, ২০২২ সালের ২৫ অক্টোবরে ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’ বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত করলেও ২০২৪ ও ২০২৫ সালে অক্টোবরের দুটি ঘূর্ণিঝড় ভারতে আঘাত করেছিল। ২০২৪ সালে ২৫ অক্টোবর আঘাত করা ‘দানা’র ক্ষেত্রে দেখা যায় সেই উল্টো ঘূর্ণিঝড় স্থির ছিল। আর তা স্থির থাকার কারণে সাগরের ঝড়টি তার নির্ধারিত গতিপথে এগিয়ে গেছে। এখানে কোনো বাঁক নেয়নি।’

এবার বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত করার অনুকূল পরিবেশ না থাকার কথা উল্লেখ করে আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আবহাওয়ার যে অবস্থা এবং ঊর্ধ্বাকাশের বাতাসের গতির যে বিশ্লেষণ তাতে আসন্ন ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশ উপকূলে আসার সম্ভাবনা কম। তবে এর প্রভাবে বৃষ্টি হবে।’

বুধবারের পর বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে : কবে নাগাদ বৃষ্টি হতে পারে জানতে চাইলে আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক বলেন, সোমবার ও মঙ্গলবার চট্টগ্রামসহ দেশের উপকূলীয় এলাকায় হালকা বৃষ্টিপাত হলেও মঙ্গলবারের পর থেকে দেশের রংপুর, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ ও খুলনা বিভাগে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে।

বুধবারের পর বৃষ্টি কেন বাড়বে? এই প্রশ্নের জবাবে আবহাওয়াবিদ ড. ওমর ফারুক বলেন, ঘূর্ণিঝড়টি ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে উঠতে পারে বুধবার। উপকূলে উঠে তা স্থল নিম্নচাপে রূপ নিয়ে উত্তর দিকে অগ্রসর হওয়ার পর বৃষ্টির তীব্রতা বাড়বে। স্থল নিম্নচাপ হওয়ার আগে উপকূলে হালকা বৃষ্টি হতে পারে।

নিম্নচাপটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিলে নাম হবে ‘অর্ণব’ : পূর্ব-মধ্য ও তৎসংলগ্ন দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগর এলাকায় সৃষ্ট লঘুচাপটি সুস্পষ্ট লঘুচাপে পরিণত হয়েছে। এটি আরও উত্তর ও উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এর অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ফোরকাস্টিং কর্মকর্তা ড. ওমর ফারুক বলেন, সুস্পষ্ট লঘুচাপটি আজ (গতকাল শনিবার) রাতে নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। পরবর্তী সময়ে রবিবার গভীর নিম্নচাপ ও সোমবার সকালে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। যদি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয় তাহলে এর নাম হবে ‘অর্ণব’।

অর্ণব শব্দের অর্থ কী জানতে চাইলে আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুুল হক বলেন, এই নামটি বাংলাদেশের দেওয়া। এর অর্থ হলো ওশান বা সমুদ্র। 

অপরদিকে ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটেও বলা হয়েছে লঘুচাপটি আজ রাতে (গতকাল শনিবার) নিম্নচাপে রূপ নেওয়ার পর রবিবার গভীর নিম্নচাপ, সোমবার সকালে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিয়ে বুধবারে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আঘাত করতে পারে।

অক্টোবরের যত ঘূর্ণিঝড় : আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে পাওয়া এক উপাত্তে দেখা যায়, ১৮৯১ সাল থেকে গতকাল পর্যন্ত ১৩৫ বছরে বঙ্গোপসাগরে অক্টোবর মাসে ৯৭টি ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয়েছে। এই ৯৭টি ঝড়ের মধ্যে ৭৮টি ঘূর্ণিঝড়ের গন্তব্য হয়েছে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশা উপকূল, বাকি ১৯টি ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত করেছে। আবার বাংলাদেশে আঘাত করা ১৯টি ঘূর্ণিঝড়ের প্রায় সবগুলোর গন্তব্য ছিল দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকা। শুধু অক্টোবর নয়, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসের ঘূর্ণিঝড়গুলোর বেশিরভাগের গন্তব্য দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল। ১৯৭০ সালের ১৩ নভেম্বরের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় কিন্তু গিয়েছিল ভোলার ওপর দিয়ে। এছাড়া ২০০৭ সালের ১৬ নভেম্বরের ‘সিডর’ কিন্তু আঘাত করেছিল বরগুনার ওপর দিয়ে। ২০২২ সালের ২৪ অক্টোবরের ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’ আঘাত করেছিল ভোলায়। ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ আঘাত করেছিল খুলনায় এবং ২০১৮ সালের ১১ অক্টোবরের ‘তিতলি’ আবার ওড়িশার ভুবনেশ্বরে আঘাত করেছিল।

উল্লেখ্য, বঙ্গোপসাগরে বর্ষার আগে (এপ্রিল-মে) ও বর্ষার শেষে (সেপ্টেম্বর-নভেম্বর) এ সময় ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়। চলতি মাসের আবহাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসেও দুই থেকে তিনটি লঘুচাপ বা নিম্নচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এদের মধ্যে একটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে বলে বলা হয়েছিল। এর আগে গত মাসেও একটি গভীর নিম্নচাপও ভারতের আন্দামান হয়ে মিয়ানমার উপকূলে আঘাত করেছিল।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত