হাওরে লতাফুটকি

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৯ এএম

ছয় ঋতুর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমাদের হাওরগুলো দিব্যি বদলে যেতে থাকে। শীতে এক রকম তো বর্ষায় আরেক রকম। আবার বসন্ত-গ্রীষ্ম কিংবা শরৎ-হেমন্তেও বদলে যায় এর রূপ। এই বদলে যাওয়া রূপ আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উদ্ভিদ বৈচিত্র্যের সন্ধানে প্রায়ই ছুটে যাই টাঙ্গুয়ার হাওরে। সেখানে সর্বশেষ যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা বলছি সোলেমানপুর বাজার থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় প্রায় ঘণ্টা দেড়েক চলার পর বাঁ পাশে একটি হিজল বনে থামি। হুড়হুড়ি আর ঘাগরার পাশে খুঁজে পাই গোলাপের একটি ঝাড়। কিছুক্ষণের মধ্যে পৌঁছে যাই গোলাবাড়ি ক্যাম্প লাগোয়া বাঁধে। নৌকা রেখে হাঁটতে শুরু করি। হাওরের এদিকটা বেশ নির্জন। হিজল, করচ, বরুনের দীর্ঘ সারি। পাশেই ঢালু অংশে বিচিত্র লতাগুলোর ঠাস বুনন। সে দিকে চোখ রেখেই হাঁটতে থাকি। হাঁটতে হাঁটতে পেয়ে যাই দুর্লভ বুনো স্ট্রবেরির ফুল ও ফল। তার পাশেই একটি লতানো গাছে কিছু সুদর্শন ফল। মাটিতে গড়ান লতায় এমন সুদর্শন ফল আগে এখানে দেখিনি। দেখতে ফুটকা বা ফটকার মতোই। কিন্তু ফটকা গাছ বীরুৎ শ্রেণির। আর এটি হলো লতানো। প্রায় একই রকম লতা দেখেছি নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিন বোটানিক গার্ডেনে। ঢাকায় ফিরে উদ্ভিদবিষয়ক বই থেকে গাছটির পরিচয় পাওয়া গেল লতাফুটকি। স্থানীয়ভাবে ফুটকা, কপালফুটকি, নোয়াফুটকি, কানফুটকি ইত্যাদি নামেও পরিচিত। প্রতিবছর হাওরে পানি শুকিয়ে গেলে প্রাকৃতিকভাবেই জন্মে।

লতাফুটকি (Cardiospermum halicacabum) বর্ষজীবী বা বহুবর্ষজীবী লতা। পত্রবৃন্ত ২ থেকে ৪ সেমি লম্বা ও খাঁজযুক্ত। উপপত্র বল্লমাকার, পত্র ৩-খন্ডিত এবং পক্ষলভাবে খন্ডিত। খন্ডক এবং শীর্ষ ক্ষুদ্র খাঁজযুক্ত। পুষ্পবিন্যাস আম্বেল, হালকাভাবে রোমশ, ৪ থেকে ১২ সেমি লম্বা, মঞ্জরিদ- ৭ থেকে ১০ সেমি লম্বা, একটি অপ্রকৃত আবর্ত দ্বারা প্রসারিত যা তিনটি ছড়ানো মঞ্জরিপত্র যুক্ত। মঞ্জরিপত্র বল্লমাকার থেকে উপবৃত্তাকার, ১ থেকে ২ মিমি লম্বা। ফুল ২ থেকে সাড়ে ৩ মিমি লম্বা। বৃত্যংশ ৪টি, লাল দাগবিশিষ্ট সবুজ, বাহিরের জোড়া প্রশস্ত, কিনারা সাদা। পাপড়ি বিডিম্বাকার থেকে বর্তুলাকার, শীর্ষ সামান্য খাঁজযুক্ত। শীর্ষ গোলাকার, হুড আকৃতির। চাকতি রোমহীন, পুংকেশর আটটি, পরাগধানী শূন্য দশমিক ৫ মিমি লম্বা, উপবৃত্তাকার, হলুদ।

ফল ৩-খন্ডিত গোলাকার, দেড় থেকে ৪ সেমি চওড়া, সবুজ, গোড়া লালাভ, রোমশ। বীজ ছোট, কালো ও মসৃণ। ফুল ও ফলের মৌসুম নভেম্বর থেকে জুন মাস পর্যন্ত। এ গাছের মূল এবং বীজতেল বাতের চিকিৎসায় কার্যকর। এ ছাড়া পাতার রস ডায়াবেটিস ও স্ত্রীরোগে ব্যবহার্য। গাছের কচি অংশ সবজি হিসেবে খাওয়া হয়। আদিবাসীরা গর্ভপাতের জন্য এ গাছের বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে।

লেখক : প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত