সাজেকে কাটেনি নিরাপত্তা শঙ্কা, পর্যটন ব্যবসায় ধস

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০১ এএম

সহিংসতা ও অবরোধে নাকাল জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক। স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীরা স্বপ্ন দেখেছিলেন ঘুরে দাঁড়ানোর। কিন্তু তাদের  স্বপ্নে তৈরি হয়েছে নতুন সংকট। এবার আগুনের শিখা নয়, আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব, সড়ক অবরোধ ও গোলাগুলির ঘটনায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সাজেকের পর্যটন ব্যবসা। অবনতি হয়েছে নিরাপত্তা পরিস্থিতিরও। ফলে আটকেপড়া অনেক পর্যটককে ফিরতে হয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রহরায়।

দুর্গাপূজার টানা ছুটিতে যখন পর্যটকদের আগমনে ব্যবসা জমে ওঠার কথা, তখন অধিকাংশ রিসোর্ট-কটেজের বুকিং বাতিল করতে হয়েছে। পর্যটকশূন্য হয়ে পড়ে পাহাড়ের জনপ্রিয় এই গন্তব্য। চলতি মাসে ইউপিডিএফ সমর্থিত দুটি সংগঠনের ডাকে তিন দফার অবরোধে তছনছ সাজেকের পর্যটন। পূজার টানা ছুটির সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, এতে দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ কোটি টাকা। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ, পর্যটকদের ওপর হামলার ঘটনায় দীর্ঘমেয়াদে সাজেকের পর্যটনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

জানা গেছে, মূলত আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ইউপিডিএফ ও জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র গ্রুপ মুখোমুখি অবস্থান নেওয়ায় এই বিপর্যয়। স্থানীয়রা জানান, রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার বেশিরভাগ অংশের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)-এর। সম্প্রতি বাঘাইছড়ি উপজেলার বাঘাইহাট-সাজেক সড়কের মাচালং এলাকার থালকুম্ভো, চিল্ল্যাতুলি, নোয়াপাড়া, লাম্বাবাক ও ভুয়োছড়ি এসব এলাকায় ঢুকে পড়ে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি। এতে বেকায়দায় পড়ে ইউপিডিএফ। স্থানীয়রা বলেন, হারানো অবস্থান ফিরে পেতে ইউপিডিএফ বিভিন্ন ছায়া সংগঠনের মাধ্যমে অবরোধ ডেকে অচলাবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তারা জানান, মাসখানেক আগেও এসব এলাকায় দিনব্যাপী থেমে থেমে গোলাগুলি হয়েছে। এতে শিশুসহ অনেকেই আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের ব্যানারে অবরোধকারীরা তিন দফা দাবি জানিয়েছেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে সাজেক থেকে জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া, স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের বাড়িঘরে তল্লাশি বন্ধ করা। সংগঠন দুটি এসব দাবিতে প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে বক্তব্য তুলে ধরেছে। অন্যদিকে ইউপিডিএফও এক বিবৃতিতে একই ধরনের দাবি জানিয়ে সশস্ত্র সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

সন্তু লারমা নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরে ইউপিডিএফের নির্যাতন, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও  জেএসএসের কর্মীদের হত্যার ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দারা অতিষ্ঠ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। এ কারণে ইউপিডিএফের সদস্যরা কিছু এলাকা থেকে পিছু হটেছেন।

অন্যদিকে ইউপিডিএফের মুখপাত্র অংগ্য মারমা বলেন, অবিলম্বে সাজেকবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দুই সংগঠনের ন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে উক্ত এলাকা থেকে জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যকে সরিয়ে নিতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান তিনি।

গত বৃহস্পতিবার গুলিবর্ষণের ঘটনার পর এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা তথ্য উদ্ধৃত করে রাঙ্গামাটি পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব জানান, ইউপিডিএফের সশস্ত্র গোষ্ঠী পর্যটকদের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি করে। পরে জানমালের স্বার্থে ও পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও পাল্টা গুলি বর্ষণ করে।

সাজেকের বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে পাহাড়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষক হেফাজত সবুজ বলেন, প্রকাশ্যেই যাই বলা হোক না কেন, সাজেকের ঘটনার জন্য মূলত পাহাড়ের প্রভাবশালী দুটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের আধিপত্য বিস্তারের লড়াই-ই মূল কারণ। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পুরো এলাকাটি ইউপিডিএফের নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে জনসংহতি সমিতির উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। যা ইউপিডিএফ মানতে পারছে না। ফলে ইউপিডিএফ তার দুটি ছায়া সংগঠনকে মাঠে নামিয়েছে।

পূজার ছুটিতেও ব্যবসা নেই : সাজেকের পর্যটন ব্যবসা মূলত মৌসুমনির্ভর। শীতের শুরুতে এবং বিভিন্ন সরকারি ছুটি ও উৎসবে এখানে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ে। দুর্গাপূজার ছুটি ও শীত মৌসুমের আগমনে এবারও ব্যবসায়ীরা ভালো আয়ের আশা করেছিলেন। অনেক রিসোর্ট ও কটেজে আগাম বুকিং ছিল। কিন্তু নিরাপত্তার কারণে পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা এবং অবরোধের ফলে  পর্যটকরা সেই বুকিং বাতিল করেছেন।

জানা গেছে, বর্তমানে সাজেকে ১৩৫টি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে ২০টির বেশি রেস্তোরাঁ। এসব প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বিভিন্ন ব্যবসা ও পর্যটনসেবার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন প্রায় হাজারখানেক কর্মচারী ও ব্যবসায়ী।

সাজেক কটেজ মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা জন বলেন, অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে সাজেকের সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে। মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হলে পর্যটক কমে যাবে। এতে অনেকের কর্মসংস্থানও হুমকির মুখে পড়বে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে সমন্বয় করে সাজেকের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদারের দাবি জানান তিনি।

দীর্ঘমেয়াদে পর্যটনে আস্থার সংকট : সাজেকের পর্যটন ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, অবরোধ ও সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে ক্ষতি শুধু চলতি মৌসুমে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলে ভবিষ্যতে আগাম বুকিংও কমতে পারে। তারা বলেন, পর্যটকরা বিকল্প গন্তব্য বেছে নিলে সাজেকের পর্যটনকেন্দ্রিক অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়বে।

পর্যটনসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বর্তমান অবস্থায় প্রশাসনের সামনে তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জস্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সড়কে চলাচল নির্বিঘœ করা এবং সংঘাতের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো। তারা একই সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে অবরোধকারীদের দাবি যাচাই করে সমস্যা সমাধানেরও উদ্যোগ প্রত্যাশা করেন।

রাঙ্গামাটি প্রেস ক্লাবের সভাপতি আনোয়ার আল হক সংঘাত কমাতে অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি অস্ত্রধারীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার দাবি জানিয়ে বলেন, অপরাধীকে  আইনের আওতায় আনা গেলে সংঘাত কমবে।

রাঙ্গামাটিতে অর্ধদিবস অবরোধ পালিত :  এদিকে সাজেকে অবরোধ কর্মসূচিতে হামলা, লাঠিচার্জ এবং ঘরবাড়ি ও  দোকানপাট ভাঙচুরের অভিযোগের প্রতিবাদে গতকাল শনিবার  রাঙ্গামাটিতে আধাবেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধ পালিত হয়েছে। গতকাল ভোর পাঁচটা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এই কর্মসূচির পালন করে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ, সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন। অবরোধের সমর্থনে রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল।

অবরোধ চলাকালে সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে পিকেটাররা অবস্থান নেয়। এ ছাড়া বাঘাইছড়ি উপজেলার বিভিন্ন সড়কে আগুন জ¦ালিয়ে অবরোধ করতে দেখা গেছে। তবে অবরোধের মধ্যেও রাঙ্গামাটি থেকে চট্টগ্রামমুখী সব ধরনের যান চলাচল স্বাভাবিক ছিল। স্বাভাবিক ছিল বিভিন্ন উপজেলাগামী লঞ্চ চলাচলও।

রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. ইয়াকুব বলেন, প্রতিদিন গাড়ি যেভাবে চলাচল করে, ওইভাবেই চলাচল করেছে। অবরোধের প্রভাব রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে নেই।

এদিকে ছাত্র জনতার সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি উষাতন চাকমা সংবাদ মাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে আধাবেলা অবরোধ কর্মসূচি সফল করতে সহযোগিতা করায় রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার সর্বস্তরের জনসাধারণ এবং যানবাহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

সাজেকে পাঁচ দফা দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান দুই সংগঠনের : এদিকে রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে জেএসএস সন্তু লারমা গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া, মামলা প্রত্যাহার এবং ২২ অক্টোবরের হামলার বিচার বিভাগীয় তদন্তসহ পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন। গতকাল শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠন দুটির নেতারা এসব দাবি জানান।

বিবৃতিতে সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা বলেন, গত ২২ অক্টোবর শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধ কর্মসূচিতে হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি দিতে হবে। একই সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনা সাজিয়ে ৩০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও এক হাজার ব্যক্তির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার এবং ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্তেরও দাবি জানান।

বাবুধন চাকমা ও নতুন জয় চাকমা অবিলম্বে পাঁচ দফা দাবি মেনে নিতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, দমন-পীড়ন চালিয়ে সাজেকবাসীর ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন দমিয়ে রাখা যাবে না।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত