মহৌষধি শালপানি

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১১ এএম

‘ত্রিকটু ত্রিফলা পঞ্চতিক্ত দশমূল

শালপানি বেড়েলা ইত্যাদি

সদ্যতোলা চৌষট্টি মশলাযোগে

পরম শুদ্ধাচারে,

যে মহাভেষজ হবে প্রস্তুত,

তাতেই হবে সুফল;

আর সে ফল হবেঅত্যাশ্চর্য অদ্ভুত !’

যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত (প্যাথিবিভ্রাট : নিশান্তিকা)

শরত শেষের এক সকালবেলায় তিনজন বের হলাম ঢাকা থেকে সাভারের উদ্দেশে। যানজটশূন্য ভোরবেলায় মাত্র আধা ঘণ্টাতেই পৌঁছে গেলাম সেখানে। নোমান ফারুক ভাই বললেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় এক কাপ চা মনে হয় খাওয়া যায়, গরুর দুধের চা! ঢাকায় তো টিনের গরুর দুধ খাই। চলেন, গরুর দুধের ঘ্রাণমাখা সে চা-টা খেয়ে আসি। একেবারে ফাঁকা ক্যাম্পাস। সবসময়ই সে ক্যাম্পাসটায় গেলে একটা বিশেষ আকর্ষণ বোধ করি। গ্রামের মতো মনে হয়। সবুজ গাছপালায় ভরা এক চমৎকার শ্যামলতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। পথের পাশে বেশ কয়েকটা ঝোপের মধ্যে চোখে পড়ল শরতের প্রতিনিধি এক ফুলকে। ডাটির মাথায় কয়েকটা করে গাছে ফুটে রয়েছে ভেরি আকৃতির সাদা ফুল। দূর থেকে দেখেও চেনা যায়। কেননা, শরত এলেই সাভারের লালচে মাটির জঙ্গলে প্রাকৃতিকভাবে গজিয়ে ওঠা এসব বনফুল শরতের বিজয় কেতন ওড়ায়। চা পান করে ফেরার পথে সেসব কেমুক ফুলের ছবি তোলার জন্য নামলাম। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক হলের পাশে ঝোপঝাড়ের মধ্য দিয়ে একটা সরু মেঠোপথ নেমে গেছে। বাঁয়ে হল-ভবন, ডাইনে বাইদ। দুইয়ের মাঝে ঢালে রয়েছে অনেকগুলো কেমুকগাছ। কিন্তু সেসব গাছের কাছে পৌঁছানোর আগেই দেখা পেলাম আর এক বনফুলের, নাম তার শালপানি। শালবনে প্রধানত জন্মে, পাতাগুলোও দেখতে শালপাতার মতো আকৃতির, যদিও সে পাতা শালপাতার চেয়ে বেশ ছোট, গাছও অনেক ছোট। পত্রগত মিলের কারণে এর বাংলা নাম রাখা হয়েছে শালপানি, শালপর্ণী বা শালানি। 

শালপানি নামটা পেলাম কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত (১৮৮৭-১৯৫৪)-এর ‘নিশান্তিকা’ কাব্যের প্যাথিবিভ্রাট কবিতায়। সে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছিল কলকাতা থেকে ১৯৫৭ সালে। প্যাথিবিভ্রাট কবিতাটিতে সনাতন সার্বভৌমের একমাত্র কন্যা ভারতী অসুস্থ হয়ে পড়লে তার চিকিৎসার জন্য আয়ুর্বেদরতœ মহাভিষক্শাস্ত্রী মহাশয়ের ডাক পড়ে। তিনি চিকিৎসার ভার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কন্যার চিকিৎসা চালাতে লাগলেন। চিকিৎসার্থে যেসব গাছগাছড়া তিনি ব্যবহার করেছিলেন সেগুলোর মধ্যে শালপানিও ছিল।

শালপানি যে প্রাচীনকাল থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঔষধি গাছ তার উল্লেখ রয়েছে বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থে। সেসব প্রাচীন শাস্ত্র বা গ্রন্থগুলো রচিত হয়েছিল সংস্কৃত ভাষায়। সে কারণে সেখানে বাংলা শালপানি নামটি সরাসরি নেই, আছে সংস্কৃত বা আয়ুর্বেদিক নামে। শালপানির নাম সেখানে ‘পৃশ্নিপর্ণী’। এটি হলো আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সুপরিচিত ভেষজ। বৈদিক যুগ থেকেই এই ভেষজটির বর্ণনা ও উল্লেখ পাওয়া যায়। চরক সংহিতা, সুশ্রুত সংহিতা, অষ্টাঙ্গ হৃদয় এবং চিকিৎসা মঞ্জরি এই গ্রন্থগুলোতে এর বিভিন্ন ঔষধি গুণাগুণ ও ব্যবহারের কথা বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে। অষ্টাঙ্গ হৃদয়ে এটিকে ‘অংশুমতিদ্বয়’-এর অন্যতম এবং ‘দশমূল’ নামক ভেষজ সমষ্টির একটি উপাদান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ‘নিঘণ্টু’ বা আয়ুর্বেদীয় অভিধানেও পৃশ্নিপর্ণীর সমার্থক নাম, গুণাগুণ ও ব্যবহার সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। এ উদ্ভিদটির অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, হৃদযন্ত্র সুরক্ষাকারী, অ্যান্টি-হাইপারট্রফিক, আলসার-প্রতিরোধী, যকৃৎ সুরক্ষাকারী, স্মৃতিশক্তি বর্ধনকারী, ক্ষত নিরাময়কারী ও প্রদাহ-প্রতিরোধী গুণাবলি বিদ্যমান বলে জানা গেছে।

‘পৃশ্নিপর্ণী’ অর্থ হলো ছোট আকারের উদ্ভিদ যার সুনির্দিষ্ট ধরনের পাতা রয়েছে। অন্য নাম প্রপর্ণী, পর্ণিকা, উপচিত্রা, বর্তি, স্নিগ্ধপর্ণী, অংশুমতী, চিত্রপর্ণী, নারিন্দা, দীর্ঘমূলী, সিংলাঙ্গলী, শ্রেষ্ঠা ইত্যাদি। ভারতীয় অমরকোষ, শব্দকল্পদ্রুম, নামরূপবিজ্ঞানম প্রভৃতি গ্রন্থে শালপানির এসব নাম পাওয়া যায়। এর ইংরেজি নাম Sal-leaved Desmodium  ও উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Desmodium gangeticum, গোত্র ফ্যাবেসি, অর্থাৎ এটি শিমগোত্রীয় উদ্ভিদ। এটি একটি সোজাভাবে দ-ায়মান ও বহু শাখাবিশিষ্ট গুল্ম বা বিরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ, উচ্চতা ৯০-১২০ সেন্টিমিটার। কান্ড খাটো ও কাষ্ঠল, নরম ও ধূসর রোম দ্বারা আবৃত। এর প্রধান মূলটি দুর্বল বা অনুন্নত প্রকৃতির হলেও পার্শ্বীয় মূলগুলো বেশ সুগঠিত ও স্পষ্ট। শাখা-প্রশাখা অসংখ্য এবং মাটিতে ছড়িয়ে পড়া বা শায়িত প্রকৃতির উদ্ভিদ। পাতা দেখতে সরল হলেও আসলে সেগুলো একক-পত্রকযুক্ত যৌগিক, ফলক পাতলা, ডিম্বাকার, আয়তাকার বা বর্শাকৃতির, অগ্রভাগ সূক্ষ্ম বা সুচালো। লম্বা শীষের মতো মঞ্জরিতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সাদা রঙের মটর ফুলের মতো ফুল ফোটে। হালকা গোলাপি বা বেগুনি রঙের ফুলও হয়। ফল চ্যাপ্টা, গুচ্ছিত, সূক্ষ্ম আঁকশির মতো রোমযুক্ত। বীজ ছোট, ফ্যাকাশে হলুদ ও বৃক্কাকৃতির। বীজ থেকে চারা হয়।

লেখক : কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত