নিজেদের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ব্যর্থতার দায় বিরোধীদের ওপর চাপিয়ে সরকার জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন দিকে সরানোর চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান।
গতকাল রবিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে জামায়াত আয়োজিত ‘জুলাই সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আলোচনা সভায়’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, চাঁদাবাজি ও দখলদারত্ব বন্ধ করতে না পারা, দ্রব্যমূল্যের চাপ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার দায় সরকারকেই নিতে হবে। চাঁদাবাজিতে অভিযুক্ত সংসদ সদস্যকে পদত্যাগ করানোর মাধ্যমে জনসমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করলেও শুধু পদত্যাগের মধ্য দিয়ে অপরাধের বিচার শেষ হতে পারে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
তিনি বলেন, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশে পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার মূল লক্ষ্য ছিল একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়বিচারভিত্তিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। কিন্তু জনগণের সেই প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি। বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়ে গেছে এবং বৈষম্য আরও বাড়ছে। যে পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা নিয়ে তরুণরা জীবন দিয়েছেন, সেই আকাক্সক্ষার বাস্তব প্রতিফলন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কারের প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, দীর্ঘ সাত মাসেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের আলোচনার মধ্য দিয়ে অধিকাংশ বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল। কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য
থাকলেও সনদ বাস্তবায়নের একটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে নির্বাচন ও সংস্কার কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দেয়। জামায়াতের অবস্থান ছিল, আগে প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করতে হবে, এরপর সংসদ নির্বাচন হবে। কিন্তু একই দিনে দুটি নির্বাচন বা কার্যক্রম আয়োজনের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বিষয়গুলো একসঙ্গে মিশিয়ে ফেলা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনের কথা বলা হলেও প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগে কোনো ধরনের সমঝোতা প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কমিটির সঙ্গে বিরোধী দলের আলোচনায় বসা উচিত। জনগণের সঙ্গে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকেই নিতে হবে। অতীতে সংবিধান সংশোধনের পর আদালতে তা বাতিল হওয়ার নজির রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমন কোনো প্রক্রিয়ায় এগোনো উচিত নয়, যাতে শেষ পর্যন্ত সংস্কারের উদ্যোগ আইনি জটিলতায় পড়ে ব্যর্থ হয়।
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, অতীতের রাজনৈতিক আন্দোলন ও পরিবর্তনের ইতিহাস ভুলে গেলে চলবে না। এক সময় রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ আয়োজনের ক্ষেত্রেও বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে আন্দোলন করতে হয়েছে, মিছিল করতে হয়েছে এবং রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম চালাতে হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমান পরিস্থিতিতে জনগণের অধিকার ও সংস্কারের প্রশ্নকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিরোধীদলীয় নেতা অভিযোগ করে বলেন, সরকারের বিভিন্ন ব্যর্থতা আড়াল করতে বিরোধীদের বিরুদ্ধে নতুন বয়ান তৈরির চেষ্টা চলছে। সরকারের দায়িত্ব পালনে ঘাটতি থাকলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করার পরিবর্তে বিরোধীদের দোষারোপ করা হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার দায় কেন বিরোধী দলের ওপর চাপানো হবে? সরকারের ভুলত্রুটি থাকলে তা স্বীকার করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই দায়িত্বশীল আচরণ।