মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির আলোচনা শুরু

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫২ এএম

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) প্রথম দফার আলোচনা শুরু হচ্ছে। এ জন্য মালয়েশিয়ার ৩০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসছে আজ (সোমবার)। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে ওই দেশের বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের (এমআইটিআই) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ড. রশিদি সাইদের।

জানা গেছে, গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের সময় দুই দেশের সরকারপ্রধান এফটিএ আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছিলেন। ওই সফরের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয় ২০২৭ সালের মধ্যে একটি ব্যাপক, ভবিষ্যৎমুখী ও পারস্পরিকভাবে লাভজনক এফটিএ সম্পন্ন করার অঙ্গীকার করেছে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া। এই সফরের চার মাসের মধ্যে প্রথম দফার আলোচনা ও নেগোসিয়েশন শুরু হতে যাচ্ছে আগামীকাল মঙ্গলবার।

এদিকে এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু প্রকাশ করা হয়নি। তবে মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ আলোচনা এগিয়ে যাবে। দুই দেশের নিজস্ব বাণিজ্যিক চাহিদাগুলো চিহ্নিত করে, একে অপরকে কী ধরনের বাণিজ্য সুবিধা দেওয়া সম্ভব প্রথম দফার বৈঠকে এসব আলোচনা হবে। এ ছাড়া বাজারে প্রবেশাধিকার এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর পাশাপাশি মালয়েশিয়ায় শ্রমশক্তি, তৈরি পোশাক ও হালাল পণ্য রপ্তানির বিষয় প্রাধান্য পাবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে মঙ্গলবার থেকে নেগোসিয়েশন শুরু হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘মালয়েশিয়ার প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রধান নেগোসিয়েটর বা নেতৃত্ব প্রদানকারী কর্মকর্তা এখনো ঠিক করা হয়নি। সোমবার (আজ) এটা ঠিক করে দেওয়া হবে।’ তবে আলোচনায় কোন বিষয়গুলো প্রাধান্য পাবে, তা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের (গ্র্যাজুয়েশন) সময় বাড়ছে এটা মোটামুটি নিশ্চিত। চূড়ান্ত উত্তরণের আগেই দশটি দেশ ও অর্থনৈতিক জোটের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) করতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে সরকার। এর মধ্যে মালয়েশিয়া রয়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে এ চুক্তি শেষ করার বিষয়ে দুই দেশ আশাবাদী। এ আলোচনায় দুই দেশ বাজারসুবিধা ও ব্যবসার সুযোগসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবে।

জানা গেছে, চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির আলোচনার অগ্রগতি তুলে ধরা হয়। এই উপস্থাপনায় মালয়েশিয়ার সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে বলা হয়েছে, গত ২২ জুন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ২০২৭ সালের মধ্যে দুই দেশের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এই প্রেক্ষিতে উভয় দেশই ‘টার্মস অব রেফারেন্স (টিওআর)’ চূড়ান্ত করেছে। আলোচনা শুরুর প্রস্তুতি হিসেবে এবং চুক্তিতে অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে ২০টি অধ্যায়ের খসড়া প্রস্তুতের কাজ করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশের প্রস্তুত করা খসড়া ও মালয়েশিয়ার খসড়া বিষয়গুলো নিয়েই ২৭ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত দুই দেশের নেগোসিয়েশন অনুষ্ঠিত হবে ঢাকায়।

এ চুক্তিতে দুই দেশের বাণিজ্য ভারসাম্যের তারতম্যের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ আমদানি করে ২ হাজার ৪০০ মিলিয়ন ডলার বা তারও বেশি। অন্যদিকে মালয়শিয়াতে রপ্তানি করে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার। ফলে দুই দেশের মধ্যে বেশ বড় বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ চাইবে কীভাবে আরও বড় বাজার তৈরি করা যায় দেশটিতে। এ জন্য নানা পণ্যের রপ্তানিতে ছাড়ের প্রস্তাব করবে। প্রতিযোগী রপ্তানিকারক দেশগুলোর সঙ্গে মা য়েশিয়ায় বাণিজ্য কীভাবে আরও সহজ করা যায়, সে পথেই হাঁটবে বাংলাদেশ।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মো. আনোয়ার শহীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, মালয়েশিয়ায় আমাদের রপ্তানি খুব বেশি না। কিন্তু আমদানির পরিমাণ অনেক বেশি। তবে রপ্তানি বাড়ানোর ব্যপক সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে হালাল ফুড, বিভিন্ন কৃষিপণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের বড় বাজার রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাড়তি গুরুত্ব প্রদান করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে সরকার যদি এফটিএর নেগোসিয়েশন কার্যকরভাবে করতে পারে, তবে আমাদের বর্তমান যে সক্ষমতা; তাতেই মালয়েশিয়ায় রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

জানা গেছে, প্রাণ, মুন্নু সিরামিকস, আকিজ গ্রুপসহ কয়েকটি কোম্পানির পণ্য মালয়েশিয়ায় বেশ জনপ্রিয়। প্রধানত সিরামিকস, খাদ্যপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য মালয়েশিয়ায় রপ্তানি হয়। কিন্তু মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলো বিভিন্ন চুক্তির কারণে শুল্ক সুবিধা পায়। বাংলাদেশ সেটা না পাওয়ায় পণ্য রপ্তানি লাভজনক হয় না। বাণিজ্য চুক্তি হলে সে অসুবিধা কাটবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।  

এদিকে বাংলাদেশের টেলিকম, স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুৎ ও অটোমোবাইল খাতে মালয়েশিয়ার বড় বিনিয়োগ রয়েছে। মালয়েশিয়া থেকে সরাসরি প্রচুর ভোগ্যপণ্য আমদানি হয়। চুক্তি হলে প্রকৃত বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধির সম্ভাবনাও রয়েছে।

তথ্য বলছে, বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, নিট ও ওভেন পোশাক, চামড়া ও পাদুকা, খাদ্য ও পানীয়, শাকসবজি এবং মসলা। অন্যদিকে মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে আসে খনিজ জ্বালানি, ভোজ্যতেল ও চর্বি, লোহা ও ইস্পাত, প্লাস্টিক, যন্ত্রপাতি এবং বিভিন্ন রাসায়নিক পণ্য।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত