পুরুষদের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির গবেষণায় নতুন মাত্রা

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪৫ পিএম

পুরুষের জন্মনিয়ন্ত্রণে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে পরীক্ষামূলক একটি বড়ি। গবেষকদের দাবি, এই বড়ি সেবনের মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে শুক্রাণুর চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ করা সম্ভব হতে পারে। এর প্রভাবে গর্ভধারণের ঝুঁকি কমবে, অথচ কয়েক ঘণ্টা পর পুরুষের প্রজননক্ষমতা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। খবর নিউজউইক। 

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েইল কর্নেল মেডিসিনের গবেষকেরা পরীক্ষামূলক এই ওষুধ নিয়ে আরও গবেষণার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথ অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের কাছ থেকে কয়েক মিলিয়ন ডলারের অনুদান পেয়েছেন।

গবেষকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ওষুধটি পুরুষদের ছয় থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত গর্ভধারণ প্রতিরোধে সুরক্ষা দিতে পারে। এই সময় পেরিয়ে গেলে প্রজননক্ষমতা আবার স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

চার বছর মেয়াদি এই অনুদানের অর্থ দিয়ে মানুষের শরীরে ওষুধটির নিরাপত্তা যাচাই করা হবে। পুরুষের জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি তৈরির গবেষণায় ফার্মাকোলজিস্ট ড. ইয়োখেন বাক ও ড. লনি লেভিন ২০২০ সালের পর থেকে এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো অনুদান পেলেন।

নিউজউইককে তাঁরা বলেন, এ ধরনের অনুদান পাওয়া তাঁদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের। কারণ, দেশজুড়ে এ ধরনের গবেষণায় অনুদানের সংখ্যা সীমিত। বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত প্যানেলের মূল্যায়নের ভিত্তিতে অনুদান দেওয়া হয়। ফলে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা তাঁদের গবেষণাকে এতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন—এটি তাঁদের জন্য বড় প্রাপ্তি।

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় ৪০ শতাংশ গর্ভধারণ অপরিকল্পিত। বর্তমানে পুরুষদের জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রধান উপায় কনডম ব্যবহার ও ভ্যাসেকটমি বা পুরুষের স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ।

ফলে জন্মনিয়ন্ত্রণের দায়িত্বের বড় অংশ নারীদের ওপরই থেকে যায়। অনেক নারী দীর্ঘদিন হরমোনভিত্তিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করেন, যার বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে।

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের সেলুলার অ্যান্ড মলিকিউলার ফিজিওলজির সহযোগী অধ্যাপক জিন-জু চুং নিউজউইককে বলেন, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারী হরমোনভিত্তিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের প্রথম বছরের মধ্যেই তা বন্ধ করে দেন। এর প্রধান কারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।

কিন্তু গর্ভধারণ এড়াতে চাওয়া সত্ত্বেও জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি বন্ধ করে দেওয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকি বাড়ে। বিশ্বজুড়ে বছরে প্রায় ১২ কোটি ১০ লাখ এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২৬ লাখ অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণের ঘটনা ঘটে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

চুং বলেন, 'আমাদের এমন বিকল্প প্রয়োজন, যা আগেই কাজ করবে, সুস্থ কাউকে নিয়মিত হরমোন গ্রহণ করতে বাধ্য করবে না এবং জন্মনিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব শুধু মেনে নেওয়ার পরিবর্তে পুরুষদেরও তা ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ দেবে।' 

এখন পর্যন্ত প্রাণীর ওপর পরিচালিত পরীক্ষায় উল্লেখযোগ্য কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন দুই গবেষক। এমনকি দীর্ঘ সময় ধরে প্রাণীদের উচ্চমাত্রায় ওষুধটি দেওয়ার পরও তাঁরা কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া লক্ষ করেননি।

তবে মানুষের ক্ষেত্রে ওষুধটি কতটা নিরাপদ, তা এখনো পরীক্ষা করা হয়নি। তাই প্রাণীর ওপর পাওয়া ফলাফল থেকে মানুষের ক্ষেত্রেও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকবে না—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

গবেষকদের প্রত্যাশা, প্রাণীর ওপর নিরাপত্তা ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিস্তৃত পরীক্ষা শেষ হলে আগামী দুই বছরের মধ্যে পুরুষদের ওপর ওষুধটির পরীক্ষা শুরু করা সম্ভব হতে পারে।

তবে মানুষের ওপর পরীক্ষার আগে আরও অনেক ধাপ পেরোতে হবে।

সব মিলিয়ে, গবেষকেরা বলছেন, নতুন এই বড়ি পুরুষের জন্মনিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করলেও এখনই একে ব্যবহারযোগ্য জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। প্রথম ধাপের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা মূলত নিরাপত্তা যাচাইয়ের জন্য পরিচালিত হবে। অতীতেও পাঁচ বছরের মধ্যে পুরুষের জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি বাজারে আসার আশ্বাস দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। তাই চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা প্রয়োজন। 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত