নিজস্ব সম্পদের ওপর ভিত্তি করে টেকসই, স্থিতিশীল ও ন্যায্য জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষে রাজধানীতে দ্বিতীয়বারের মতো আয়োজিত হচ্ছে তিন দিনব্যাপী ‘রিনিউয়েবল এনার্জি ফেস্ট ২০২৬’।
একশনএইড বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (বুয়েট), জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (জেটনেট-বিডি) ও বুয়েটের ইনস্টিটিউট অব এনার্জি অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের (আইইএসডি) যৌথ আয়োজনে বুয়েটের কেন্দ্রীয় মাঠে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এটি। আজ সোমবার (২৬ অক্টোবর) এক সংবাদ সম্মেলনে এই ঘোষণা দেওয়া হয়।
‘একটি ন্যায্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সবুজ জ্বালানি রূপান্তর’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে এই মেলার আয়োজন করা হচ্ছে। এই আয়োজনে তরুণ-তরুণী, শ্রমিক, নাগরিক সংগঠন ও জলবায়ু নিয়ে কাজ করছেন এমন শহস্রাধিক প্রতিনিধি অংশ নিচ্ছেন।
সংবাদ সম্মেলনের আগে শহীদ মিনারে প্রায় ২০০ শতাধিক অংশগ্রহণকারীর মধ্যে দিয়ে একটি র্যালি অনুষ্ঠিত হয়।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে অংশগ্রহণকারীরা শহীদ মিনার থেকে বুয়েটের কেন্দ্রীয় মাঠ পর্যন্ত এই র্যালির আয়োজন করেন। এরপর সূর্যোদয় ইয়ুথ সোস্যাইটির উদ্যোগে ৩০ জন পারফরমারের মাধ্যমে একটি আকর্ষণীয় ফ্ল্যাশমবের আয়োজন করা হয়।
বুয়েটের কেন্দ্রীয় মাঠে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির। এসময়, অনুষ্ঠানে লিখিত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সামগ্রিক রূপরেখা তুলে ধরেন একশনএইড বাংলাদেশের জাস্ট এনার্জি ট্র্যান্সজিশন টিমের ম্যানেজার ও জেটনেট-বিডির সদস্য সচিব মো. আবুল কালাম আজাদ।
এছাড়াও, সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন বুয়েটের ইনস্টিটিউট অব এনার্জি অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের (আইইএসডি) পরিচালক অধ্যাপক ড. এমএএ শওকত চৌধুরী, দ্য আর্থ সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক আনওয়ার হোসেন, হিথিউম এনার্জি স্টোরেজ টেকনোলজি বিডি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল হাসান এবং কর্মজীবী নারীর অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক ও জেটনেট-বিডির ঢাকা বিভাগীয় সমন্বয়ক সানজিদা সুলতানা।
এ বিষয়ে একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, 'জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পুরো বিশ্বকে জ্বালানি সরবরাহের জন্য আমাদের জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বের হয়ে এসে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে উদ্ভাবন, আবিষ্কার ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। বাংলাদেশ এখন এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে যেখান থেকে কৃষক, নারী ও প্রান্তিক কমিউনিটিকে প্রাধান্য দিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ন্যায্য রূপান্তর সম্পর্কে চিন্তা, আলোচনা, পরিকল্পনা ও বাজেট নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।'
বুয়েটের ইনস্টিটিউট অব এনার্জি অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের (আইইএসডি) পরিচালক অধ্যাপক ড. এমএএ শওকত চৌধুরী বলেন, 'আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে সভ্যতার উন্নয়ন ও সম্পদের মূল্যায়ন, সবক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো জ্বালানি। যদিও আমরা এখনো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।'
একশনএইড বাংলাদেশের জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশনের ম্যানেজার ও জেটনেট-বিডির সদস্য সচিব আবুল কালাম আজাদ তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, 'আমরা আশা করি, এই আয়োজন থেকে একটি ন্যায়ভিত্তিক নীতি ও বিনিয়োগ এজেন্ডা তৈরি হবে, উদ্ভাবন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্বের সুনির্দিষ্ট পথ গড়ে ওঠার একটি জাতীয় ও আঞ্চলিক মঞ্চ হিসেবে কাজ করবে। এবং আয়োজন-পরবর্তী একটি স্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরি হবে।'
এছাড়াও, সৌরশক্তি যন্ত্রাংশের গুণগতমান নিশ্চিত করার জন্য তদারকি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন হিথিউম এনার্জি স্টোরেজ টেকনোলজি বিডি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল হাসান।
‘রিনিউয়েবল এনার্জি ফেস্ট ২০২৬’ একটি জাতীয় ও আঞ্চলিক সমন্বয়মূলক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে, যা নীতি, বাজার ও সাধারণ মানুষ সকলকে একত্রিত করছে। আগামীকাল মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) আনুষ্ঠানিকভাবে এই উৎসবের উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি মেলার উদ্বোধন করবেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, এমপি। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত থাকবেন বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দলের ফার্স্ট কাউন্সিলর ও গ্রিন ইকোনমি অ্যান্ড পাবলিক সেক্টর ইনভেস্টমেন্টসের সেকশন হেড টবিয়াস বিয়ারম্যান, বাংলাদেশস্থ অস্ট্রেলিয় হাইকমিশনের সেকেন্ড সেক্রেটারি (ডেভেলপমেন্ট) জ্যাকব ডি লিওন ও একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির প্রমুখ। এসময়, উদ্বোধন উপলক্ষে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা অংশ নিবেন।
উদ্বোধনের পর অতিথিরা আয়োজনের বিভিন্ন হাব ও স্টল ঘুরে দেখবেন। দেশিয় উদ্ভাবক ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর নবায়নযোগ্য জ্বালানির আধুনিক প্রযুক্তি ও সেবা প্রদর্শনে এখানে ‘উদ্ভাবন মেলা’ ও ‘প্রযুক্তি মেলার’ আয়োজন করা হবে। ‘উদ্ভাবন মেলায়’ মোট ২০টি ও ‘প্রযুক্তি মেলায়’ ০৯টি স্টল অংশ নিচ্ছে। বিনিয়োগকারী ও ব্যাংকের সামনে স্টার্টআপ ও তরুণ উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক মডেল তুলে ধরতে এই আয়োজনে থাকছে ‘ইনোভেশন-টু-ইমপ্যাক্ট মার্কেটপ্লেস’, যেখানে সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল উদ্ভাবন ‘সিড ফান্ডিং’ পাবে। এসময়, ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিকার্বনাইজেশনের’ ওপর সংলাপ আয়োজন করবে অক্সফাম বাংলাদেশ।
আয়োজনের শেষদিনে উপস্থিত থাকবেন, ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিসিসের (আইইইএফএ) লিড অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম, রিনিউয়েবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট ও স্রেডার পরিচালক প্রকৌশলী মো. মুজিবুর রহমান, চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. জাকির হোসেন খান ও বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দলের প্রোগ্রাম ম্যানেজার তানজিনা দিলশাদ প্রমুখ। বাংলাদেশে এনার্জি ও পাওয়ার রিসার্স কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, অতিরিক্ত সচিব মো. সবুর হোসেন।
এসময় জাতীয় ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে একাধিক উচ্চ পর্যায়ের প্যারালাল সংলাপ ও প্লেনারি সেশন অনুষ্ঠিত হবে। এতে ন্যায্য রূপান্তরের জন্য জ্বালানি নীতি ও সুশাসন; নবায়নযোগ্য জ্বালানির অর্থায়ন ও বিনিয়োগ; উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো; এবং জ্বালানি রূপান্তরের সামাজিক ও পরিবেশগত সুরক্ষা নিয়ে আলোচনা করা হবে। এসব অধিবেশনে দক্ষও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আগত বিশেষজ্ঞগণ নিজ দেশের অভিজ্ঞতা তুলে ধরবেন। এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হবে। একইসাথে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিশেষ অবদান রাখা উদ্ভাবক, তরুণ নেতৃত্ব ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করা হবে। পরিশেষে, পুতুল নাচ ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি শেষ হবে। সমাপনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মামুন আহমেদ।
গতবছরের মতো এবারও উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ‘ইয়ুথ অ্যান্ড পিপল হাব’। সংলাপ, কর্মশালা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, নেটওয়ার্কিং ও কমিউনিটি শোগুলোর মাধ্যমে এই হাবটি নাগরিক, নীতি-নির্ধারক ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের মধ্যে শিক্ষা, সহযোগিতা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করবে; যা বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়সংগত জ্বালানি রূপান্তরে ভূমিকা রাখতে জনগণকে সক্ষম করে তুলবে।
আয়োজনটির সহ-আয়োজক হিসেবে রয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিল (বিইপিআরসি), বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস), বাংলাদেশ সোলার অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ), সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ (সি৩ইআর), গ্রিনারি এনার্জি সল্যুশন লিমিটেড, ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ), অক্সফাম ইন বাংলাদেশ ও দ্য আর্থ সোসাইটি। সরকারি নীতিনির্ধারক, গবেষক, বেসরকারি খাত, বিনিয়োগকারী, নাগরিক সমাজ ও উন্নয়ন সহযোগীদের এক প্ল্যাটফর্মে এনে আয়োজন-পরবর্তী সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরি করাই এ অনুষ্ঠানের লক্ষ্য।