উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে টানা ৩৫ দিনের মতো অচল হয়ে আছে দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)। এসময় শিক্ষার্থীদের সাড়ে ৮০০টি ক্লাস বাতিল হওয়ার পাশাপাশি স্থগিত হয়েছে স্নাতক পর্যায়ের ১২টি বিভাগের ২১টি পরীক্ষা।
এতে করে সেশনজটে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তবে শিক্ষার্থীদের একমাসের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পরীক্ষা পরবর্তী ছুটি বাতিল, ক্লাস সংক্ষিপ্তকরণসহ তিনটি বিকল্প উপায়ের কথা ভাবছেন শিক্ষকেরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তর সূত্রে জানা যায়, উপাচার্য পুনর্বহালের দাবিতে চলমান আন্দোলনের ৩৫ দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২টি বিভাগের সর্বমোট ২১টা চূড়ান্ত পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে। এরমধ্যে দ্বিতীয় বর্ষে একটি মাত্র বিভাগের ৪টি পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে। তৃতীয় বর্ষে দুইটি বিভাগে ৪টা পরীক্ষা এবং চতুর্থ বিভাগে আনুমানিক ৭টা বিভাগের ১৩টা পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের এসব পরীক্ষা দ্রুত সম্পন্ন করার পাশাপাশি ৩৫ দিনের ক্লাসের ক্ষতি তিনটি উপায়ে পুষিয়ে দিতে প্রাথমিকভাবে চিন্তা করছে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তর।
প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী প্রতি সেমিস্টার শেষে ১ সপ্তাহ এবং একটি লেভেল (শিক্ষাবর্ষ) শেষ হওয়ার পর ৩ সপ্তাহের যে ছুটি থাকে, শিক্ষার্থীরা যদি সম্মত হয় এই ছুটিতে ক্লাস নেওয়া হবে।
দ্বিতীয়ত, ডিসেম্বরে ১০ দিন শীতকালীন ছুটি থাকে এবং আগামী রমজানের অন্তত ২০ দিন অতিরিক্ত ক্লাস নিয়েও এই ক্ষতি পোষানোর চিন্তা করা হচ্ছে।
তৃতীয়ত, ক্লাস সংখ্যা সংক্ষিপ্তকরণের বিষয়টাও চিন্তা করা হচ্ছে। প্রতি সেমিস্টারে ১৩ সপ্তাহ তথা ৬৫ দিন ক্লাস করার বাধ্যবাধকতা আছে। ৬৫ দিনের জায়গায় ৬০ দিন করা যায় বিশেষ পরিস্থিতিতে।
পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক হলেন ড. মো. মঈনুল ইসলাম বলেন, আমরা এই তিনটা উপায় ভেবে রেখেছি। এগুলো শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে চূড়ান্ত করা হবে।
পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের তিন উপায়ের সাথে সাপ্তাহিক বন্ধের দিন শনিবারও ক্লাস করার বিষয়ে চিন্তাভাবনা আছে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী আহনাফ শাহরিয়ার অর্ণব। তিনি বলেন, আমরা শনিবার ক্লাস করার কথা ভাবছি। পাশাপাশি শীতকালীন বন্ধ না নিয়ে ক্লাস করা এবং রমজানেও ক্লাস করার পরিকল্পনা আছে। আমরা শিক্ষকদের সাথে বসে ক্ষতি কীভাবে পুষিয়ে নেওয়া যায়, তা চূড়ান্ত করব।
ক্যাম্পাসে ফিরছে স্বস্তি, অপেক্ষা ইউজিসি কমিটির
দীর্ঘ অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে গত রবিবার শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের পাশাপাশি ক্লাসে ফেরার ঘোষণা দেন। পরবর্তীতে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও একই সিদ্ধান্ত নেন। তবে ক্লাসে ফিরলেও উপাচার্য ভবন তালাবদ্ধ থাকবে বলে জানান শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি নব নিযুক্ত উপাচার্য ক্যাম্পাসে ফেরার চেষ্টা করলে পুনরায় শাটডাউন শুরু হবে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
এদিকে ক্লাসে ফেরার এই সিদ্ধান্তে ক্যাম্পাসে স্বস্তি ফিরে এসেছে। তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল (ইইই) বিভাগের শিক্ষার্থী মো. নাহিদ বলেন, ক্লাস শুরুর ঘোষণা আসায় আমাদের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে। এতদিন বন্ধ থাকায় সেশনজটে পড়ার একটা আশঙ্কা আছে। আশা করি শিক্ষকরা কার্যকর পদক্ষেপ নিবেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন অধ্যাপক মো. রাশিদুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা ছাত্রদের ক্লাসে ফেরার আহ্বান জানিয়েছি, তারাও সম্মত হয়েছে। আগামী বুধবার ক্যাম্পাসে ইউজিসির পরামর্শক কমিটি আসছেন। তারা সবার সাথে বৈঠক করবেন। এরপর বুঝা যাবে ক্লাস পরীক্ষা কবে নাগাদ শুর করা যায়।
আর ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক স্যার যেসব উপায়ের কথা বলছেন, আমরাও এসব উপায়ের সাথে একমত। শিক্ষার্থীদের সাথে বসে সব চূড়ান্ত হবে।
শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ বলেন, শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। আমাদের একাডেমিক ক্যালেন্ডার দেখে বিভিন্ন ছুটিগুলোতে কিভাবে ক্লাস-পরীক্ষা সমন্বয় করা যায় সে বিষয় ডিনবৃন্দ ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তর কাজ করবেন। আমাদের নির্দেশনা দেওয়া আছে।
গত ২১ সেপ্টেম্বর রাতে অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ইলেকট্রনিক অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
তবে নতুন উপাচার্য নিয়োগের খবর আসার পর রাতেই শিক্ষার্থীরা সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সাথে যোগ দিয়ে টানা কর্মবিরতি পালন করছেন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। টানা আন্দোলনের মুখে ২৪ সেপ্টেম্বর অনলাইন যোগদান করেন নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম।
তবে আন্দোলন চলতে থাকায় তিনি ১৮ দিন পর ক্যাম্পাসে প্রবেশ করলে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যকে ৩০ ঘণ্টা নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসনের সহায়তায় তিনি অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্তি পেয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। চিকিৎসা শেষে সার্কিট হাউজে ফিরেই অনলাইনে সিন্ডিকেট সভা করেন উপাচার্য।
পরবর্তীতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান অচলাবস্থা দূর ও শ্রেণি কার্যক্রম চালুর লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) ছয় সদস্যের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পরামর্শক কমিটি গঠন করে। তবে আন্দোলনে ৩৪তম দিনে রবিবার (২৫ অক্টোবর) শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের পাশাপাশি ক্লাসে ফেরারও ঘোষণা দেয়। পরবর্তীতে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীরাও একই সিদ্ধান্ত নেয়।
চুয়েটে ৩৪ দিনের শাটডাউন প্রত্যাহার: ‘ভিসি হটাও’ আন্দোলন চলবে