একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর মুখে শোনা কাহিনি। প্রায় ২৫ বছর আগে হাইকোর্টের একজন বিচারপতির (এখন অবসরে) স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ হয়ে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ওই বিচারপতি সজ্জন হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং আর্থিকভাবে এতটা সচ্ছলও ছিলেন না। স্ত্রীর চিকিৎসার খরচ জোগাতে তিনি জেরবার ছিলেন। এ সংবাদ পেলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুল বাসেত মজুমদার। এগিয়ে এলেন তিনি আর্থিক সহযোগিতা দিতে। কিন্তু বিচারক কোনোভাবেই তা গ্রহণ করতে ইচ্ছুক ছিলেন না। শেষে বিচারককে অনেক বুঝিয়ে, বলে কয়ে তিনি চিকিৎসা খরচের ব্যবস্থা করলেন। আবদুল বাসেদ মজুমদার তার ছেলে এবং তখনকার নবীন আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজাকে দিয়ে হাসপাতালের বিলের টাকা পাঠালেন।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তখন নতুন আইনজীবী হিসেবে পেশা শুরু করেছি। মনে খটকা লাগল। আব্বা কি বিচারকের কাছ থেকে বিশেষ কোনো সুবিধা নিতে চাইছেন? কিন্তু পরক্ষণেই এ চিন্তা অমূলক মনে হলো। কেননা আব্বার উদার মনের সঙ্গে আমরা পরিচিত ছিলাম। গরিব বিচারপ্রত্যাশী, অসচ্ছল আইনজীবী যেই হোন তিনি যাকে যা দিতেন তা উজাড় করেই দিতেন। বিনিময়ে কারও কাছ থেকে কোনো কিছু চাইতে বা পেতে দেখিনি। কোনো সুবিধা নেওয়ার দুর্নামও শোনা যায়নি।’
২০২১ সালের ২৭ অক্টোবর ৮৩ বছর বয়সে প্রয়াত হন আবদুল বাসেত মজুমদার। তার চলে যাওয়ার পাঁচ বছর পূর্ণ হলো আজ। পরপারে চলে গেলেও তার নীতি, আদর্শ, আইনাঙ্গনে উদারতা, বিচারাকাক্সক্ষীদের প্রতি তার সহমর্মিতা বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে কিছুটা বিরল এবং এখন তা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক ও অনুকরণীয় বলে মন্তব্য করেছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা।
আবদুল বাসেত মজুমদারকে বলা হতো ‘গরিবের উকিল’ ‘আইনজীবীদের বন্ধু’। শুধু অসহায় গরিব বিচারাকাক্সক্ষীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা বা ফান্ড গঠন করেছেন, এমন উদাহরণ সম্ভবত তিনিই তৈরি করেছিলেন। পেশাগত জীবনে বহু অসহায় ও দরিদ্র মানুষকে বিনা পারিশ্রমিকে আইনি সহায়তা দিয়েছিলেন এ আইনজীবী। পাশাপাশি অসচ্ছল আইনজীবীদের আর্থিক সহায়তা দিতে একটি ফান্ডও গঠন করেছিলেন তিনি। কোনো আইনজীবী জটিল রোগে আক্রান্ত কিংবা ছেলেমেয়ে অথবা স্ত্রীর জটিল অস্ত্রোপচার এগিয়ে এসেছেন আবদুল বাসেত মজুমদার। দেশের আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু ‘দলবাজ’ তকমা কখনো তার গায়ে লাগেনি। এর বড় কারণ তিনি সব দলের আইনজীবীদের কাছে ছিলেন সম্মানের ব্যক্তি।
সাঈদ আহমেদ রাজা বলেন, ‘ওকালতি করে সম্পদ করবেন, এমন বাসনা কখনোই আব্বার ছিল না। জীবনে যা উপার্জন করেছিলেন তার বেশিরভাগই তিনি দান করেছেন হাসপাতাল, মাদ্রাসা, এতিমখানা ও অন্যান্য দাতব্য কার্যক্রমে। কোনো আইনজীবী অসচ্ছল হলে গোপনে তাকে আর্থিক সহযোগিতা করতেন। কোনো আইনজীবীর পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে তিনি খোঁজ নিয়ে আর্থিক সহায়তা দিতেন। চেম্বারে কত অসহায়, দরিদ্র মানুষকে দেখেছি, অর্থ নেই। বিচার চাইতে এসে খরচের ভারে দুর্বল হয়ে পড়েছেন। আব্বা এগিয়ে এসেছেন। বিনা ফিতে মামলা করেছেন। এমনকি মামলার এফিডেভিটের খরচটাও নিজের পকেট থেকে দিতেন।’ তিনি বলেন, ‘সন্তান হিসেবে তাকে নিয়ে গর্ববোধ করি। তার পরিচয়ে আমরাও সম্মানিত হই।’
আবদুল বাসেত মজুমদারের শুনানি ছিল ক্ষুরধার। অনেক তরুণ আইনজীবী যারা এখন পুরোপুরি আইনপেশায় নিয়োজিত, তারা কেবল বাসেত মজুমদারের শুনানি শোনার জন্য এজলাসে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতেন।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্নার সঙ্গে জীবদ্দশায় অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল আবদুল বাসেত মজুমদারের। অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যতবার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেছি, চোখ খুলে সবার আগে সামনে পেয়েছি আবদুল বাসেত মজুমদারকে। এটা শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণেই নয়, অন্যের বেলাতেও তিনি তাই করতেন। আসলেই অসাধারণ মানুষ ছিলেন তিনি। বিচারক, আইনজীবী, বিচারাকাক্সক্ষী সাধারণ মানুষ সবার পাশে দাঁড়াতেন তিনি। সেখানে দলমতের কোনো বালাই ছিল না।’ তিনি বলেন, ‘অসহায়, গরিব মানুষ বিচার চাইতে আদালতে আসেন। আর্থিক খরচের কারণে অনেকেই বিচারের জন্য হা হুতাশ করেন। বিচার চলে বছরের পর বছর। আইন ও বিচারাঙ্গনে এখন যে পরিস্থিতি তাতে এখন আবদুল বাসেত মজুমদার আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন। তার চলে যাওয়ার ক্ষতিটা আদৌ পূরণ হবে কি না, সন্দেহ।’
আবদুল বাসেত মজুমদারের স্ত্রী রওশন জাহান মেহেরুন্নেসা। এক ছেলে গোলাম মহিউদ্দিন আবদুল কাদের ব্যবসায়ী। আরেক ছেলে সাঈদ আহমদ রাজা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। এক মেয়ে ফাতেমা আক্তার লুনা রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ও আরেক মেয়ে খাদিজা আক্তার ঝুমা চিকিৎসক। প্রয়াত এ আইনজীবীর নামে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার আন্দারিপাড়ায় আবদুল বাসেত মজুমদার মাদ্রাসা ও এতিমখানা এবং গ্রামের বাড়ি লালমাইয়ের শানিচোঁ গ্রামে ‘আবদুল বাসেত মজুমদার ট্রাস্ট হাসপাতাল’ রয়েছে। তার অবর্তমানে পরিবারের সদস্যরাই এ দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো দেখাশোনা করেন। অ্যাডভোকেট সাঈদ আহমেদ রাজা বলেন, আমরা আব্বার রেখে যাওয়া প্রতিষ্ঠানেই তাকে স্মরণ করি। তিনি যেভাবে চাইতেন সেভাবেই প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হচ্ছে।
আবদুল বাসেত মজুমদার ১৯৩৮ সালের ১ জানুয়ারি কুমিল্লার লালমাইয়ের শানিচোঁ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে সেখানেই একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে আইএ ও বিএ পাস করেন তিনি। এরপর ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ও আইন বিষয়ে ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। ১৯৬৬ সালে ঢাকা হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন আবদুল বাসেত মজুমদার। সুপ্রিম কোর্ট বারের ২০০১-০২ মেয়াদে সভাপতি হিসেবে এবং ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে সমিতির সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এ ছাড়া বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যানের পদে দুই বার নির্বাচিত হয়েছিলেন আবদুল বাসেত মজুমদার। মৃত্যুর পাঁচ বছর পূর্তিতে আবদুল বাসেত মজুমদার ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে আজ সুপ্রিম কোর্টে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। গ্রামের বাড়ি শানিচোঁ এলাকাতেও দোয়া ও মিলাদ মাহফিল এবং দুস্থদের খাবার বিতরণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।