ইসলামে সাহিত্যচর্চা নিষিদ্ধ নয়। উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি শুদ্ধ হলে তা দ্বীনের প্রচার, চরিত্র গঠন ও সমাজ সংস্কারের কার্যকর মাধ্যম। কোরআন নিজেই অত্যন্ত সুন্দর ভাষাশৈলী ও কাহিনির মাধ্যমে মানুষকে শিক্ষা দিয়েছে। সুরা ইউসুফকে ‘আহসানুল কাসাস’ তথা সুন্দরতম কাহিনি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। (সুরা ইউসুফ ৩) রাসুল (সা.)-এর প্রতি প্রথম নাজিলকৃত আয়াত ‘পড়–ন’ দিয়ে শুরু করা হয়েছে। (সুরা আলাক ১)
এতে পাঠ, চিন্তা ও জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব স্পষ্ট। আবার মানুষের ভাষার বৈচিত্র্যকে আল্লাহর নিদর্শন বলা হয়েছে। (সুরা রুম ২২) তাই ভাষার সৌন্দর্য, শব্দচয়ন ও প্রকাশ কৌশল, সবই সাহিত্যচর্চার অনুকূল উপাদান।
ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে সাহিত্যচর্চার মূল উদ্দেশ্য হলো তাওহিদ (আল্লাহর একত্ববাদ), নৈতিকতা এবং সত্যের বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। ইসলামে অশ্লীলতা, অসত্য, মিথ্যা অপবাদ ও মানুষকে বিভ্রান্ত করে এমন সাহিত্য কঠোরভাবে বর্জিত।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘কবিদের অনুসরণ করে বিভ্রান্ত লোকেরা। তুমি কি দেখ না যে, তারা প্রতিটি ময়দানে (অনর্থক) ঘুরে বেড়ায় এবং এমন কথা বলে যা তারা নিজেরা করে না? তবে তারা ব্যতিক্রম, যারা ইমান আনে, সৎকর্ম করে এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করে...।’ (সুরা শুআরা ২২৪-২২৭)
আয়াতের শেষ অংশে স্পষ্টভাবে ইমানদার ও সৎকর্মশীল সাহিত্যিকদের প্রশংসনীয় কাজকে ব্যতিক্রম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন আরবের শ্রেষ্ঠ বিশুদ্ধভাষী, তার বাণী ও বর্ণনাশৈলী ভাষাশিল্পের উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সাহিত্যের সৌন্দর্য ও কাব্যের সঠিক ব্যবহারের মূল্যায়ন করেছেন। তৎকালীন আরবে কুরাইশদের মিথ্যা অপপ্রচারের জবাবে এবং ইসলামের সত্য তুলে ধরতে সাহাবি কবিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। হজরত হাসসান ইবনে সাবিত (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইসলামের পক্ষে কবিতা রচনার উৎসাহ দিতেন এবং তার জন্য দোয়া করে বলতেন, হে আল্লাহ! জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে তাকে সাহায্য করুন।’ (সহিহ বুখারি)
হজরত কাব ইবনে জুহাইর (রা.) যখন তার বিখ্যাত ‘কাসিদায়ে বুরদা’ রচনা করে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে শোনান, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) আনন্দিত হয়ে নিজের চাদর তাকে উপহার দেন। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া)
এছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) কাব্যরস ও প্রজ্ঞাপূর্ণ সাহিত্যের প্রশংসা করে বলেছেন, নিশ্চয়ই কোনো কোনো কবিতার মধ্যে প্রজ্ঞা রয়েছে।’ (সহিহ বুখারি)
ইসলামের সোনালি যুগে আল-ফারাবি, ইবনে সিনা, জালালুদ্দিন রুমি, শেখ সাদি এবং ফরিদউদ্দিন আত্তারের মতো কালজয়ী পণ্ডিত ও কবিরা সাহিত্য জগতে অনন্য অবদান রেখেছেন। তাদের অমর সৃষ্টিগুলো সাহিত্যরসে সমৃদ্ধ এবং আধ্যাত্মিকতা ও নৈতিক শিক্ষার বাতিঘর।
লেখক : শিক্ষক ও ধর্মীয় নিবন্ধকার