দেশের শীর্ষ খাদ্যশস্য উৎপাদনকারী জেলা দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলায় ব্ল্যাক রাইস চাষ করে সফল হয়েছেন রকিবুল হক। পেশায় কসমেটিকস ব্যবসায়ী রকিবুলের ব্ল্যাক রাইস এখন সবার নজর কারছে। তার ব্ল্যাক রাইসের ক্ষেত দেখতে ভিড় করছেন সাধারণ মানুষ।
কালো রঙের ধান। কাছে গেলে ধানের শীষেও চোখে পড়ে ভিন্নতার ছাপ। এমন ধান দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন মানুষ। কেউ কৌতূহল নিয়ে দেখছেন, কেউ আবার আগাম বীজের জন্য যোগাযোগ করছেন। দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার ১নং নাফানগর ইউনিয়নের দিঘড়ী গ্রামে ৩৩ শতাংশ জমিতে ভিয়েতনাম জাতের ব্ল্যাক রাইস আবাদ করেছেন এই তরুণ কৃষক। তিনি ওই গ্রামের আমিনুল হকের ছেলে এবং পেশায় একজন কসমেটিকস ব্যবসায়ী।
রকিবুল জানান, প্রথমে তিনি অনলাইনে ৫০০ টাকায় এক কেজি ব্ল্যাক রাইস কিনে এনে বাড়িতে রান্না করে খান। পরে সিদ্ধান্ত নেন এই চালের ধান নিজে আবাদ করবেন। এরপর অনলাইনে ২ কেজি ব্ল্যাক রাইসের বীজ ১ হাজার ১৫০ টাকায় কিনে এনে বীজতলা তৈরি করেন। বাবা আমিনুল ইসলামের ধান চাষ করার মতো জমি থাকলেও তিনি জমি দিতে রাজি হননি। পরে ২৪ হাজার টাকায় ৩৩ শতক জমি এক মৌসুমের জন্য ইজারা নেন রকিবুল।
সেই জমিতে ৯ জুলাই ব্ল্যাক রাইসের চারা রোপণ করেন।
মাঠে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে দোল খাচ্ছে সবুজ ধান। কোনো কোনো ধান গাছের আগায় বের হয়েছে শীষ। কিন্তু এই বিস্তীর্ণ মাঠে সবুজের মাঝে চোখ আটকে যাবে কালোর রঙের শীষের দিকে। গাছের পাতা সবুজ। অথচ ধানের শীষ কালো। এই কালো শীষ রঙের ধান দেখতে আসছেন অনেকে। কালো ধানের চাষ এবং উপকারিতা শুনে অনেক কৃষকই এ ধানের বীজ সংগ্রহে ছুটছেন তার কাছে। আবার অনেকে অনলাইনে বীজ সংগ্রহের জন্য যোগাযোগ রাখছেন তার সঙ্গে।
ওই এলাকার কৃষক সুমন, আকাশ ও কাশীনাথ অনেক কৃষক তাকে বীজের জন্য আগাম বলে রেখেছেন। তারা বলেন, অনেক সুন্দর ধান হয়েছে। আমরাও এই ধান আগামীতে চাষ করতে চাই। তাই তাকে বীজের কথা বলে রেখেছি।
তা ছাড়াও তার অভিজ্ঞতা আমরা কাজে লাগাতে পারব।
ধানের শীষও সাধারণ ধানের চেয়ে বড়। অন্যান্য ধানের মতোই এ ধানের পরিচর্যা করতে হয়। ধানগুলো দেখতে যেমন কালো, চালও দেখতে তেমন কালো। এ চালের ভাতও কালো এবং পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। বাড়িতে পরিবার নিয়ে খাওয়ার জন্য এবং উৎপাদন কেমন জানার জন্য প্রথম ব্ল্যাক রাইস বা কালো ধান চাষ করেছেন বলে জানান রকিবুল হক। তবে সফলতা পেলে আগামীতে ব্যাপক ভাবে চাষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি জানান, ‘ব্ল্যাক রাইসের ওপরে প্রামাণ্য চিত্র দেখে জেনেছি কালো চাল ডায়াবেটিস, স্নায়ুরোগ ও বার্ধক্য প্রতিরোধক। এতে ভিটামিন, ফাইবার ও মিনারেল রয়েছে। কালো চাল উৎপাদনে উদ্যোগী হওয়ার এটাও একটা কারণ।’ তিনি বলেন, ‘অনলাইনে দেখেছি ব্ল্যাক রাইস শরীরে চর্বি জমতে দেয় না, ধীরে ধীরে হজম হয়। এ কারণে ক্ষুধা কম লাগে।’
রকিবুল বলেন, ‘আমি ৩৩ শতাংশ জমিতে ১৮ থেকে ২০ মণ ধান পাব। ৪০০ টাকা কেজি হিসেবে ১৬ হাজার টাকা মণ দরে এই ধান বিক্রি হচ্ছে। সেই হিসেবে আমি ৩ লাখ ২০ হাজার টাকার ধান বিক্রি করতে পারব।’
রকিবুল হক আরও বলেন, ব্ল্যাক রাইস ধান সাধারণ ধানের মতো চাষ হয়ে থাকে। এ ধান চাষে অতিরিক্ত সার বা পানির প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় না আলাদা কোনো পরিচর্যারও।
রকিবুল হকের বাবা আমিনুল হক বলেন, ‘প্রথমে ভরসা পাইনি। মনে করেছিলাম ছেলে ইন্টারনেট দেখে পাগলামি করছে। তাই ছেলে চাইলেও ব্ল্যাক রাইস চাষ করার জন্য জমি দেইনি। কিন্তু ছেলে জেদ করে জমি ইজারা নিয়ে ব্ল্যাক রাইস চাষ করেছে। দেখে মনে হচ্ছে ভালো করেছে। আগামীতে তাকে জমি দিব যত খুশি ব্ল্যাক রাইস চাষ করবে।’
বোচাগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার নয়ন কুমার সাহা জানান, ব্ল্যাক রাইস বা কালো চালের প্রধান স্বাস্থ্য উপকারিতা হলো এটি অত্যন্ত শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট (অ্যান্থোসায়ানিন), ফাইবার এবং আয়রন সমৃদ্ধ, যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, ওজন কমানো এবং হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর। পুষ্টিগুণের আধিক্যের কারণে বিশ্বজুড়ে একে ‘সুপারফুড’ বলা হয়ে থাকে। রোগ প্রতিরোধী এ ধানের চাল উৎপাদন করে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে দেশের কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
বোচাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মারুফ হাসান বলেন, ব্ল্যাক রাইস দেশে বিভিন্ন জেলায় চাষ হচ্ছে। এই উপজেলায় এবারই প্রথম চাষ হয়েছে। সঠিকভাবে উৎপাদন ও বাজারজাত করতে পারলে এটি লাভ জনক। কারণ এটি শৌখিন ক্রেতারা পছন্দ করেন। আমরা তার সফলতা দেখার অপেক্ষায় রয়েছি।