শক্তি বাড়াচ্ছে অর্ণব, উপকূলে সতর্কতা জারি

আগামী ১২ ঘণ্টায় ঘূর্ণিঝড়টি তীব্র থেকে অতি তীব্র রূপ নিতে পারে। অন্ধ্রপ্রদেশে ৫৩টি ট্রেন বাতিল, পশ্চিমবঙ্গের উপকূলেও ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস।

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২২ পিএম

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। ভারতীয় আবহাওয়া দফতরের উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগামী ১২ ঘণ্টার মধ্যে ঘূর্ণিঝড়টি তীব্র থেকে অতি তীব্র রূপ নিতে পারে। এর প্রভাবে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়া এবং সমুদ্র উত্তাল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ভোর সাড়ে ৫টার হিসাব অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়টি অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনম থেকে ২৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বে এবং ওড়িশার গোপালপুর থেকে ৩৮০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান করছিল।

আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়টি পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে পারে। মঙ্গলবার রাতে গতিপথে পরিবর্তন এনে উত্তর-পশ্চিম দিকে এগোনোর সম্ভাবনা রয়েছে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকালে অন্ধ্রপ্রদেশের বাপটলা ও বিশাখাপত্তনমের মধ্যবর্তী উপকূল দিয়ে স্থলভাগে প্রবেশ করতে পারে এটি। এ সময় বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১১৫ থেকে ১২৫ কিলোমিটার হতে পারে। ঝোড়ো হাওয়ার সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।

ইতোমধ্যে অন্ধ্রপ্রদেশের অনকাপল্লী, শ্রীকাকুলম, বিশাখাপত্তনম ও বিজয়নগরম জেলায় ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলা ও উদ্ধারকাজের প্রস্তুতি হিসেবে কাকীনাডা, কোনাসীমা, রাজামুন্দ্রি, এলুরু, মছলিপত্তনম ও নাকাপল্লীসহ বিভিন্ন এলাকায় জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর (এনডিআরএফ) একাধিক দল মোতায়েন করা হয়েছে। ইয়ানাম, কৃষ্ণা ও বিশাখাপত্তনমেও উদ্ধারকারী দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কায় অন্ধ্রপ্রদেশে মঙ্গলবার ও বুধবার মোট ৫৩টি ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে বিজয়ওয়াড়া, রাজামুন্দ্রি, কাকীনাডা ও বিশাখাপত্তনমের মধ্যে চলাচলকারী একাধিক ট্রেনের পরিষেবা ব্যাহত হবে। এ ছাড়া মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ওড়িশায় আটটি ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে বিশাখাপত্তনম-কোরাপুট ও বিশাখাপত্তনম-কিরন্ডুল প্যাসেঞ্জার ট্রেন রয়েছে। যাত্রীদের সহায়তায় বিশাখাপত্তনমে বিশেষ নিয়ন্ত্রণকক্ষ খুলেছে দক্ষিণ উপকূলীয় রেলওয়ে।

অন্ধ্রপ্রদেশের কাছাকাছি দক্ষিণ ওড়িশায় ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব বেশি পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ কারণে গঞ্জাম, গজপতি, রায়গড়া, মালকানগিরি, কোরাপুট ও নবরংপুর জেলায় বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার ও বুধবার এই ছয় জেলার স্কুল, কলেজ ও অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে আবহাওয়া পরিস্থিতি বিবেচনায় আন্দামান ও নিকোবর প্রশাসনও সব স্কুল বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে।

দুর্যোগ মোকাবিলায় ওড়িশায় রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী ও এনডিআরএফের সদস্যদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নিচু ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝি পরিস্থিতি ও প্রস্তুতি পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দিয়েছেন আট মন্ত্রীকে। তারা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছেন।

ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের প্রভাব পড়তে পারে পশ্চিমবঙ্গের উপকূলীয় এলাকাতেও। এ কারণে উপকূলসংলগ্ন জেলাগুলোতে ভারী বৃষ্টি, বজ্রপাত ও ঝোড়ো হাওয়ার সতর্কতা জারি করা হয়েছে। মঙ্গলবার থেকে সমুদ্র উত্তাল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যাওয়ার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

মঙ্গলবার দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামে বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টি এবং ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। কলকাতা, উত্তর ২৪ পরগনা, হাওড়া ও হুগলিতে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।

বুধবার দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। বৃষ্টির পরিমাণ ৭ থেকে ১১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে বলে পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে। এ সময় জেলাগুলোতে ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। কলকাতাসহ দক্ষিণবঙ্গের অন্যান্য জেলায়ও বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বৃহস্পতি ও শুক্রবার দার্জিলিং, কালিম্পং, আলিপুরদুয়ার ও জলপাইগুড়িতে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে বলেও সতর্ক করেছে আবহাওয়া দফতর।

দক্ষিণ ২৪ পরগনার উপকূলীয় এলাকায়ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গভীর নিম্নচাপ ও পূর্ণিমার কটালের কারণে নদী ও সমুদ্রে জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা থাকায় নামখানা, ফ্রেজারগঞ্জ, গঙ্গাসাগর ও গোবর্ধনপুর এলাকায় মাইকে প্রচার চালানো হচ্ছে। মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে না যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে মাছ ধরতে সমুদ্রে যাওয়া মৎস্যজীবীদের নিরাপদ স্থানে ফিরে আসতে বলা হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় সাগর, নামখানাসহ উপকূলীয় এলাকায় সিভিল ডিফেন্সের কর্মীদের মোতায়েন করা হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব উপকূলীয় এলাকার বাইরেও পড়তে পারে। পূর্ব উত্তর প্রদেশ ও বিহারে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দুই রাজ্যকে সতর্ক করেছেন ভারতের ক্যাবিনেট সচিব টিভি সোমনাথন।

সূত্র: আনন্দবাজার

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত