সিলেটে যুবককে হত্যায় এসআই আকবরের মৃত্যুদণ্ড

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪৭ পিএম

সিলেট নগরের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতন চালিয়ে যুবক রায়হান আহমদকে (৩৪) হত্যার মামলায় পুলিশের বহিষ্কৃত এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে মৃত্যুদণ্ড, দুই কনস্টেবলকে যাবজ্জীবন এবং আরও ৩ আসামিকে ৭ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আবদুল মজিদ মুন্সী এ রায় ঘোষণা করেন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাস ও কনস্টেবল হারুন অর রশীদ। বাকি তিন আসামির মধ্যে বহিষ্কৃত এএসআই আশেক-ই-এলাহী, এসআই হাসান উদ্দিন ও সংবাদকর্মী আবদুল্লাহ আল নোমানকে সাত বছর করে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।

পিপি মুমিনুল ইসলাম মোমিন জানান, আলোচিত এই হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত ৬ আসামির মধ্যে কেবল পুলিশের বহিষ্কৃত এএসআই আশেক-ই-এলাহী কারাগারে আছেন। বাকি আসামিরা পলাতক।

পিপি বলেন, ‘আদালত ৬ আসামির মধ্যে আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন। অন্য পাঁচ আসামির মধ্যে কনস্টেবল মো. হারুন অর রশীদ ও টিটু চন্দ্র দাসকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশের এসআই মো. হাসান উদ্দিন, এএসআই আশেক-ই-এলাহী ও সাংবাদিক আবদুল্লাহ আল নোমানকে ৭ বছর করে কারাদণ্ড এবং অনাদায়ে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।’

মামলার রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে পিপি বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ এ রায়ে প্রাথমিকভাবে সন্তুষ্ট। তবে আরও পর্যালোচনা করে প্রয়োজনে উচ্চ আদালতে যাওয়া হবে।

রায় ঘোষণার আগে আদালত প্রাঙ্গণে আসেন নির্যাতনে নিহত রায়হান আহমদের মা সালমা বেগম। এ সময় আসামিরা জামিন পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ৬ বছর পর আজ রায় ঘোষিত হবে। কিন্তু এই রায় শুনে আমি কী করব। আমার রায়হানকে যারা নির্যাতন করে মারছে, তারা তো পালিয়ে গেছে।’

সালমা বেগম আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার থাকতে একজনেরও জামিন হয়নি। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে মামলার শুনানি শেষ হওয়ার পরও কীভাবে প্রথম তিনজন আসামিই জামিন পেল। জামিন পেয়ে কীভাবে তারা পালিয়ে যায়? আজকে তো শুধু কাগজে-কলমে রায় হয়েছে, আসামিরা তো শাস্তি পাচ্ছে না। আসামিরা শাস্তি না পেলে আমরা কী সান্ত্বনা পাব?’

রায় ঘোষণার পর তিনি বলেন, ‘রায়ে আমি সন্তুষ্ট। এখন প্রধান অভিযুক্ত আকবর হোসেনের ফাঁসি কার্যকর করলে আমরা শান্তি পাব। রায়হানের আত্মাও শান্তি পাবে।’

মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০২০ সালের ১০ অক্টোবর রাতে সিলেট নগরের আখালিয়া এলাকার বাসিন্দা রায়হান আহমদকে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে ধরে নিয়ে নির্যাতন করেন ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ পুলিশ সদস্যরা। পরদিন সকালে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রায়হানের মৃত্যু হয়।

এই ঘটনায় পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। পরে সিলেট মহানগর পুলিশের একটি অনুসন্ধান কমিটি তদন্ত করে। এই তদন্তে ফাঁড়িতে নিয়ে রায়হানকে নির্যাতনের সত্যতা পাওয়া যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ফাঁড়ির ইনচার্জের দায়িত্বে থাকা এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ চারজনকে ২০২০ সালের ১২ অক্টোবর সাময়িক বরখাস্ত ও তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়।

তারপর পুলিশি হেফাজত থেকে কনস্টেবল হারুনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। প্রধান আসামি এসআই আকবরকে ৯ নভেম্বর সিলেটের কানাইঘাটের ডোনা সীমান্ত থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারপর থেকে তিনি কারাগারেই ছিলেন। গত বছরের ১০ আগস্ট উচ্চ আদালত থেকে তিনি জামিন পান। পরদিন ১১ আগস্ট তিনি সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। পরে উচ্চ আদালত তাঁর জামিন স্থগিত করলেও তিনি আদালতে আর আত্মসমর্পণ করেননি।

২০২১ সালের ৫ মে আলোচিত এ মামলায় পাঁচ পুলিশসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, পিবিআই পরিদর্শক আওলাদ হোসেন। তিনি বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জের দায়িত্বে থাকা এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে (৩২) প্রধান অভিযুক্ত করে ছয় আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন। এদিকে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে নিহত রায়হানের মরদেহে ১১১টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। সাক্ষ্য-প্রমাণ শেষে বৃহস্পতিবার আদালত এই আলোচিত মামলার রায় প্রদান করেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত