পরিকল্পনায় বনজীবীরা কোথায়

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৮ এএম

সুন্দরবনের গাছ বদলে যাওয়ার সংবাদ পড়তে গিয়ে ভাবি, এই পরিবর্তন বনের ওপর নির্ভরশীল একটি পরিবারের আয় ও সংসারের খরচে কতটা প্রভাব ফেলছে। মাছ ধরতে যাওয়ার খরচ, মধু সংগ্রহের আয়, সন্তানের পড়াশোনা, অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা বনের পরিবর্তনের সঙ্গে এই হিসাবগুলোর সম্পর্ক কতটা, সুন্দরবন সংরক্ষণের আলোচনায় বননির্ভর মানুষের আয় ও সংসারের ওপর এই পরিবর্তনের প্রভাবকে আমরা কতটা গুরুত্ব দিচ্ছি? গাছের প্রজাতি নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি মানুষের জীবিকার কথাও সমান গুরুত্বে আসা দরকার। বন সুস্থ রাখার উদ্যোগে তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি সুন্দরবনে নতুন চারা জন্মানো, সেগুলোর টিকে থাকা এবং গাছের প্রজাতিগত পরিবর্তন নিয়ে গবেষণার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। একটি গবেষণায় ২০১০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত পর্যবেক্ষণে সুন্দরী গাছের চারার মৃত্যুহার পাওয়া গেছে ৫২ দশমিক ৮৯ শতাংশ। অন্য একটি গবেষণায় চাঁদপাইয়ের নির্দিষ্ট এলাকায় কাঁকড়া গাছের বিস্তার শনাক্ত হয়েছে। গবেষকরা সতর্ক করেছেন, সীমিত এলাকার এই ফল থেকে পুরো সুন্দরবনের অবস্থা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। সুন্দরী গাছ কোথায় কতটা টিকে আছে, গেওয়া কতটা ছড়াচ্ছে এবং কাঁকড়া গাছের বিস্তারে কী পরিবর্তন ঘটছে, তা বুঝতে সুন্দরবনের বিভিন্ন অঞ্চলের তথ্য আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। এই সতর্কতা জরুরি। সুন্দরবন সবুজ থাকলেই তার স্বাস্থ্য ভালো আছে, এমন সিদ্ধান্ত অসম্পূর্ণ। কোন গাছের চারা জন্মাচ্ছে, কতটি টিকে বড় হচ্ছে, কোন প্রজাতির উপযোগী পরিবেশ কমছে, এসব হিসাবও নিতে হবে। আবার প্রজাতির স্বাভাবিক পরিবর্তনকে নির্বিচারে ক্ষতি হিসেবে চিহ্নিত করলে ভুল ব্যবস্থাপনার আশঙ্কা বাড়ে। সংরক্ষণের লক্ষ্য হওয়া উচিত বনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া সচল রাখা।

মিঠাপানির প্রবাহ সেই আলোচনার কেন্দ্রে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় গড়াই নদী দিয়ে মিঠাপানির প্রবাহ কমার সঙ্গে ভাটিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধির সম্পর্ক উঠে এসেছে। একই গবেষণায় স্থান ও ঋতুভেদে লবণাক্ততার পার্থক্য পাওয়া গেছে। ফলে পুরো বনকে একই ধরনের সমস্যার মধ্যে ধরে একটি অভিন্ন ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া যুক্তিসংগত হবে না। কোথায় কত পানি পৌঁছায়, শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ কতটা কমে, কোন খালের সঙ্গে নদীর সংযোগ দুর্বল, তার ধারাবাহিক তথ্য প্রয়োজন। শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বললে ব্যবস্থাপনার দায় অস্পষ্ট থেকে যায়। উজানের পানি প্রত্যাহার, নদীতে পলি জমা, প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তনের পৃথক ভূমিকা নির্ধারণ করতে হবে। কারণ অনুসারে পদক্ষেপও আলাদা। আন্তঃসীমান্ত আলোচনায় শুষ্ক মৌসুমে সুন্দরবনের পানির চাহিদা তুলতে হবে। দেশের ভেতরে নদী ও খালের প্রবাহ সচল রাখার কাজেও সময়সীমা প্রয়োজন। কোন দপ্তর কী কাজের দায়িত্বে আছে, তা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা জরুরি।

খনন প্রকল্প ঘোষণার পর পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজের নিয়মিত তদারকি জরুরি। খননের আগে পানিপ্রবাহ ও জোয়ারে সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন এবং উত্তোলিত পলি রাখার স্থান নির্ধারণ করতে হবে। প্রকল্পের সাফল্য মাপতে হবে বনে পৌঁছানো পানির পরিমাণ দিয়ে। ব্যয় ও খননের দৈর্ঘ্যরে হিসাব যথেষ্ট হবে না। বননির্ভর মানুষের জীবিকা এই মূল্যায়নের অংশ হওয়া দরকার। মাছের পরিমাণ কমলে জেলেকে আরও দূরে যেতে, বেশি খাটতে হয়। মধু সংগ্রহ কম হলে মৌয়ালের আয়ও কমে যেতে পারে। তবে এসব পরিবর্তনের কারণ হিসেবে লবণাক্ততাকে এককভাবে চিহ্নিত করার আগে তথ্য সংগ্রহ জরুরি। আহরণের চাপ, আবহাওয়া, বাজারদর এবং বনে প্রবেশের সুযোগও পরিবারের আয়ে প্রভাব ফেলতে পারে। পরিবেশের পরিবর্তন ও মানুষের আর্থিক ক্ষতির সম্পর্ক বুঝতে দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কোন খালে কখন মাছ মিলছে, কোন এলাকায় ফুল ফোটার সময় বদলাচ্ছে, কোথায় নতুন চারা কম জন্মাচ্ছে, জেলে ও মৌয়ালদের কাছ থেকে নিয়মিত তথ্য নেওয়া যেতে পারে। গবেষকরা সেই তথ্য মাঠপর্যায়ে যাচাই করবেন।

অংশগ্রহণকারীদের সময় ও শ্রমের সম্মানী দিতে হবে। শুধু সভায় ডেকে মতামত শুনলে এমন সহযোগিতা টিকবে না। সংগৃহীত তথ্য এবং সিদ্ধান্ত তাদের কাছেও পৌঁছাতে হবে। সংরক্ষণের খরচ দরিদ্র পরিবারের ওপর চাপানোও অন্যায্য। বনজ সম্পদ আহরণে বিধিনিষেধ দিলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য সময়মতো সহায়তা রাখতে হবে। বিকল্প জীবিকার প্রশিক্ষণ দেওয়ার আগে স্থানীয় বাজারে কাজের সুযোগ যাচাই করা প্রয়োজন। ঋণ দিয়ে দায় শেষ করলে আয়হীন মানুষ আরও দেনায় পড়তে পারেন। নারীদের শ্রম, পানীয় জল সংগ্রহের সময় এবং পরিবারের পরিচর্যার ব্যয়ও এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। পর্যবেক্ষণের তথ্য সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা জরুরি। বন বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য একসঙ্গে প্রকাশ করলে পরিবর্তনের গতি বোঝা সহজ হবে। বছরে একবার প্রতিবেদন প্রকাশের পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য দেওয়া যেতে পারে। কোথায় চারার মৃত্যু বাড়ছে, কোথায় পানির প্রবাহ কমছে, কোন উদ্যোগে অবস্থার উন্নতি হচ্ছে, মানুষ জানতে পারবেন। তখন প্রকল্পের ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব ফল মিলিয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে।

সুন্দরবন রক্ষায় কতটা অগ্রগতি হয়েছে, তা নির্দিষ্ট কিছু কাজের ফলাফল দিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে। শুষ্ক মৌসুমে বনে কতটা পানি পৌঁছাল, চারার টিকে থাকার হার কতটা বাড়ল এবং বননির্ভর পরিবারের আয় কতটা স্থিতিশীল হলো, এসব তথ্য দিয়ে সুন্দরবন রক্ষার অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে হবে। এই কাজের জন্য যৌথ কর্মপরিকল্পনা, নির্দিষ্ট অর্থ এবং স্বাধীন মূল্যায়ন প্রয়োজন। সুন্দরীর পাশে অন্য গাছের বিস্তারের খবর আমাদের পানি ব্যবস্থাপনায় কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা অনুসন্ধানের তাগিদ দিক। বন নিজের নিয়মে বেড়ে ওঠার পরিবেশ পাক। তার ওপর নির্ভরশীল মানুষও পরিকল্পনার সিদ্ধান্তে অংশ নিক।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও মানবাধিকার কর্মী

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত