হৃদয় কঠিন হলে মায়া-মমতা কমে যায়। মানুষ অন্যের কষ্টে ব্যথিত হয় না। ভুল করার পরও অনুশোচনা জাগে না। নিজের আচরণে কেউ কষ্ট পেল কি না, সেই ভাবনাও তাকে আর বিচলিত করে না। কেন এমন হয়? কী কারণে মানুষ নিজের হৃদয়ের কোমলতা হারিয়ে ফেলে?
মানুষের হৃদয় কঠিন হওয়ার পেছনে নানা কারণ রয়েছে। গুনাহের প্রতি উদাসীনতা হৃদয়কে কঠিন করে দেয়। মানুষ যখন প্রথম কোনো অন্যায় করে, তখন তার ভেতরে অনুশোচনা কাজ করে। মনে অপরাধবোধ জাগে। কিন্তু একই অন্যায় বারবার করতে থাকলে একসময় সেই অনুভূতি কমে যায়। যে মিথ্যা বলার পর একসময় অনুতপ্ত হতো, সে পরে অনায়াসে মিথ্যা বলতে শেখে। যে অন্যের অধিকার নষ্ট করে অস্বস্তি বোধ করত, সে একসময় সেটাকেই স্বাভাবিক মনে করতে শুরু করে। এভাবে পাপের অভ্যাস মানুষের বিবেককে দুর্বল করে দেয়।
দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তিও হৃদয়ের কোমলতা কেড়ে নেয়। অর্থ, সম্পদ, পদমর্যাদা ও মানুষের প্রশংসা অর্জন যখন জীবনের প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে, তখন মানুষ অনেক সময় নৈতিকতার চেয়ে স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেয়। নিজের লাভের জন্য অন্যের ক্ষতি করতেও দ্বিধা করে না। কারও বিপদে পাশে দাঁড়ানোর পরিবর্তে সে হিসাব করে, এতে তার কী লাভ হবে। অথচ সম্পদ মানুষের প্রয়োজন মেটানোর উপায়, জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য নয়।
অহংকারও হৃদয় কঠিন হওয়ার অন্যতম কারণ। অহংকারী মানুষ নিজের ভুল দেখতে চায় না। কেউ তাকে সংশোধন করতে চাইলে সে বিরক্ত হয়। নিজের অবস্থান, জ্ঞান কিংবা সাফল্য নিয়ে সে এতটাই গর্বিত হয়ে ওঠে যে, অন্যের কথা শোনার মানসিকতা হারিয়ে ফেলে। অথচ বিনয় মানুষকে সত্য গ্রহণ করতে শেখায়। নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে সাহায্য করে।
কখনো কখনো দীর্ঘদিনের কষ্ট, অবহেলা ও বিশ্বাসভঙ্গ থেকেও মানুষের মধ্যে এক ধরনের কঠোরতা তৈরি হয়। বারবার আঘাত পেয়ে কেউ হয়তো নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা বন্ধ করে দেয়। কাউকে বিশ্বাস করতে ভয় পায়। নিজের কষ্ট আড়াল করতে গিয়ে অন্যের কষ্টের প্রতিও উদাসীন হয়ে পড়ে। তবে মনে রাখতে হবে, মানসিকভাবে নিজেকে রক্ষা করার জন্য দূরত্ব তৈরি করা আর অন্যের প্রতি নিষ্ঠুর হয়ে ওঠা এক বিষয় নয়। নিজের সীমারেখা বজায় রেখেও মানুষের প্রতি দয়াশীল থাকা সম্ভব।
হৃদয়ের কোমলতা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথমে নিজের ভেতরের অবস্থা বুঝতে হবে। আমি কি সহজে অন্যকে ক্ষমা করতে পারি? কারও কষ্ট দেখলে আমার মনে কি মায়া জাগে? ভুল করলে কি অনুতপ্ত হই? কেউ আমার ভুল ধরিয়ে দিলে কি তা মেনে নিতে পারি? এমন প্রশ্নের সৎ উত্তর নিজের কাছে খুঁজতে হবে।
আল্লাহর স্মরণ, নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত, নিজের কাজের হিসাব নেওয়া এবং বেশি বেশি তওবা হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করতে সাহায্য করে। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, এতিমের প্রতি স্নেহশীল হওয়া, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা এবং মানুষের সঙ্গে কোমল আচরণ করার অভ্যাসও হৃদয়ের কোমলতা ফিরিয়ে আনে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।’ (সহিহ বুখারি)
হৃদয়ের কঠোরতা থেকে মুক্তি পেতে হলে অন্যের ভুল দেখার আগে নিজের ভুলগুলো দেখতে শিখতে হবে। মনে রাখতে হবে, আজ যে মানুষটি অন্যের কষ্ট বুঝতে পারছে না, সেও কোনো একদিন অন্যের সহানুভূতির মুখাপেক্ষী হতে পারে।
লেখক : ইসলামি গবেষক