গ্যাসের নমুনায় কনডেনসেট খনি পাওয়ার আভাস

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১২ এএম

কক্সবাজারে মিলতে পারে প্রাকৃতিক গ্যাসের খনি। গ্যাসের আলামত দেখে মনে করা হচ্ছে  সেখানে হায়ার হাইড্রোকার্বন রয়েছে। গ্যাসের সঙ্গে কনডেনসেট-এর উপস্থিতি লক্ষ্য করেছে বাপেক্সের প্রতিনিধিদল। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার কথাও বলছেন তারা।   

বাংলাদেশে স্বল্পগভীরতায় অর্থাৎ টিউবওয়েল  খনন করতে গিয়ে যে গ্যাস পাওয়া যায় তার সঙ্গে কক্সবাজারে গ্যাসের বড় পার্থক্য পাওয়া গেছে। স্বল্পগভীরতায় পাওয়া গ্যাসের সঙ্গে পানি উঠে আসে। কক্সবাজারে পাওয়া গ্যাসের সঙ্গে কনডেনসেট উঠছে। সাধারণত গ্যাস খনি থেকেই গ্যাসের সঙ্গে কনডেনসেট উঠে আসে।

 ভোলার শাহবাজপুর এলাকায় স্বল্পগভীরতায় এমন গ্যাস পাওয়া গেছে। গত ২৫ থেকে ৩০ বছর আগে থেকে সাধারণ মানুষ নিজের উদ্যোগে পাইপলাইনের মাধ্যমে এসব গ্যাস ব্যবহার করেন। শাহবাজপুরের ওপরের স্তরের এই গ্যাসগুলো মূলত বায়োজেনিক গ্যাস। শুধু শাহবাজপুর নয় দেশের বিভিন্ন এলাকায় এমন বায়োজেনিক গ্যাস পাওয়া যায়। কোথাও কোথাও এক মাস বা তারপর এ গ্যাসের আগুনের তীব্রতা কমে আসে।

বাপেক্সের কর্মকর্তারা বলছেন, বায়োজেনিক গ্যাস অণুজীবের মাধ্যমে জৈব পদার্থ ভেঙে মিথেন তৈরি হয়। সাধারণত অগভীর ভূ-স্তরে এ ধরনের গ্যাস পাওয়া যেতে পারে।

অন্যদিকে গ্যাস ক্ষেত্রে যে গ্যাস পাওয়া যায় তা থার্মোজেনিক গ্যাস। ভূ-গর্ভে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপের প্রভাবে জৈব পদার্থ থেকে গ্যাস তৈরি হয়। গভীর গ্যাসক্ষেত্রে এ ধরনের গ্যাস বেশি পরিচিত। 

জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার সাবেক পরিচালক মুকবুল ই ইলাহী বলেন, স্বল্পগভীরতায় গ্যাস পাওয়া যাবে না এটি সঠিক নয়। আমাদের ভোলার শাহবাজপুরে এ ধরনের গ্যাস পাওয়া যায়। গত ২৫ থেকে ৩০ বছর ধরে ভোলার এসব গ্যাস সাধারণ মানুষ নিজ উদ্যোগে ব্যবহার করছেন। এ ছাড়া ভোলার শাহবাজপুর এবং ভোলার ইলশায় পরে বাপেক্স গ্যাসের খনি আবিষ্কার করেছে।

বাপেক্সের ব্যবস্থাপক ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এসএম নাফিকুন আরহাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখানে উচ্চমাত্রার হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতি রয়েছে। ভোলায় এমন স্বল্পগভীরতায় গ্যাস পাওয়ার কথা উল্লেখ করে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শাহবাজপুরের গ্যাসের সঙ্গে কক্সবাজারের গ্যাসের পার্থক্য রয়েছে। ভোলার শাহবাজপুরের এসব গ্যাস বায়োজেনিক। ওই গ্যাসের সঙ্গে পানি ওঠে। কিন্তু কক্সবাজারের এই গ্যাস বায়োজেনিক নয়। এই গ্যাসের সঙ্গে কনডেনসেট উঠছে। তাদের পর্যবেক্ষণে মনে হচ্ছে এখানে গ্যাস পাওয়া যেতে পারে।

তিনি আরও বলেন, প্রায় ১ হাজার ফুট গভীরে নলকূপ খননের সময় গ্যাসের স্তরের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর উচ্চচাপের গ্যাস বিভিন্ন ফাটল বা দুর্বল স্তর দিয়ে ভূ-পৃষ্ঠে উঠে আসতে পারে। পরে কোনো উৎস থেকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের সংস্পর্শে এসে গ্যাসে আগুন ধরে যায় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নাফিকুন আরহাম আরও বলেন, গ্যাসের চাপ বেশি থাকায় জোর করে প্রবাহ বন্ধ করতে গেলে অন্য কোনো ফাটল দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই আপাতত মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চারপাশের ২০০ মিটার এলাকায় প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত করে কাঁটাতারে বেড়া দিতে প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। গ্যাসের চাপ ও নির্গমনের মাত্রা বিশ্লেষণ না করে আগুন কত দিন জ¦লবে, তা বলা সম্ভব নয়।

তবে চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য গ্যাসের নমুনা পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করতে হবে। গ্যাসের তীব্রতা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকায় তা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি বলেও জানান তিনি।

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ খননের গর্তে তিন দিন ধরে আগুন জ¦লছে। আগুনের তীব্রতা ক্রমে বাড়ছে। বায়োজেনিক গ্যাস হলে এর তীব্রতা কমে যেত।

ওই এলাকাতে ভূমিধস ও বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এই কারণে আগুন নির্গতের স্থানের চারদিকে ২০০ মিটার এলাকায় নিরাপত্তা বলয় তৈরি করছে প্রশাসন।

গত ২৭ অক্টোবর সকাল ৮টায় শহর থেকে আনুমানিক ২৫ কিলোমিটার দূরের ইনানীর ছোট সেতুসংলগ্ন এলাকার জনৈক আবদুল্লাহ বাড়িতে টিউবওয়েল বসানোর স্থান থেকে দাউ দাউ করে আগুন জ¦লতে দেখা যায়।

মঙ্গলবার রাতেই ঢাকা থেকে  বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) প্রতিনিধিদলকে আনা হয়। দলটি, মঙ্গলবার রাতে ও বুধবার বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। ওই সময় ঘটনাস্থালের চারদিক থেকে মাটি, বালু, পানির নমুনা নিলেও এখনো নুড়ি পাথর সহ আরও কিছু নমুনা সংগ্রহ করতে পারেনি প্রতিনিধি দল। সংগ্রহকৃত আলামত তারা ঢাকা পাঠিয়েছেন বলে জানা গেছে।

সরেজমিনে বৃহস্পতিবার বিকেলে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়,  উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইনানীর এলজিআইডি সড়কের ছোট ব্রিজসংলগ্ন লাগোয়া ঢাকার মো. আবদুল্লাহর বাড়ি। ওখানেই গত মঙ্গলবার সকাল থেকে  নলকূপ বসানোর স্থানে আগুন জ¦লছে। আগুনের তীব্রতা ও গ্যাসের গন্ধ অনেকটা এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। আগুন জ¦লার স্থানকে কেন্দ্র-এর চারপাশে ২০০ মিটার বৃত্ত তৈরি লাল পতাকা টাঙানো হচ্ছে। পাশাপাশি চলছে কাঁটাতারের সীমানা দেওয়ার কাজ। এর পাশেই পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস একাধিক টিম অবস্থান করছে।

জালিয়াপালং ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শামশুল আলম বলেন, তিন দিন হয়ে গেল আগুন নিভেনি। উল্টো-এর তীব্রতা বাড়ছে। উত্তর-পশ্চিম থেকে আসা বাতাসে আগুন দক্ষিণের দিকে বাহিত হচ্ছে। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে এলাকার লোকজন। কারণ ওই দিকেই জিনবসতি বেশি। তিনি আরও বলেন, এই আগুন থেকে মাঝেমধ্যেই বিস্ফোরণের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। এবং আশপাশে অনেকস্থান থেকে মাটি সরে যাচ্ছে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজারের সিনিয়র স্টেশন অফিসার দোলন আচার্য্য বলেন, টানা আগুন জ¦লার কারণে এই এলাকার ভূমিধস ও বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই কারণে বাপেক্সের পরামর্শমতে, ২০০ মিটার মধ্যে সবাইকে সরিয়ে নিয়ে সীমানা নির্মাণকাজ করছে প্রশাসন। এ ছাড়া গেল তিন দিন ধরে ফায়ার সার্ভিস দুটি টিম সার্বক্ষণিক এখানে অবস্থান করছে।

তিনি আরও বলেন, প্রতিনিধিদল আগুন নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত কক্সবাজারে অবস্থান করবে।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার বলেন, ঘটনাস্থলের চারপাশে ২০০ মিটার এলাকা কাঁটাতার দিয়ে ঘেরাওয়ের কাজ চলছে। নিরাপত্তার স্বার্থে এলজিআইডির সড়কটি আপাতত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিকল্প পথে জনগণকে চলাচল করতে বলা হয়েছে।

বাপেক্সের অনুসন্ধান বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জেবুন নাহার বলেন, সাধারণত মাটির অগভীর স্তরে বায়োজেনিক গ্যাসের ছোট ছোট পকেট থাকে। বাপেক্স সাধারণত ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ মিটার গভীরতার স্তর থেকে গ্যাস উত্তোলন করে। কিন্তু ইনানীতে প্রায় ৮০০ ফুট গভীরতার স্তর থেকে গ্যাস বের হচ্ছে। সেখানে জোনভিত্তিক ভূতাত্তিক জরিপ হলেও গভীর অনুসন্ধান হয়নি।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান আরও বলেন, উখিয়ার ছোট ইনানীর ছোট খাল এলাকার নলকূপ থেকে গ্যাস উদ্গিরণ স্থল এবং আশপাশের এলাকায় যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরণ ও ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে। তাই আগন্তুক সহ স্থানীয়দের দূরবর্তী স্থানে অবস্থানের জন্য সতর্ক করা হয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত