২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফকে প্রাণদন্ডাদেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই মামলায় কুষ্টিয়া আ.লীগের তিন শীর্ষ নেতাকে দেওয়া হয়েছে আমৃত্যু কারাদন্ড। গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নের্তৃত্বে গঠিত ট্রাইব্যুনাল এ রায় দেয়। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য-বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
আমৃত্যু কারাদন্ডপ্রাপ্ত তিনজন হলেন কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সদর উদ্দিন খান, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসগর আলী ও কুষ্টিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান। আসামিদের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়া শহরে ছয়জনকে হত্যাসহ তিনটি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়। তবে, প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামিম সাংবাদিকদের বলেন, প্রসিকিউশন এ মামলায় ঘটনাভিত্তিক তিনটি অভিযোগ এনেছে। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল তিনটি অভিযোগকে অপরাধভিত্তিক পাঁচটি অভিযোগ গঠন করেন। দন্ডিত চারজন বিচারের শুরু থেকেই পলাতক রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। ট্রাইব্যুনালে পলাতক আসামিদের পক্ষে শুনানি করেন রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবীরা।
জুলাই অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এ নিয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের তিন নেতা সর্বোচ্চ সাজায় দন্ডিত হলেন। ইতিমধ্যে দলের সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ফাঁসির দন্ডের রায় হয়েছে ট্রাইব্যুনালে।
গতকালের রায়ে একটি অভিযোগে হানিফকে মৃত্যুদন্ড এবং দুই অভিযোগে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ড দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। অন্য তিন আসামিকে একটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদন্ড এবং দুই অভিযোগে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। আরেকটি অভিযোগে চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। রায়ে দন্ডিতদের স্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করে তা বিক্রির মাধ্যমে পাওয়া অর্থ জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ সংস্থার মাধ্যমে গণঅভ্যুত্থানের হতাহতদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দিতে বলেছে ট্রাইব্যুনাল।
গত ৭ অক্টোবর এ মামলায় সবশেষ ধাপ যুক্তিতর্কের শুনানি নিয়ে রায় যেকোনো দিন ঘোষণা করা হবে মর্মে অপেক্ষমান রেখেছিল ট্রাইব্যুনাল। এ মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১৯ জন সাক্ষ্য দেন। গত ২৭ অক্টোবর এক আদেশে রায়ের জন্য ২৯ অক্টোবর (গতকাল বৃহস্পতিবার) ধার্য করে আদালত। সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান অনুযায়ী দন্ডিত পলাতক চার আসামি এ রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিলের সুযোগ পাবেন না। আপিল করতে হলে তাদের আত্মসমর্পণ করতে হবে।
সন্তোষ প্রসিকিউশনের, হতাশ আসামিদের আইনজীবী : রায়ের প্রতিক্রিয়ায় চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালের এই রায় অত্যন্ত সময়োপযোগী। আমরা জুলাই শহীদদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, আসামিরা বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন। মামলার শুনানির সময় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, তারা দেশের বাইরে রয়েছেন। তাদের গ্রেপ্তার ও ফিরিয়ে আনার জন্য যাবতীয় আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।’ আসামিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রসিকিউশনের প্রধান কৌঁসুলি বলেন, ‘পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর আমরা সরকারের কাছে চিঠি লিখব, যাতে এই সম্পত্তিগুলো আয়াত্তে নিয়ে বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়। তবে, কার সম্পত্তি কোথায় আছে, সেটা সরকার খুঁজে বের করে দেখবে।’
দন্ডপ্রাপ্ত আসামি হানিফের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ রায় নিয়ে আমার বলার কিছু নেই। রায়টি আমার কাছে অপ্রত্যাশিত মনে হয়েছে। আমি হতাশ।’
যে তিন অভিযোগে আসামিদের সাজা : প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৫, ১৭ ও ৩০ জুলাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে উপস্থিত থেকে তার (ওবায়দুল কাদের) উসকানিমূলক বক্তব্যকে সমর্থন করেন মাহবুব-উল আলম হানিফ। এ ছাড়া তিনি ২৯ জুলাই জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনা সভায় আন্দোলনকারীদের জামায়াত, সন্ত্রাসী, সাম্প্রদায়িক ট্যাগ দিয়ে হত্যা ও নির্যাতনের নির্দেশ, উসকানি, প্ররোচনা ও সহায়তা দেন।
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, হানিফের নির্দেশে ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে সদর উদ্দিন খান, আসগর আলী ও আতাউর রহমানসহ অন্য আওয়ামী লীগের নেতারা সভা করেন। ওই সভায় নিরীহ নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সন্ত্রাসী কর্মকা- হিসেবে উল্লেখ করে কুষ্টিয়া শহরে আন্দোলন দমনে সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগের জন্য আওয়ামী সন্ত্রাসীদের নির্দেশ দেওয়া হয়।
তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়, এই মামলার চার আসামির নির্দেশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গসংগঠনের সন্ত্রাসীরা ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালায়। তাদের গুলিতে সেদিন আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী, আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, মো. উসামা, বাবুল ফরাজী ও ইউসুফ শেখ এই ছয়জন শহীদ হন।
আওয়ামী লীগ একটি ‘ক্রিমিনাল অর্গানাইজেশন’ : রায়ের প্রতিক্রিয়ায় প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামিম এক ভিডিও বার্তায় বলেন, “মামলায় পঞ্চম অভিযোগটি ছিল ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ’ বা অভিন্ন অপরাধমূলক উদ্দেশ্য এবং ক্রিমিনাল অর্গানাইজেশন (অপরাধমূলক সংগঠন)। অভিযোগ গঠনের সময় ট্রাইব্যুনাল বলেছিল দেশব্যাপী ব্যাপক ও পদ্ধতিগত আক্রমণের মাধ্যমে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ছিল আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক পরিকল্পনার অংশ, যেটি বাস্তবায়ন করেছে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও ১৪ দলীয় জোট।” তিনি বলেন, “ট্রাইব্যুনালে এ অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে এবং চার আসামিকেই এ অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগকে একটি ‘ক্রিমিনাল অর্গানাইজেশন’ হিসেবে এই অভিযোগে এই মামলার রায়ে পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে।”
রায়ে সন্তুষ্ট শহীদ পরিবার : কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জনান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ঘোষিত এ রায়ের প্রতিক্রিয়া জানতে নিহতদের পরিবারের সঙ্গে আলাপকালে তারা সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তবে তাদের দাবি ঘোষিত রায়ে ধার্য শাস্তি দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কেবল এ বিচারপ্রক্রিয়া ফলপ্রসূ হবে বলে তাদের মত। তাদের দাবি, দন্ডিত আসামিরা পলাতক, ধরাছোঁয়ার বাইরে। সরকার যদি তাদের দ্রুত সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় এনে রায় কার্যকর করতে পারেন, তবে তা হবে সব প্রচেষ্টার সফলতা। অন্যথায় অনেকটা পাগলের সুখ মনে মনে হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।
জুলাই শহীদ বাবলু ফারাজীর ছেলে সুজন মাহামুদ সন্তুষ্টি প্রকাশ করে দাবি করেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আমার বাবা বাবলুসহ ছয়জনকে সরাসরি হত্যা করেছিল পুলিশ। এ হত্যাকা-ের হুকুমদাতা ও মাস্টারমাইন্ডদের দন্ড দিয়েছে আদালত। অথচ যাদের হাতে হত্যাকা- ঘটেছিল সেই পুলিশ এখনো আইনের আওতায় আসেনি। এতে সংঘটিত অপরাধের অর্ধেকটার বিচার হলেও বাকি অর্ধেকটা এখনো বাকি।
শহীদ আশরাফুল ইসলামের স্ত্রী লাবনী খাতুনের অভিযোগ, ‘আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার যেভাবে চেয়েছিলাম, সেভাবে না হলেও বিচারক আজকে যে রায় ঘোষণা করেছেন, তাতে আমি খুশি। তবে এই খুশির সার্থকতা হবে রায় কার্যকরের মধ্য দিয়ে।
নিহত সুরুজ আলী বাবুর স্ত্রী ফাহিমা খাতুন জানান, এ রায় যদি দ্রুত কার্যকর হয় তাতেই আমি খুশি।
সুরুজের মা রেহেলা খাতুন জানান, ‘আমার খালি বুক তো আর কোনো দিন পূরণ হবে না, তবে এ রায়ে আমি সন্তুষ্ট।