ইটভাটায় কাজ করেন দাদা। ছয় বছরের মেয়ে নানাবাড়ি থেকে বাবার হাত ধরে দাদার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন ইটভাটায়। সেদিন ছিল বুধবার। দাদার সঙ্গে দেখা হয়, কথাও হয়। কিন্তু তখন কে জানত দাদার সঙ্গে এই দেখাই শেষ দেখা, শেষ কথা হবে ছয় বছরের ওই মেয়েটি।
ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিবেশীর সঙ্গে জমিসংক্রান্ত বিরোধের বলি হতে হয়েছে ছয় বছরের মেয়ে ও বাবাকে। দাদার সঙ্গে দেখা করার পর ফেরার পথে বাবার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ছয় বছরের মেয়েকে গলা কেটে হত্যা করে মরদেহ ইটভাটার কাছে পরিত্যক্ত জমিতে ফেলে রেখে যায় দুর্বৃত্তরা। আর বাবাকে ধারালো অস্ত্রে কুপিয়ে রক্তাক্ত করে। একদিন পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন বাবাও।
মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে বাবা গোলাপ হোসেন (৩৮) ও মেয়ে তোয়াবা (৬) হত্যার ঘটনা ঘটে। নিহত গোলাপ হোসেন জেলার সিরাজদিখান উপজেলার লতব্দী ইউনিয়নের দোসরপাড়া গ্রামের জয়নাল মিয়ার ছেলে। তবে একই উপজেলার পার্শ্ববর্তী বালুচর ইউনিয়নের খাসকান্দি গ্রামের শ্বশুরবাড়িতে পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন তিনি।
জমি নিয়ে বিরোধের জেরে বাবা-মেয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করছেন নিহতের পরিবারের সদস্যরা। হত্যকা-ের নেপথ্যের কারণ খুঁজতে পুলিশও জমি নিয়ে বিরোধের সূত্র ধরে এগোচ্ছে। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সোহরাব হোসেন নামে এক প্রতিবেশীকে আটক করেছে পুলিশ।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে উপজেলার রামকৃষ্ণদী গ্রামের মোল্লা ব্রিকসের ইটভাটার কাছের একটি পরিত্যক্ত জমি থেকে ছয় বছরের মেয়ে তোয়াবার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এদিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বাবা গোলাপ।
পুলিশ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একই গ্রামের রামকৃষ্ণদী গ্রামের একটি ইটভাটায় কাজ করতেন তোয়াবার দাদা জয়নাল মিয়া। গত বুধবার বিকেল ৫টার দিকে নানাবাড়ি খাসকান্দি গ্রাম থেকে বাবার হাত ধরে দাদার সঙ্গে দেখা করতে রামকৃষ্ণদী গ্রামের ইটভাটায় ছুটে আসেন ছয় বছরের তোয়াবা। দেখা ও কথাবার্তা শেষে রাত ৮টার দিকে খাসকান্দি গ্রামের উদ্দেশে রওনা দেন বাবা-মেয়ে। পথে রামকৃষ্ণদী বাজারে মেয়েকে নিয়ে চা পান করেন বাবা গোলাপ। এরপর উপজেলার পাথরঘাটা এলাকায় পৌঁছলে মুখোশধারী একদল দুর্বৃত্ত তাদের পথরোধ করেন। এ সময় বাবাকে মারধর ও ধারালো অস্ত্রে কুপিয়ে মেয়ে তোয়াবাকে ছিনিয়ে নেয়। পরে ছয় বছরের তোয়াবাকে হত্যার পর ইটভাটার পাশের একটি পরিত্যক্ত জমিতে ফেলে রেখে যায় দুর্বৃত্তরা। আর একপর্যায়ে গোলাপ সেখান থেকে পালিয়ে কোনোরকমে বাবার বাড়িতে পৌঁছান। পরে রাত ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে গোলাপ হোসেনকে ঢাকার কেরানীগঞ্জের আব্দুল্লাহপুর এলাকার স্বদেশ হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখান থেকে পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। গোলাপের পরিবারের সদস্যদের দাবি, প্রতিবেশী সোহরাব হোসেনের সঙ্গে তাদের জমি নিয়ে বিরোধ চলছিল। এ বিরোধের জের ধরে এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে তারা মনে করছেন। নিহত তোয়াবার নানি তাসলিমা বলেন, প্রতিবেশী সোহরাবের সঙ্গে তার ছেলের জমিসংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে। এ বিরোধের জেরেই ঘটনা ঘটেছে বলে তারা ধারণা করছেন। নিহত গোলাপের মা হাসু বেগম বলেন, সোহরাবদের সঙ্গে তার ছেলের জমি নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। সোহরাবকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে এ ঘটনা সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. কামরান হোসেন জানান, ময়নাতদন্তের জন্য গোলাপ হোসেনের মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ও তোয়াবার মরদেহ মুন্সীগঞ্জ সদর হাসপাতালের মগ্যে পাঠানো হয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. কামরান হোসেন বলেন, স্বদেশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গোলাপ পুলিশকে জানিয়েছে সোহরাব নামে এক ব্যক্তির নেতৃত্বে কয়েকজন মুখোশধারী তার ও তার মেয়ের ওপর হামলা চালায়। তার বক্তব্যের ভিত্তিতে সোহরাবকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ঘটনার সময় তিনি কোথায় ছিলেন এবং অন্য কারও সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, নিহত গোলাপের শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের সঙ্গে সোহরাবের জমিসংক্রান্ত মামলা-মোকদ্দমা চলছে। এ বিরোধের জেরে উভয় পক্ষের কয়েকজনের কারাভোগের তথ্যও পাওয়া গেছে। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে সিরাজদিখান থানা পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।