পুলিশ কর্তাদের সম্পদে চোখ গোয়েন্দাদের

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩৪ এএম

সম্প্রতি পুলিশের একজন অতিরিক্ত ডিআইজির বাড়িতে ডিবির অভিযান ঘিরে এখনো চলছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়। রাজধানীর পূর্বাচলে একটি প্রজেক্টে পুলিশ কর্মকর্তাদের একাধিক ফ্ল্যাট তৈরি করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। আবার অনেকে বিভিন্ন স্থানে জমির ব্যবসাও করছেন। কারও আছে বাড়ি ও একাধিক ফ্ল্যাট। আছে দেশের বাহিরে বিশাল অর্থ-সম্পদও। অনেকের সন্তান পড়াশোনা করছে দেশের নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিংবা উন্নত দেশে। চাকরির বেতনের সঙ্গে সহায়-সম্পদ ও জীবনযাপনের মিল না থাকায় সন্দেহভাজন পুলিশ কর্মকর্তাদের বিষয়ে তদন্ত করছে দুদক ও গোয়েন্দা সংস্থা।

রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অনেক পুলিশ কর্মকর্তাদের সম্পদের পরিমাণ দেখে হতবাক হন রাষ্ট্রের কর্তা-ব্যক্তিরা। এসব তথ্য পেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা সাবেক ও বর্তমান পুলিশ কর্মকর্তাসহ অন্য সদস্যদের সম্পদের দিকে ‘বিশেষ চোখ’ রেখেছে। এরই মধ্যে একটি তালিকার কাজ গুটিয়ে আনা হয়েছে বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। সরকারের হাইকমান্ডের সিগন্যাল এলেই তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে ব্যবস্থা। এমনকি নজরদারিতে তাদের রাখা হয়েছে ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের একটি অসাধু সিন্ডিকেটের নানা অনিয়ম নিয়ে দুদক ও গোয়েন্দা সংস্থার কাছে অভিযোগ এসেছে। অভিযোগ আমলে নিয়ে যাচাই-বাছাই চলছে। পুলিশের প্রজেক্টে আলিশান বাড়ি তৈরির পেছনে কোথায় থেকে এসেছে অর্থ তা নিয়েও চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। এই তালিকায় সাবেক একাধিক আইজিপিসহ বর্তমান কর্মকর্তারাও রয়েছেন। তারা ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত। পিআরবিসহ প্রচলিত যাবতীয় বিধি লঙ্ঘন করে পুলিশের কেউ কেউ রাজনৈতিক দলের আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, পুলিশে কর্মরত একাধিক কর্মকর্তার দিকেও চোখ রেখেছে দুদকসহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। তালিকায় যাদের নাম এসেছে, তাদের ঢাকাসহ দেশের বাহিরে ‘বিশাল সম্পদ’ রয়েছে। তাদের অনেকের সন্তান বিদেশে পড়ালেখা করছেন। গত ১৭ সেপ্টেম্বর অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের কর্মকর্তা ও সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী জাকিয়া পারভীনের সম্পদ বিবরণী তলব করে নোটিস জারির সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক। দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে তাদের নামে প্রায় ৩ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। গত ১৫ অক্টোবর জ্ঞাত আয় বহির্ভূত প্রায় ৮৩ লাখ টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পুলিশ পরিদর্শক মো. ফখরুদ্দীন ভূঞা ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। ফখরুদ্দীন বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় পুলিশ কর্মরত আছেন। ঘটনার সময় তিনি ময়মনসিংহ জেলা গোয়েন্দা শাখায় ছিলেন। এরই মধ্যে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে হারুন অর রশীদের বিরুদ্ধে করা পৃথক দুই মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। একটি মামলায় হারুনকে প্রধান আসামি এবং অপর মামলায় তার ছোট ভাই চিকিৎসক ডা. এবিএম শাহরিয়ারকে প্রধান আসামি ও হারুনকে সহযোগী আসামি করা হয়েছে। সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং অর্থ পাচারের মামলার তদন্ত ও বিচার চলমান রয়েছে। সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হকের অবৈধ সম্পদের নথিপত্র ও প্রমাণাদি লুকানোর চেষ্টার ঘটনায় দুদক অভিযান চালিয়েছে। সপ্তাহখানেক আগে পুলিশের এসআই হুমায়ন কবিরের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। এই রকম একাধিক অভিযোগ উঠেছে পুলিশের কোনো কোনো কর্মকর্তা ও সদস্যদের বিরুদ্ধে।

যেসব অভিযোগ নিয়ে হচ্ছে তদন্ত : পুলিশের সম্পদ নিয়ে এবার নজরদারি করা হচ্ছে। আয়ের সাথে সম্পদের সামঞ্জস্য, জমি-ফ্ল্যাটের মালিকানা, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ এবং পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পত্তি নিয়ে গোপনে চলছে তদন্ত। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো কর্মকর্তা বা সদস্যের সম্পদ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে কিনা, আয়ের উৎসের সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়ের মিল আছে কি না, কিংবা সম্পদ অর্জনে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আছে কিনা এসব বিষয় বেশি যাচাই করা হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে একটি গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশের কতিপয় কর্মকর্তা ও অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ঘুষ গ্রহণ, অবৈধ সুবিধা নেওয়া বা প্রভাব খাটিয়ে সম্পদ অর্জনের অভিযোগগুলো আমলে নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি পূর্বাচলে পুলিশের প্রজেক্টে একজন ডিআইজির বাড়িতে অভিযান ও তল্লাশির পর সেখানে  আলিশান একাধিক বাড়ির সন্ধান পাওয়া যায়। ওইসব বাড়ি বর্তমান ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাদের। তাদের বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছি। এমনকি ১০ বছর আগে অবসরে যাওয়া পুলিশ কর্মকর্তা ও অন্যদেরও সম্পদ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে অহেতুক কাউকে হয়রানি করা হবে না বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

পুলিশের কাজের ধরন বিবেচনার কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ বেশি উঠেছে। বিশেষ করে মামলা গ্রহণ, তদন্ত, গ্রেপ্তার, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, অপরাধপ্রবণ এলাকায় অভিযান এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ঘিরে কোনো কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার আছে অভিযোগে। এ বিষয়ে দুদকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অধীনস্থ কর্মকর্তা, ঘনিষ্ঠ সহকর্মী বা প্রভাবশালী কারও স্বার্থ জড়িত থাকলে, তা তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়েও মাঝেমধ্যে প্রশ্ন আছে। আমরা সূক্ষ্মভাবে বিষয়গুলো তদন্তের চেষ্টা করছি। তদন্ত কর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, অভিযোগ এলেই যে তদন্ত করতে হবে, তা আইনে নেই। তবে গুরুতর অভিযোগগুলো আমলে নিতে বলা হয়েছে। কারও বৈধ আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদের প্রমাণ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

বেনামি সম্পত্তি ও আসল মালিকানা : অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জটিল বিষয়গুলোর একটি হলো সম্পদের প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ। কোনো বাড়ি, ফ্ল্যাট, জমি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাগজে এক ব্যক্তির নাম থাকলেও তা ক্রয়ের অর্থ কে দিয়েছেন, কে ভোগদখল করছেন এবং কে প্রকৃত আর্থিক সুবিধার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছে দুদক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। তবে আইনসম্মতভাবে প্রাপ্ত অর্থের উৎস, ক্রয়মূল্য পরিশোধের রেকর্ড, ঋণের নথি, অংশীদারত্বের চুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক সক্ষমতার তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বিদেশে পড়ছে সন্তানরা : পুলিশ কর্মকর্তাদের সন্তানদের বিদেশে শিক্ষাব্যয়ের বিষয়ও এসেছে সামনে। গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য এসেছে, বেশিরভাগ সাবেক ও বর্তমান পুলিশ কর্মকর্তা ও অন্য সদস্যদের সন্তানরা বিদেশে পড়ালেখা করছে। তারা বিশে^র নামি-দামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে। অবৈধভাবে অর্জিত অর্থের বড় একটি অংশ তাদের পরিবারের সদস্য বা নিকটবর্তী ব্যবসায়িক সহযোগীদের নামে নথিভুক্ত করা হচ্ছে। গোয়েন্দারা এখন এই বেনামি মালিকানার শিকড়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছেন। এই প্রসঙ্গে একটি গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশের গুটিকয়েক দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা ও অন্য সদস্যের কারণে পুরো বাহিনীর সুনাম ক্ষুণœ হচ্ছে।

তালিকায় যেসব কর্মকর্তা : গোয়েন্দা সংস্থা ও দুদকের তালিকায় সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদ; ডিএমপির সাবেক কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া, খন্দকার গোলাম ফারুক, শফিকুল ইসলাম; ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ, পিবিআইর সাবেক প্রধান বনজ কুমার মজুমদার, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি ওয়াই এম বেলালুর রহমান, র‌্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ব্যারিস্টার হারুন অর রশীদ, সিআইডির সাবেক প্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়া, অতিরিক্ত আইজিপি দেবদাস ভট্টাচার্য্য, অতিরিক্ত আইজপি খন্দকার লুৎফুল কবীর, ট্যুরিস্ট পুলিশের সাবেক প্রধান মীর রেজাউল আলম, রংপুর রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি আবুদল বাতেন, চৌধুরী মঞ্জুরুল কবির, শেখ নাজমুল আলম, গাজীপুর মেট্রোপলিটনের সাবেক কমিশনার মাহবুব আলম, রংপুর মেট্রোপলিটনের সাবেক কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান, সাবেক ডিআইজি জয়দেব কুমার ভদ্র, ইমাম হোসেন, সিটিটিসির সাবেক প্রধান মো. আসাদুজ্জামান, শাহ মিজান শফিউর রহমান, আনিসুর রহমান, মোল্যা নজরুল ইসলাম, এসএম মোস্তাক আহমেদ, জিহাদুল কবীর, মো. ইলিয়াস শরীফ, শাহ আবিদ হোসেন, মো. জামিল হাসান, সৈয়দ নূরুল ইসলাম, বিপ্লব বিজয় তালুকদার, হামিদুল আলম, ড. শামসুন্নাহার, শেখ রফিকুল ইসলাম, ড. একেএম ইকবাল হোসেন, বিপ্লব কুমার সরকার, মারুফ হোসেন সরদার, বিজয় বসাক, সুব্রত কুমার হালদার, আ স ম মাহতাব উদ্দিন, মোহা আহমারুজ্জামান, খন্দকার নূরুন্নবী, এসএম মেহেদী হাসান, মোহাম্মদ জায়েদুল ইসলাম, প্রলয় কুমার জোয়ারদার, এসএম শফিউল্লাহ, মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন, আসমা সিদ্দীকা মিলি, গোলাম মোস্তফা রাসেলসহ আরও অনেকের নাম রয়েছে।

বিধান থাকলেও প্রয়োগ নেই : সরকারি কর্মচারীদের সম্পদ বিবরণী দাখিলের বিধান রয়েছে। সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ১৩ বিধিতে সম্পত্তির ঘোষণা এবং সম্পদের পরিবর্তনের বিবরণ দাখিলের বিষয় উল্লেখ রয়েছে। বিধিটির প্রয়োগ ও পরবর্তী সরকারি নির্দেশনা অনুসারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সম্পদের হিসাব দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয়ের একটি নির্দেশনায় বলা হয়েছিল সরকারি কর্মচারীদের সম্পদ বিবরণী দাখিল করতে হবে। কিন্তু ওই নির্দেশ আমলে নেয়নি কেউ।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত