ফের এলপিজির দাম বাড়াতে বিইআরসির তোড়জোড়

চলতি অক্টোবর মাসের ৪ তারিখে বিইআরসি ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১,৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে। সরকারের বেঁধে দেওয়া এই দাম উপেক্ষা করে দেশের বিভিন্ন স্থানে ১২ কেজির সিলিন্ডার ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকা পর্যন্ত উচ্চ মূল্যে বিক্রি হচ্ছে।

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০২ এএম

দেশের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজারে তীব্র অস্থিরতা ও সরবরাহ সংকটের মধ্যেই নতুন করে দাম বাড়ানোর তোড়জোড় চলছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বাজারে অনেক বেশি দামে এলপিজি বিক্রি হলেও, কমিশন বা লভ্যাংশ বাড়ানোর দাবিতে ব্যবসায়ীদের চাপে তড়িঘড়ি করে এই গণশুনানি ও মূল্য সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

চলতি অক্টোবর মাসের ৪ তারিখে বিইআরসি ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১,৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে। সরকারের বেঁধে দেওয়া এই দাম উপেক্ষা করে দেশের বিভিন্ন স্থানে ১২ কেজির সিলিন্ডার ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকা পর্যন্ত উচ্চ মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। সরকারি রেটের চেয়ে ভোক্তাদের প্রতি সিলিন্ডারে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি গুনতে হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) এলপিজির দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে দিনভর গণশুনানি করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।

এতে আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা তাদের কমিশন বাড়ানোর দাবি জানান। এসব প্রস্তাব মূল্যায়ন করে কমিশনের কারিগরি কমিটি ১২ কেজির সিলিন্ডারে ১৩৯ টাকা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। এটি কার্যকর হলে বর্তমানে নির্ধারিত ১ হাজার ৮৩৭ টাকার সিলিন্ডারের দাম হবে ১ হাজার ৯৭৬ টাকা।

শুনানির পর সিদ্ধান্ত জানাতে কমিশন ৬০ দিন সময় পেলেও আগামী রবিবারের মধ্যে মতামত জমা দিতে বলা হয়েছে। ফলে শুনানির পর মতামত দেওয়ার জন্য থাকছে মাত্র এক কার্যদিবস। এর আগে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের ধর্মঘটের হুমকির মুখে ১৪ অক্টোবর শুনানির ঘোষণা দেয় বিইআরসি। ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের অভিযোগ, বাড়তি দামে বিক্রির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে তাড়াহুড়ো করে দাম বাড়ানোর পথে এগোচ্ছে কমিশন।

নভেম্বরে নিয়মিত মূল্য সমন্বয়ের কারণেও দাম বাড়তে পারে। বিইআরসি ও আমদানিকারক সূত্র বলছে, বিশ্ববাজারে এলপিজির দাম ও জাহাজভাড়া বেড়ে যাওয়ায় শুধু নিয়মিত সমন্বয়েই ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১০০ টাকার বেশি বাড়তে পারে। এর সঙ্গে বাড়তি কমিশন যুক্ত হলে ভোক্তার ওপর চাপ আরও বাড়বে।

তবে শুনানিতে আসা সবার মতামত বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি না হওয়ার অভিযোগ সব সময়ই আসে। তবে কখনো কম দামেও বিক্রি হয়েছে। কমিশনসহ খরচের দিকগুলো ২০২১ সালে নির্ধারিত হওয়ায় এখন তা পরিবর্তন হতে পারে।

বর্তমানে কোম্পানিগুলো প্রতি ১২ কেজির সিলিন্ডারে মজুত ও বোতলজাত করার খরচ বা কমিশন পায় ২০০ টাকা। ওমেরা এই কমিশন বাড়িয়ে ৪৭৮ টাকা, পেট্রোম্যাক্স ৩৪৯ টাকা, ডেলটা ৩৬০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব করেছে মেঘনা গ্রুপ।

অন্যদিকে পরিবেশকেরা কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা, খুচরা বিক্রেতারা ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা নির্ধারণের আবেদন করেছেন। এ ছাড়া পরিবহনে ব‍্যবহৃত অটোগ‍্যাসের জন্য প্রতি লিটারের কমিশন ৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এলপিজির বাজারের ৯৯ শতাংশ বেসরকারি খাতের দখলে। এর ৮০ শতাংশ ব্যবহৃত হয় রান্নায়। এক কোটির বেশি গ্রাহক এলপিজি ব্যবহার করে। ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে বিইআরসি প্রতি মাসে দাম সমন্বয় করলেও ক্রেতাদের প্রায়ই নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি দিতে হয়।

প্রস্তাব বিশ্লেষণ করে বিইআরসি গঠিত কারিগরি কমিটি বলেছে, ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম হতে পারে ১ হাজার ৯৭৬ টাকা। এতে দাম বাড়ে ১৩৯ টাকা। এর মধ্যে তারা পরিবেশক পর্যায়ে ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০ টাকা ও খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা ধরেছে।

ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বলা হয়, যৌক্তিক পর্যায়ে দাম নির্ধারণ না করা হলে বাজার ঠিক হবে না। এটি হুট করে তৈরি দাবি নয়। দুই বছর ধরে এটি বিইআরসিকে বলা হচ্ছে। এক বছর আগে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে। এখন বাজার পরিস্থিতির কারণে চাপে পড়ে শুনানি আয়োজন করেছে বিইআরসি। আমদানিকারকদের জন্য ১০০ টাকা বাড়াতে হবে। পরিবেশকদের কমিশন ৭০ টাকা ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন ১০৫ টাকা করতে হবে। এ হিসাবে ২৭৫ টাকা বাড়বে। এটি হলে আর কেউ বেশি দামে বিক্রি করবে না।

দাম বাড়ানো নিয়ে গণশুনানিতে তোপের মুখে পড়ে এলপিজি আমদানিকারক ও বিইআরসি। সরকার ঘোষিত দামে না পাওয়া এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে ভোক্তাদের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রশ্ন তোলা হয়। পরিবেশক এবং খুচরা বিক্রেতাদের কেউ কেউ আমদানিকারকদের নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

পরিবেশকদের পক্ষে আবু তাহের কোরেশি বলেন, বোতলজাতকৃত এলপিজি পরিবেশকের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার কথা। কিন্তু যখনই সংকট শুরু হয়, তারা সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এতে বাড়তি খরচ যোগ হয়, নির্ধারিত দামে বিক্রি করা সম্ভব হয় না।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির প্রতিনিধি হিসেবে শুনানিতে অংশ নিয়ে সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, বিইআরসির নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি, অতিরিক্ত চার্জ আদায় এবং এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার প্রতিবাদে শুনানি বর্জন করছে অর্থনীতি সমিতি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত