কুমিল্লায় চলছে দু'দিন শচীন মেলা, পৈতৃক বাড়িতে সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স করার দাবি 

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩২ পিএম

একসময় এই বাড়িতেই বসত সংগীতের আসর। সুরের মূর্ছনায় মেতে উঠতেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ শচীন দেববর্মণ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামসহ তৎকালীন সময়ের খ্যাতিমান শিল্পীরা। সেই বাড়ি আজ ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। অথচ বাড়িটির বড় একটি অংশ এখনো সরকারি হাঁস-মুরগির খামারের দখলে। শিল্পীর স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি পুরোপুরি দখলমুক্ত করে সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীরা।

শচীন দেববর্মণের ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে কুমিল্লার চর্থায় তাঁর পৈতৃক বাড়িতে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী ‘শচীন মেলা-২০২৬’। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেলে কুমিল্লা জেলা প্রশাসন ও জেলা শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে মেলার উদ্বোধন করা হয়। মেলাকে ঘিরে সংগীত ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে উৎসবের আমেজ। তবে উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি বাড়িটির যথাযথ সংরক্ষণ না হওয়ায় আক্ষেপ রয়েছে সংস্কৃতিকর্মীদের।

‘টাকডুম টাকডুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল’, ‘তুমি এসেছিলে পরশু, কাল কেন আসোনি’, ‘শোনো গো দখিন হাওয়া প্রেম করেছি আমি’, ‘তোরা কে যাস রে ভাটি গাঙ বাইয়া’—এমন অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন শচীন দেববর্মণ। তাঁর সুর ও কণ্ঠের গান আজও কোটি বাঙালির হৃদয়ে জায়গা করে আছে। বাংলা গানের পাশাপাশি হিন্দি সংগীতেও তিনি অবিস্মরণীয় এক নাম।

স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের ভাষ্য, শচীন দেববর্মণের পৈতৃক বাড়ি কেবল একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়, এটি উপমহাদেশের সংগীত ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলা সংগীতের সমৃদ্ধ ইতিহাস। অথচ বছরের পর বছর ধরে বাড়িটির বড় একটি অংশ খামারের দখলে থাকায় শিল্পীর স্মৃতিচিহ্ন যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না। বিশেষ দিবসের আয়োজন শেষ হলে বাড়িটি অনেকটা নীরব ও অরক্ষিত হয়ে পড়ে।

জানা যায়, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর শচীন দেববর্মণের পৈতৃক বাড়ির একটি বড় অংশে সরকারি হাঁস-মুরগির খামার স্থাপন করে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে খামারের দখলে থাকে বাড়িটির উল্লেখযোগ্য অংশ। একপর্যায়ে বাড়িটি সংরক্ষণ ও দখলমুক্ত করার দাবিতে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন আন্দোলন শুরু করে। তাদের তৎপরতায় ২০১৩ সালে বাড়িটির একাংশ আংশিকভাবে দখলমুক্ত করা হয়। ২০১৪ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসন বাড়িটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। তবে কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও পুরো বাড়ি এখনো সংরক্ষণের আওতায় আসেনি।

প্রতিবছর শচীন দেববর্মণের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে বাড়িটিতে নানা আয়োজন করা হয়। কুমিল্লা ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগীতপ্রেমীরা এসব অনুষ্ঠানে অংশ নেন। তবে সংস্কৃতিকর্মীদের প্রশ্ন, যে বাড়ি একসময় সংগীতের মিলনকেন্দ্র ছিল, সেটি কেন সারা বছর সংগীত ও সংস্কৃতিচর্চার প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠবে না?

‘ঐতিহ্য কুমিল্লা’র সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল বলেন, শচীন দেববর্মণ শুধু কুমিল্লার নন, তিনি উপমহাদেশের সংগীতাঙ্গনের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাঁর স্মৃতিবিজড়িত পৈতৃক বাড়িটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা জরুরি। বাড়িটির যে অংশ এখনো খামারের দখলে রয়েছে, তা দখলমুক্ত করে পুরো জায়গায় একটি সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে নতুন প্রজন্ম শচীন দেববর্মণ সম্পর্কে জানতে পারবে। পাশাপাশি সংগীত ও সংস্কৃতিচর্চার একটি স্থায়ী পরিবেশ তৈরি হবে।

কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আলী রাজিব মাহমুদ মিঠুন বলেন, শিল্পীর পৈতৃক বাড়িটি সংরক্ষণ এবং সেখানে সারা বছর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালু রাখার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

এর আগে গত ১০ জুলাই শচীন দেববর্মণের পৈতৃক বাড়িটি পরিদর্শন করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী। এ সময় তিনি বাড়িটি ঘিরে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা জানান।

১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর কুমিল্লা শহরের চর্থায় পৈতৃক বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন শচীন দেববর্মণ। ত্রিপুরার রাজপরিবারের সন্তান এই শিল্পী বাংলা ও হিন্দি সংগীতজগতে অসামান্য অবদান রাখেন। সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে পুরো উপমহাদেশে। ১৯৭৫ সালের ৩১ অক্টোবর ভারতের মুম্বাইয়ে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি।

শিল্পীর মৃত্যুবার্ষিকী ঘিরে আয়োজিত দুই দিনের শচীন মেলা তাঁর জীবন, কর্ম ও সংগীতঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার একটি প্রয়াস। তবে স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের প্রত্যাশা, মেলার আয়োজন শুধু দুই দিনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। শচীন দেববর্মণের স্মৃতিবিজড়িত পৈতৃক বাড়িটি দখলমুক্ত করে সেখানে গড়ে তোলা হবে পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স, যেখানে বছরজুড়েই চর্চা হবে সংগীত, সাহিত্য ও সংস্কৃতির।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত