ক্যান্সার চিকিৎসায় মানসিক সহায়তার গুরুত্ব তুলে ধরল সিসিসিএফ

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৪ পিএম

ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তি, রোগ থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা ব্যক্তি এবং তাঁদের পরিচর্যাকারীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্ব তুলে ধরতে সেমিনারের আয়োজন করেছে সেন্টার ফর ক্যান্সার কেয়ার ফাউন্ডেশন (সিসিসিএফ)। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেল ৪টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর. সি. মজুমদার মিলনায়তনে ‘Psychological Support for Cancer Patients, Survivors and Caregivers’ শীর্ষক এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। শুরুতে প্রয়াত ক্যান্সার লড়াকুদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন সিসিসিএফের প্রেসিডেন্ট রোকশানা আফরোজ। অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান ড. সানজিদা আখতার, আহ্ছানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতালের প্যালিয়েটিভ কেয়ার ইউনিটের বিশেষজ্ঞ ডা. নাদিয়া ফারহীন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের প্রভাষক লিজা আক্তার।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রোকশানা আফরোজ। আলোচনায় অংশ নেন সিসিসিএফের নির্বাহী কমিটির সদস্য জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক ডা. আবু জামিল ফয়সাল, মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতা বিষয়ক কোচ এবং জনস্বাস্থ্য পেশাজীবী ডা. ইতুকি চাকমা এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সেলিং অ্যান্ড ওয়েলনেস সেন্টারের জ্যেষ্ঠ কাউন্সেলর ও সমন্বয়ক শামী সুরিদ।

মূল প্রবন্ধে রোকশানা আফরোজ বলেন, ক্যান্সার চিকিৎসাকে শুধু শারীরিক চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। রোগীর মানসিক ও মনোসামাজিক চাহিদাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। ক্যান্সার শনাক্ত হওয়ার পর রোগী ও পরিবারের সদস্যরা ভয়, উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা, আর্থিক চাপ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার মুখোমুখি হতে পারেন। তাই চিকিৎসার প্রতিটি পর্যায়ে তাঁদের মানসিক অবস্থার প্রতি সংবেদনশীল থাকা, প্রয়োজনীয় কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা এবং পরিচর্যাকারীদের সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি ক্যান্সার চিকিৎসার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি এ ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

সিসিসিএফের নির্বাহী কমিটির সদস্য ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ক্যান্সার রোগীর চিকিৎসা পরিকল্পনায় শারীরিক অবস্থার পাশাপাশি মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও পারিবারিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। রোগী ও পরিচর্যাকারীরা যেন প্রয়োজনের সময় নির্ভরযোগ্য তথ্য ও উপযুক্ত সহায়তা পান, সে জন্য স্বাস্থ্যসেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং সহায়তামূলক সংগঠনগুলোর মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ থাকা প্রয়োজন।

ডা. ইতুকি চাকমা মানসিক সুস্থতা বজায় রাখা, চাপ মোকাবিলা এবং সহায়ক পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, রোগী ও পরিচর্যাকারীদের মানসিক অবস্থার পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী পেশাদার সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনে সহায়তা চাওয়াকে স্বাভাবিক করে তোলার বিষয়েও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সেলিং অ্যান্ড ওয়েলনেস সেন্টারের জ্যেষ্ঠ কাউন্সেলর ও সমন্বয়ক শামী সুরিদ তার বক্তব্যে কাউন্সেলিংয়ের ভূমিকা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মানসিক সংকটে থাকা ব্যক্তির কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, বিচারহীনভাবে তার অনুভূতিকে গ্রহণ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পেশাদার সহায়তার ব্যবস্থা করা গুরুত্বপূর্ণ। ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিচর্যাকারীদের জন্য সহজলভ্য, গোপনীয়তা-সম্মত ও ধারাবাহিক কাউন্সেলিং সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

আহ্ছানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতালের প্যালিয়েটিভ কেয়ার ইউনিটের বিশেষজ্ঞ ডা. নাদিয়া ফারহীন বলেন, ক্যান্সার রোগীর কষ্ট শুধু শারীরিক নয়; এর সঙ্গে মানসিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক বিষয়ও জড়িত। তাই রোগীর সামগ্রিক সুস্থতার জন্য সমন্বিত চিকিৎসা, মনোসামাজিক সহায়তা, সহমর্মিতাপূর্ণ যোগাযোগ এবং পরিবার ও সমাজের সমর্থন প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিচর্যাকারীদের মানসিক ও আর্থিক সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক রোগীদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সংবেদনশীল ভাষা ও সহমর্মিতাপূর্ণ আচরণের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, ক্যান্সার শনাক্ত হওয়ার খবর রোগীকে কীভাবে জানানো হবে এবং তাঁর সঙ্গে কী ধরনের ভাষায় কথা বলা হবে, তা রোগীর মানসিক অবস্থা ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নির্ধারণ করা উচিত।

তিনি আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যরা রোগীর কাছ থেকে ক্যান্সারের তথ্য গোপন রাখতে চান। এটি চিকিৎসকদের জন্য একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি করে। ক্যান্সার ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক, সামাজিক ও নীতিগত বিষয়গুলোও সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। রোগীকে সম্মানজনকভাবে তথ্য দেওয়া, মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসাব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে সমন্বয় বাড়ানোর ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ও সেন্টার ফর জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের পরিচালক ড. সানজিদা হক নিজের ক্যান্সার সারভাইভার সন্তানের মা হিসেবে অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তির পাশাপাশি তাঁর পরিচর্যাকারীদের মানসিক সহায়তাও অত্যন্ত জরুরি।

অস্ট্রেলিয়ায় মেয়ের চিকিৎসাকালীন অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি পারিবারিক সমর্থন, অন্য অভিভাবকদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময়, মিউজিক থেরাপি এবং পরিচর্যাকারীদের বিশ্রামের সুযোগের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তার মতে, চিকিৎসাপ্রক্রিয়া সহজ করা, রোগী ও পরিচর্যাকারীদের প্রয়োজন বোঝা এবং তাঁদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা আরও কার্যকর করা সম্ভব।

এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের প্রভাষক লিজা আক্তার সেমিনারে বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিসিসিএফের নির্বাহী সদস্য মো. তরিকুল ইসলাম লিটন ও হৃদিয়া আফরোজ রাকা। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সংগঠনটির আজীবন সদস্য ডা. এস. এম. শহীদুল্লাহ।

সেমিনারে ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তি, রোগ থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা ব্যক্তি এবং তাদের পরিচর্যাকারীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা, চিকিৎসার সঙ্গে মনোসামাজিক সহায়তার সমন্বয় এবং পরিবার ও সমাজের সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

সিসিসিএফের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াইয়ে চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক শক্তি, সহমর্মিতা ও সামাজিক সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্য নিয়ে সংগঠনটি ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তি, রোগ থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারের পাশে থেকে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান, সচেতনতা বৃদ্ধি ও বিভিন্ন সহায়তামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

উল্লেখ্য, সেন্টার ফর ক্যান্সার কেয়ার ফাউন্ডেশন (সিসিসিএফ) একটি স্বেচ্ছাসেবী ও অলাভজনক সামাজিক সংগঠন। ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তি, রোগ থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা ব্যক্তি এবং তাঁদের পরিবারের সহায়তায় বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে সংগঠনটি। এটি সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে নিবন্ধিত।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত