পাঁচ মাসেও উন্মোচন হয়নি রূপকের মৃত্যুরহস্য

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪১ পিএম

সিলেটের বিয়ানীবাজারে যুবক সাদিকুল ইসলাম রূপকের রহস্যজনক মৃত্যুর পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও ঘটনার কোনো কিনারা হয়নি। এখনো উন্মোচিত হয়নি তার মৃত্যুর পেছনের রহস্য। স্বজনদের অপেক্ষা আর আহাজারির মধ্যেই তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। তবে মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) জানিয়েছে, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

গত ৩১ মে নিজ বাড়ি থেকে রূপকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তখন তার দুই হাত পেছনে বাঁধা ছিল। ঘটনাটি ঘিরে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। পুলিশের দুটি সংস্থার তদন্তেও এখন পর্যন্ত স্পষ্ট হয়নি, এটি আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। দীর্ঘ সময় পার হলেও তদন্তের দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় অসন্তোষ প্রকাশ করছেন স্বজন ও স্থানীয়রা।

রূপকের মৃত্যুর পর থেকে বাবার সান্নিধ্য হারিয়ে দুই শিশু সন্তান ওয়াসিয়া ইসলাম (৫) ও ওয়াজিয়া ইসলাম (১) প্রতিনিয়ত কাঁদছে। স্বামীকে হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন তার স্ত্রী। অন্যদিকে, এখনো তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হাতে পৌঁছায়নি রূপকের ময়নাতদন্ত ও ভিসেরা প্রতিবেদন।

বিয়ানীবাজারের খাসাড়ীপাড়া গ্রামের আবদুল মুক্তাদিরের ছেলে রূপকের অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হন। ঝুলন্ত মরদেহের অবস্থা দেখে অনেকেই এটিকে হত্যাকাণ্ড বলে সন্দেহ প্রকাশ করেন। বিষয়টি পুলিশ প্রশাসনের কানেও পৌঁছেছে বলে জানা গেছে। তবে ফরেনসিক প্রতিবেদন ছাড়া এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে রূপকের যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বড় ভাই জহুরুল ইসলাম ইপক বলেন, ‘আমি ‘নিজ-পর’ বুঝি না। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আমার ভাইয়ের মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটন দেখতে চাই।’

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ঈদুল আজহার একদিন পর রূপকের মা, বোন, স্ত্রী ও দুই সন্তান বিয়ানীবাজার পৌর এলাকার খাসাড়িপাড়ার বাসা থেকে তার নানাবাড়ি কোনাগ্রামে বেড়াতে যান। রূপক তাদের সঙ্গে না গেলেও রাতে সেখানে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরিবারের সদস্যরা একাধিকবার ফোন করলেও বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে তিনি নানাবাড়ি যাননি। পরদিন ৩১ মে বিকেলে পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে ফিরে তার কোনো সাড়াশব্দ পাননি। পরে ঘরের ড্রয়িংরুমে গিয়ে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে তার ঝুলন্ত মরদেহ দেখতে পান।

রূপকের মৃত্যুর পর থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। দুই হাত পেছনে বাঁধা অবস্থায় কীভাবে তার মরদেহ ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছিল, ঘটনার আগে ও পরে কারা তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, মোবাইল ফোনের কললিস্ট ও ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণে কী পাওয়া গেছে—এসব বিষয় এখনো পরিষ্কার নয়। এ ছাড়া ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা চিরকুটে থাকা আর্থিক হিসাবের সঙ্গে মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

খবর পেয়ে বিয়ানীবাজার থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য সেটি সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। ঘটনাস্থল থেকে একটি চিরকুট ও রূপকের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, চিরকুটে কয়েকজনের কাছে টাকা দেনা-পাওনার হিসাব লেখা ছিল।

এদিকে, মৃত্যুরহস্য উদ্ঘাটনের দাবিতে স্থানীয় বাসিন্দারা বিক্ষোভ ও থানা ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেন। পরে রূপকের মা রাবিয়া বেগম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে বিয়ানীবাজার থানায় হত্যা মামলা করেন।

প্রথমে পুলিশ বিভিন্ন দিক বিবেচনায় নিয়ে মামলাটির তদন্ত শুরু করলেও রহস্যের জট খুলতে পারেনি। পরে মামলাটি পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। গত ২ আগস্ট সিলেট পিবিআই তদন্তের দায়িত্ব নেয়। তবে পাঁচ মাস পার হলেও মামলার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রূপকের পরিচিতজন ও আড্ডাসঙ্গীদের সম্পৃক্ততার সম্ভাবনাসহ কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে সন্দেহভাজন হিসেবে চূড়ান্তভাবে শনাক্ত করা যায়নি।

মামলার বাদী রাবিয়া বেগম বলেন, ‘আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। আমি তার হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।’

সিলেট পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক (এসআই) ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আবদুল আহাদ শুক্রবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। এখনো উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। ভিসেরা ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে রূপকের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত