এইচএসসিতে গৃহবধূ শেফালীর সাফল্য

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫২ পিএম

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকার গৃহবধূ শেফালী বেগম (৫২)। গৃহবধূর ছেলে আব্দুর রাজ শাফি বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার কিয়াংসাং বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে লেখাপড়া করছেন। মেয়ে মাকছুরা খানম নাসমুন রংপুর সরকারি কলেজে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত। বড় ছেলে আব্দুল রাজ্জাক ডিমলায় ব্যবসা করেন।

এই তিন ভাইবোনের মা শেফালী বেগম ৫২ বছর বয়সে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২০২৬ সালের এইচএসসি (বিজনেস ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সফলতা দেখিয়েছেন। তার মূল জিপিএ ৩.৯৬ এবং ঐচ্ছিক বিষয়সহ জিপিএ দাঁড়িয়েছে ৪.২১। রোল নম্বর ৬৩৯০৪৬, সেশন ২০২৩-২৪।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হলে এ তথ্য জানা যায়। শেফালী বেগম তার গ্রামের অদুরে ডোমার উপজেলার গোমনাতি টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। শিক্ষাজীবনের দীর্ঘ বিরতি পেরিয়ে শেফালীর এই অর্জন সমাজের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। বিশেষ করে সংসারের দায়িত্ব, আর্থিক সংকট কিংবা পারিবারিক নানা কারণে যেসব নারী মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন, তাঁদের জন্য তার সাফল্য হতে পারে নতুন করে পথচলার সাহস। ৪৮ বছর বয়সে আবার পড়াশোনা শুরু করে ৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পাসের মাধ্যমে শেফালী বেগম যেন সমাজকে একটি বার্তাই দিয়েছেন- স্বপ্ন পূরণের কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই, শিক্ষারও কোনো বয়স নেই। বয়স শুধুমাত্র একটি সংখ্যা। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম ও পরিবারের সহযোগিতা থাকলে জীবনের যেকোনো পর্যায় থেকেই নতুন করে শুরু করা সম্ভব।

শেফালীর স্বামী মকছেদুল আলম মজনু একজন কৃষক। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, শেফালী পরিবারের জন্য নিজের অনেক স্বপ্ন ত্যাগ করেছে। দীর্ঘদিন পর নিজের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছে, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ। তার এই সাফল্যে আমরা সবাই গর্বিত। ভবিষ্যতেও তার পড়াশোনার পথে পাশে থাকব।

শেফালীর বেগম তার বড় ছেলে আব্দুল রাজ্জাকের বিয়ে দিয়ে ঘরে পুত্রবধূ এনেছেন। তিনি আবার দাদীও হয়েছেন। শেফালী বেগমের নাতনি ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী শারাফি রাজ দেশ রূপান্তরকে বলে, আমার দাদি আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। ৫২ বছর বয়সে দাদি এইচএসসি পাস করেছেন, এতে আমি ভীষণ খুশি ও গর্বিত। দাদির এই সাফল্য দেখে আমিও পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হতে চাই। বড় হয়ে আমি চিকিৎসক হতে চাই। দাদি আমাকে শিখিয়েছেন, মন দিয়ে চেষ্টা করলে কোনো স্বপ্নই অসম্ভব নয়।

শেফালীর শিক্ষাজীবনের শুরুটা ছিল মেধা ও সম্ভাবনায় ভরা। ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর পারিবারিক নানা সংকটে তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষাগুলোতে মেধাতালিকায় থাকা সত্ত্বেও পরিস্থিতির কারণে একসময় বই-খাতা ছেড়ে সংসারের বাস্তবতায় প্রবেশ করতে হয় তাকে। পরবর্তী সময়ে স্বামী-সন্তান ও পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে নিজের শিক্ষার স্বপ্ন দীর্ঘদিন চাপা পড়ে থাকে। তবে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কখনো হারিয়ে যায়নি। শেফালীর এই সাফল্য কেবল একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ঘটনা নয়, এটি দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, আত্মবিশ্বাস, অধ্যবসায় ও প্রতিকূলতা জয় করার এক অনন্য গল্প। বয়স কিংবা সংসারের দায়িত্ব যে শিক্ষার পথে বাধা হতে পারে না, তা নিজের অর্জনের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছেন তিনি। তার এই সাফল্য বিশেষ করে শিক্ষার সুযোগ থেকে ঝরে পড়া নারী ও অন্যদের জন্য নতুন করে স্বপ্ন দেখার অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।

নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে শেফালী বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়ে সংসারের কারণে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলের পরীক্ষাগুলোতে বরাবরই মেধাতালিকায় ছিলাম। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারিনি। পরে স্বামী ও সন্তানদের উৎসাহে আবার পড়াশোনা শুরু করি। আজ ৪.২১ জিপিএ নিয়ে এইচএসসি পাস করতে পেরে মনে হচ্ছে, জীবনের একটি বড় স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।

গোমনাতি টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের অধ্যক্ষ দিলীপ রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে এমন সংগ্রামী শিক্ষার্থী খুব কমই দেখেছি। শেফালী বেগম প্রমাণ করেছেন, শিক্ষা বয়সের কাছে নয়, ইচ্ছাশক্তির কাছেই হার মানে। তাঁর সাফল্য অন্যদেরও নতুন করে স্বপ্ন দেখতে অনুপ্রাণিত করবে। 

 

 

 

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত