মহাজনের ঋণ, জলদস্যুর আতঙ্ক

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৬ এএম

মাথায় মহাজনের ঋণের বোঝা, সামনে উত্তাল সাগর, আর তার ওপর জলদস্যুদের হানা এমন নানামুখী সংকটের মধ্যেই শুরু হয়েছে সুন্দরবনের দুবলার চরের শুঁটকি মৌসুম। গত মৌসুমে আশানুরূপ মাছ না পাওয়ায় এমনিতেই পিঠ ঠেকেছে দেয়ালে, তার ওপর নতুন মৌসুমের অনিশ্চয়তা নিয়ে সুন্দরবনের শুঁটকিপল্লীর উদ্দেশে রওনা হয়েছেন খুলনার কয়রাসহ দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের জেলেরা।

কয়রা উপজেলার গোবরা গ্রামের জেলে মহসিন সানা তাদেরই একজন। মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে দাদন নিয়ে নৌকা, জাল, খাবার ও রসদ প্রস্তুত করেছেন তিনি। এবারও বুকভরা আশা আর মনভরা সংশয় নিয়ে যাচ্ছেন দুবলার চরে। সেখানে সাগর থেকে মাছ ধরে কড়া রোদে শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করবেন তিনি। কিন্তু তার মনে একবিন্দু স্বস্তি নেই। একদিকে জলদস্যুদের উৎপাত, অন্যদিকে সাগরে মাছের আকালের শঙ্কা সব মিলিয়ে এক গভীর দুশ্চিন্তা ভর করেছে তার চোখেমুখে।

দীর্ঘ ৩০ বছরের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে মহসিন সানা বলেন, ‘তিন দশক ধরে সুন্দরবনের দুবলার চরে মাছ ধরে সংসার চালাচ্ছি। এবারও দাদন নিয়ে সাগরে নামছি। কিন্তু ইদানীং সুন্দরবনে দস্যুদের আনাগোনা বেড়েছে। মাছ ধরতে গেলে তাদের চাঁদা দিতে হবে কি না, কখন কী বিপদে পড়তে হয়, সেই আতঙ্ক তাড়া করে বেড়াচ্ছে। গতবারও মাছ ভালো মেলেনি। এবার কপালে কী আছে, তা আল্লাহই জানেন।’

মহসিন সানার মতো কয়রা সদর, মহেশ্বরীপুর, বাগালী, আমাদী, দক্ষিণ বেদকাশী ও উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের প্রায় দুই শতাধিক জেলে এবার সুন্দরবনের দুবলার চরসহ বিভিন্ন শুঁটকিপল্লীতে যাত্রা করেছেন। তাদের জীবন ধারণের একমাত্র সম্বল এই পাঁচ মাসের শুঁটকি মৌসুম। এই সময়ের আয়ের ওপরই নির্ভর করে তাদের পুরো বছরের সংসার ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ।

কিন্তু জেলেদের চোখে এখন শুধুই জলছাপ। তাদের উদ্বেগের তালিকাটা বেশ দীর্ঘ। সাগরে মাছের অভাব, সীমানা পেরিয়ে ভারতীয় জেলেদের অনুপ্রবেশ, বনদস্যুদের বেপরোয়া চাঁদাবাজি এবং আকস্মিক

প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি সব মিলিয়ে উপকূলের এই মানুষগুলোর কপালে চিন্তার ভাঁজ।

সুন্দরবনের দুবলার চরসহ বিভিন্ন চরে শুরু হচ্ছে শুঁটকি মৌসুমের কার্যক্রম। আগামী পাঁচ মাস সেখানে অস্থায়ী ঘর ও মাছ শুকানোর মাচা তৈরি করে চলবে মাছ আহরণ ও শুঁটকি উৎপাদন। এরই মধ্যে মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে খাদ্য, জ্বালানি, মাছ ধরার জাল ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে নৌকা প্রস্তুত করেছেন জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীরা।

মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা জেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪১ হাজার ৬৪৫। তাদের মধ্যে পাইকগাছা, কয়রা, দাকোপ, রূপসা ও ডুমুরিয়া উপজেলার প্রায় সাড়ে ৩১ হাজার জেলে গভীর সমুদ্রে মাছ শিকার করেন। বেসরকারি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় প্রায় তিন লাখ জেলে বসবাস করেন। কয়রা  উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশীর জেলে আল আমিন জানান, তিনি ১৯ জন জেলেকে নিয়ে তিনটি নৌকার বহরে সাগরে যাচ্ছেন। তাদের কেউ কেউ ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন। কিন্তু সাগরে ভারতীয় জেলেদের আধিক্য ও বনদস্যুদের দৌরাত্ম্যে তারা উদ্বিগ্ন।

শুঁটকি মৌসুমকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন বনদস্যু বাহিনী সংগঠিত হওয়ার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। গত মৌসুমে ব্যবসায়ীদের লাখ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। ফলে ঋণ নিয়ে সাগরে যাওয়া জেলেদের কাছে মাছের পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়টিও বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে।

এদিকে বনদস্যুদের হাত থেকে জেলেদের রক্ষায় বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে বন বিভাগ। জেলেদের নৌকাগুলো পাশাপাশি রাখা, গভীর সমুদ্রে কিংবা বনের গহিনে একা না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। রাতে ১৫ থেকে ২০টি নৌকা একসঙ্গে অবস্থান করার নির্দেশনাও রয়েছে। সুন্দরবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বনরক্ষী মোতায়েন থাকবে।

খুলনার বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, সাগরে যাওয়া জেলেদের নিরাপত্তার বিষয়ে বেশ কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। গভীর সমুদ্রে একা যেতে নিষেধ করা হয়েছে। পাশাপাশি সুন্দরবনের বিভিন্ন পয়েন্টে বনরক্ষী মোতায়েন থাকবে। তিনি আরও বলেন, জেলেদের ঘর, ডিপো ও মাছ শুকানোর মাচা তৈরিতে সুন্দরবনের কোনো বনজ সম্পদ ব্যবহার করা যাবে না। প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী নিজ নিজ এলাকা থেকে নিয়ে যেতে হবে। ৩০ অক্টোবর থেকে শুঁটকিপল্লীতে ঘর তৈরির কাজ শুরুর কথা রয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত