শাহ আমানত বিমানবন্দরে বেতন বঞ্চিত ৩৭৫ কর্মী

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০২:৩৩ পিএম

চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৩৭৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন না পাওয়ার ঘটনায় বিক্ষোভ করেছেন বিক্ষুব্ধ কর্মীরা। প্রশাসনিক কর্মকর্তা কায়সার এম মোহায়মেনের দায়িত্বে অবহেলা ও গাফিলতির কারণে বেতন আটকে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তার বিরুদ্ধে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, বদলি ও পদোন্নতির ফাইল আটকে রাখা, ইজারাদারদের হুমকি দেওয়াসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কায়সার এম মোহায়মেন।

সোমবার (২ নভেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বেতন না পেয়ে বিমানবন্দরের ৩৭৫ জন বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রশাসনিক কর্মকর্তার দপ্তরে গিয়ে প্রতিবাদ জানান। এ সময় তারা কায়সার এম মোহায়মেনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় হয়রানির অভিযোগ তুলে তার উপযুক্ত বিচার দাবি করেন। বিমানবন্দরের ইতিহাসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এ ধরনের বিক্ষোভকে নজিরবিহীন ঘটনা বলে অভিমত দিয়েছেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা।

বিমানবন্দর সূত্র জানায়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পে-ফিক্সেশনসংক্রান্ত নথি ও ৩১৯টি সার্ভিস বুক যথাসময়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদর দপ্তরে না পৌঁছানোয় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বেতন না পাওয়া কর্মীদের মধ্যে ৪০ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। কবে নাগাদ তাঁরা বেতন পাবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রশাসন শাখার প্রধান হিসেবে কায়সার এম মোহায়মেনের গাফিলতির কারণে সরকার ঘোষিত নতুন নবম পে-স্কেলের আওতায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণের ফাইল যথাসময় ঢাকায় পাঠানো সম্ভব হয়নি। দেশের অন্যান্য বিমানবন্দরে এ-সংক্রান্ত কার্যক্রম সম্পন্ন হলেও চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নথি নির্ধারিত সময়ে পৌঁছায়নি।

বিমানবন্দর সূত্রের দাবি, গত ১৮ অক্টোবর হিসাব শাখা থেকে পে-ফিক্সেশনসংক্রান্ত নথি ও ৩১৯টি সার্ভিস বুক প্রশাসন শাখায় হস্তান্তর করা হয়। তবে যথাসময় সেগুলো সদর দপ্তরে পাঠানো হয়নি। এতে ১ নভেম্বর দেশের অন্যান্য বিমানবন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেতন পেলেও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের কর্মীরা বেতন থেকে বঞ্চিত হন। বেতন না পাওয়ায় অনেকে সন্তানদের স্কুলের বেতন, জরুরি চিকিৎসা ও সংসারের খরচ সামলাতে সমস্যায় পড়েছেন বলে জানা গেছে।

এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ নুর হোসেনের কাছে গিয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে দ্রুত বেতন পাওয়ার নিশ্চয়তা চান তারা।

অভিযোগের বিষয়ে কায়সার এম মোহায়মেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, হিসাব শাখা থেকে নথি পাওয়ার পর গত ১৯ অক্টোবর সদর দপ্তরে সার্ভিস বুক পাঠানো হয়েছিল। তবে মাঝখানে সাত দিন সরকারি ছুটি থাকায় সেগুলো তাদের কাছে পৌঁছায়নি। এ বিষয়ে গত ২৭ অক্টোবর সদর দপ্তরে আবার তাগাদা দেওয়া হয়েছে।

অন্যান্য অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, বিমানবন্দরের একটি মহল উদ্দেশ্যমূলকভাবে তার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করছে। তিনি নিয়মের মধ্যে থেকেই দায়িত্ব পালন করছেন।

চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ নুর হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেতন না পাওয়া কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী তার দপ্তরে এসেছিলেন। কিছু জটিলতার কারণে তারা সময়মতো বেতন পাননি। তার নিজের বেতনও হয়নি বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, তার কাছে আসা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আশ্বস্ত করা হয়েছে, তিন-চার দিনের মধ্যে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

কায়সার এম মোহায়মেনের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহার, বদলি ও পদোন্নতির ফাইল আটকে রাখা, ইজারাদারদের ইজারা বাতিলের হুমকি, বিজয়নগরের পুনর্বাসন প্রকল্পে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় এবং টাকার বিনিময়ে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বাসা বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।

এসব অভিযোগের বিষয়ে পরিচালক বলেন, কায়সার এম মোহায়মেনের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ কেউ তার কাছে করেননি। তবে তিনি কিছুটা মেজাজি বলে মন্তব্য করেন পরিচালক। প্রশাসনিক কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনে কখনো কঠোর হতে হয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, কায়সার এম মোহায়মেন ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বেবিচকে সিনিয়র অফিসার হিসেবে যোগ দেন। একই বছরের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে তাকে শাহ আমানত বিমানবন্দরে পদায়ন করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ১১ আগস্ট এক অফিস আদেশে তাকে সিলেট বিমানবন্দরে বদলি করা হয়েছিল। তবে সদর দপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে সেই বদলির আদেশ বাতিল করিয়ে তিনি চট্টগ্রাম বিমানবন্দরেই থেকে যান বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

এছাড়া প্রশাসন শাখার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মোটর ট্রান্সপোর্ট শাখার অতিরিক্ত দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন ঠিকাদারকে গাড়ির কাজ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ না দেওয়া ও ভবিষ্যতে কালোতালিকাভুক্ত করার হুমকি দেওয়া হয়।

সম্পত্তি শাখার আওতায় বাসা বরাদ্দের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। টাকার বিনিময়ে কর্মচারীদের জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বাসা বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী যথাসময়ে বেতন না পাওয়ার ঘটনাটি সরকারের বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র বা নাশকতার অংশ কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত