তরুণদের জন্য ‘ইমপ্যাক্টফুল সোশ্যাল রিলেশনশিপ’ ধারণা

সম্পর্কও এক ধরনের বিনিয়োগ

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:২১ পিএম

একজন তরুণের হাতে প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা। ঘুম, পড়াশোনা আর প্রয়োজনীয় কাজ বাদ দিলে যে সময়টুকু থাকে, তার বড় অংশ যায় মানুষের সঙ্গে—সরাসরি আড্ডায়, ফোনালাপে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অন্তহীন স্ক্রলে। প্রশ্ন হলো, এই সময় কোথায় যাচ্ছে, আর বিনিময়ে তরুণেরা কী পাচ্ছেন?

ব্যাংকিং পেশায় দুই দশকের বেশি সময় কাটিয়ে একটি কথা বারবার মনে হয়েছে। আমরা টাকা বিনিয়োগের আগে লাভ-ক্ষতির হিসাব করি, ঝুঁকি যাচাই করি। অথচ জীবনের সবচেয়ে দামি দুটি সম্পদ—সময় ও মনোযোগ—কার পেছনে বিনিয়োগ করছি, তার হিসাব প্রায় কেউই রাখি না। টাকা হারালে আবার আয় করা যায়, কিন্তু হারানো সময় আর ফেরে না।

একটি কাল্পনিক কিন্তু খুব চেনা দৃশ্য ভাবুন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই বন্ধু—রাকিব ও তানিয়া। রাকিবের সন্ধ্যা কাটে চায়ের দোকানের দীর্ঘ আড্ডা আর মোবাইলের পর্দায়। তানিয়াও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটান, তবে তাঁর বন্ধুদের ছোট একটি দল সপ্তাহে দুই দিন বসে নতুন কিছু শেখে, বিভাগের একজন শিক্ষক তাঁকে গবেষণার কাজে যুক্ত করেছেন, আর একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে তিনি নিয়মিত কাজ করেন। স্নাতক শেষে দুজনের সনদ একই, কিন্তু অভিজ্ঞতার ঝুলি, আত্মবিশ্বাস আর পরিচিতির পরিধি সম্পূর্ণ আলাদা। পার্থক্যটা মেধার নয়, সম্পর্কের।

এই ভাবনা থেকেই তরুণদের জন্য একটি ধারণা প্রস্তাব করছি, যার নাম দিয়েছি ‘ইমপ্যাক্টফুল সোশ্যাল রিলেশনশিপ’, সংক্ষেপে ‘আইএসআর’—অর্থাৎ প্রভাবশালী সামাজিক সম্পর্ক।

কেন এখনই এই আলোচনা
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৮ দশমিক ০৭ শতাংশ, যা জাতীয় গড় ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশের দ্বিগুণের বেশি। দেশের মোট ২৬ লাখ ২৪ হাজার বেকারের মধ্যে প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজারই স্নাতক ডিগ্রিধারী; শিক্ষাস্তরভিত্তিক হিসাবে তাঁদের বেকারত্বের হারই সর্বোচ্চ, ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ। আরও উদ্বেগের বিষয়, এই বয়সী তরুণদের ২০ দশমিক ৩ শতাংশ—সংখ্যায় প্রায় ৮৫ লাখ ৬০ হাজার—পড়াশোনা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণ, কোনোটিতেই যুক্ত নন। অর্থনীতির ভাষায় তাঁদের বলা হয় ‘নিট’ (NEET: Not in Education, Employment or Training)।

এই সংকটের কারণ বহুমাত্রিক—চাকরির বাজারের সীমাবদ্ধতা, শিক্ষা ও দক্ষতার অমিল, নারীর জন্য সামাজিক বাধা। এসব কাঠামোগত সমস্যা সমাধানের দায় মূলত রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের। কিন্তু একটি দিক প্রায় আলোচনার বাইরে থেকে যায়: তরুণের চারপাশের সম্পর্কের পরিবেশ। কার সঙ্গে তিনি সময় কাটান, কে তাঁকে উৎসাহ দেন, কে দক্ষতার পথ দেখান, আর কে নিঃশব্দে তাঁর সময় ও মনোবল কেড়ে নেন—এসব একজন তরুণের ভবিষ্যৎ গঠনে বড় ভূমিকা রাখে। বাজার বদলানো তরুণের একার হাতে নেই, কিন্তু নিজের সম্পর্কের বাগানটি কীভাবে সাজাবেন, সে সিদ্ধান্ত পুরোপুরি তাঁর নিজের।

একই জরিপের আরেকটি তথ্য এই লেখার মূল প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। চাকরিপ্রত্যাশীদের প্রায় ৩৬ শতাংশ চাকরির জন্য আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের কাছে অনুরোধ করেন; প্রতি তিনজনের একজন। আমাদের সমাজে সম্পর্ক এখনো চাকরির সবচেয়ে বড় ভরসা। প্রশ্ন হলো, সেই সম্পর্ক কি তদবিরের, নাকি দক্ষতা ও সক্ষমতার? আইএসআর দ্বিতীয় পথের কথা বলে: সুপারিশ চাওয়ার সম্পর্ক নয়, সামর্থ্য গড়ার সম্পর্ক।

আইএসআর কী
মূল কথাটি সহজ: সম্পর্কের সংখ্যা নয়, সম্পর্কের প্রভাবই আসল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাঁচ হাজার বন্ধু থাকা আর সংকটে পাশে দাঁড়ানো, সঠিক পরামর্শ দেওয়া পাঁচজন মানুষ থাকা—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। আইএসআর হলো সচেতনভাবে এমন সম্পর্ক বেছে নেওয়া ও লালন করা, যা তরুণের সৃজনশীলতাকে জাগিয়ে তোলে, ক্যারিয়ারকে এগিয়ে নেয় এবং দক্ষতা বাড়ায়। এক লাইনে বললে, আইএসআর = শেখা + সৃষ্টি + সহযোগিতা।

যেকোনো সম্পর্কে নিয়মিত সময় দেওয়ার আগে নিজেকে তিনটি প্রশ্ন করা যায়। এই সম্পর্কে আমি কি কিছু শিখছি? এখান থেকে কি নতুন কিছু সৃষ্টি হচ্ছে? আমি কি সামনে এগোচ্ছি? তিনটির উত্তরই যদি দীর্ঘদিন ধরে ‘না’ হয়, তবে সেই সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

এই মাপকাঠিতে তরুণের সম্পর্কগুলোকে মোটা দাগে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। এক. গড়ে তোলা সম্পর্ক—যা শেখায়, সাহস দেয়, সুযোগের দরজা খুলে দেয়। দুই. নিরপেক্ষ সম্পর্ক—যা আনন্দ দেয়, তবে জীবনে বড় কোনো পরিবর্তন আনে না। তিন. ক্ষয়িষ্ণু সম্পর্ক—যা সময়, অর্থ ও মনোবল কেড়ে নেয়, এমনকি মানসিক স্বাস্থ্যেরও ক্ষতি করে। আইএসআরের লক্ষ্য প্রথম ধরনের সম্পর্ক বাড়ানো, দ্বিতীয়টিকে পরিমিত রাখা এবং তৃতীয়টি থেকে ধীরে ধীরে সরে আসা।

তবে একটি ভুল বোঝাবুঝি এড়ানো জরুরি। আইএসআর মানে মানুষকে ব্যবহার করা বা প্রতিটি বন্ধুত্বকে লাভ-ক্ষতির খাতায় তোলা নয়। আড্ডা, বিনোদন, নিছক আনন্দের সম্পর্কও জীবনের অংশ। সমস্যা তখনই, যখন এগুলোই পুরো সময় খেয়ে ফেলে এবং বিনিময়ে রেখে যায় শুধু ক্লান্তি, তুলনা আর হতাশা।

আইএসআর গড়ার সাতটি স্তম্ভ
প্রথমত, লক্ষ্যভিত্তিক সম্পর্ক বাছাই। যিনি জানেন না কোথায় যেতে চান, তিনি বুঝতেও পারবেন না কোন সম্পর্ক তাঁকে এগিয়ে নিচ্ছে। তাই আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরে নিজেকে কোথায় দেখতে চান, তা লিখে ফেলুন। তারপর ভাবুন, সেই পথে কারা আছেন—কোন শিক্ষক, কোন পেশাজীবী, কোন সংগঠন। সম্পর্কের মানচিত্র আঁকতে হবে লক্ষ্যের মানচিত্র ধরে।

দ্বিতীয়ত, অন্তত একজন মেন্টর। জাপানের কর্মসংস্কৃতিতে ‘সেম্পাই-কোহাই’ বা জ্যেষ্ঠ-কনিষ্ঠের পরামর্শভিত্তিক সম্পর্ক বহুদিনের ঐতিহ্য। আমাদের দেশে তরুণেরা প্রায়ই সংকোচে অভিজ্ঞ মানুষের কাছে যেতে চান না। অথচ শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতামূলক কাজে দেখেছি, একজন তরুণ সঠিক পরামর্শদাতা পেলে তাঁর আত্মবিশ্বাস ও দিকনির্দেশনা চোখে পড়ার মতো বদলে যায়। একজন ভালো মেন্টর অনেক বছরের ভুলের পথ ছোট করে দেন। মেন্টর খুঁজতে বড় কোনো আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন নেই; একটি বিনয়ী ই-মেইল, একটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন কিংবা কোনো সেমিনার শেষে কয়েক মিনিটের আলাপ থেকেই শুরু হতে পারে।

তৃতীয়ত, গ্রোথ সার্কেল গড়া। প্রচলিত একটি কথা আছে—আপনি যাঁদের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সময় কাটান, ধীরে ধীরে তাঁদের মতোই হয়ে ওঠেন। তাই পাঁচ-সাতজন সমমনা বন্ধু বা সহপাঠী নিয়ে একটি ছোট দল গড়ুন, যাঁরা একসঙ্গে অনলাইন কোর্স করবেন, প্রজেক্টে কাজ করবেন, প্রতিযোগিতায় অংশ নেবেন, নতুন উদ্যোগের ভাবনা ভাগাভাগি করবেন। এমন দলে প্রতিযোগিতা হয় স্বাস্থ্যকর, আর সাফল্য হয় সবার। মাসে অন্তত একবার দলের প্রত্যেকে নিজের অগ্রগতি তুলে ধরলে সবাই একধরনের জবাবদিহির মধ্যে থাকেন।

চতুর্থত, সময়ের হিসাব ও সীমারেখা। ব্যাংকে যেমন দিন শেষে হিসাব মেলানো হয়, তেমনি এক সপ্তাহ নিজের সময়ের হিসাব রাখুন—কোন সম্পর্কে কত ঘণ্টা গেল, তারপর মনটা কেমন লাগল। দেখা যাবে, কিছু সম্পর্ক নিয়মিত সময় ও মনোবল খেয়ে ফেলছে: নিরন্তর পরচর্চা, নেতিবাচকতা, অপ্রয়োজনীয় বিবাদ কিংবা এমন সম্পর্ক, যা পড়াশোনা ও ক্যারিয়ারকে বারবার পেছনে টানে। এখানে বিনয়ের সঙ্গে সীমা টানতে শিখতে হবে। প্রয়োজনে ‘না’ বলতে পারাও একটি দক্ষতা।

পঞ্চমত, ডিজিটাল শৃঙ্খলা। স্মার্টফোন তরুণের সবচেয়ে বড় শক্তি, আবার সবচেয়ে বড় ফাঁদও। একই যন্ত্রে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স পাওয়া যায়, আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা উদ্দেশ্যহীন ভিডিওতেও দিন কেটে যায়। পেশাদার প্ল্যাটফর্মে মানসম্পন্ন প্রোফাইল, দক্ষতাভিত্তিক অনলাইন কমিউনিটিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ আর নোটিফিকেশনের ওপর নিয়ন্ত্রণ—এভাবে ডিজিটাল সম্পর্ককেও আইএসআরের অংশ করা যায়। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় শুধু শেখার জন্য বরাদ্দ রাখুন।

ষষ্ঠত, দেওয়ার মানসিকতা। যে সম্পর্ক শুধু নেয়, তা টেকে না। নিজের দক্ষতা দিয়ে অন্যকে সাহায্য করুন—ছোট ভাইবোনকে পড়ানো, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে কাজ করা, দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। এতে আস্থা, নেতৃত্ব ও সুনাম তৈরি হয়। চাকরির সাক্ষাৎকারে স্বেচ্ছাসেবার অভিজ্ঞতা অনেক সময় সনদের চেয়েও বেশি কথা বলে। মনে রাখা দরকার, সম্পর্কের ব্যাংকে জমা না রাখলে প্রয়োজনের দিনে তোলার কিছু থাকে না।

সপ্তমত, পরিবার ও মূল্যবোধের ভিত্তি। ক্যারিয়ারকেন্দ্রিক ভাবনার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো সম্পর্ককে শুধু উপযোগিতার মাপকাঠিতে দেখা। পরিবার এবং শৈশবের প্রকৃত বন্ধুরা—যাঁরা কোনো স্বার্থ ছাড়াই পাশে থাকেন—তাঁরাই মানসিক সুস্থতার ভিত্তি। সততা, শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস ছাড়া কোনো সম্পর্কই দীর্ঘ মেয়াদে প্রভাবশালী হয় না।

কার কী করণীয়
আইএসআর শুধু ব্যক্তির উদ্যোগে সীমাবদ্ধ থাকলে এর প্রভাবও সীমিত থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মেন্টরশিপ কর্মসূচি চালু করতে এবং সাবেক শিক্ষার্থীদের নেটওয়ার্ককে কাজে লাগাতে পারে। করপোরেট প্রতিষ্ঠান শিল্প-শিক্ষা অংশীদারত্বের মাধ্যমে তরুণদের সঙ্গে অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের যুক্ত করতে পারে। অভিভাবকেরা সন্তানের বন্ধুদের নিয়ে শুধু সন্দেহ না করে খোলামেলা আলোচনা করতে পারেন, বুঝিয়ে দিতে পারেন কোন সম্পর্ক কেন জরুরি। আর গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলো এমন রোল মডেল তুলে ধরতে পারে, যাঁরা সঠিক সম্পর্কের জোরে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানেরও এখানে ভূমিকা আছে। স্কুল ব্যাংকিং ও আর্থিক সাক্ষরতা কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ব্যাংকের যে সম্পর্ক তৈরি হয়, তাকে কেবল হিসাব খোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ক্যারিয়ার পরামর্শ, দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তা-সহায়তার সেতু হিসেবে ব্যবহার করা যায়। সিঙ্গাপুর ২০১৫ সাল থেকে ‘স্কিলসফিউচার’ উদ্যোগের মাধ্যমে নাগরিকদের আজীবন দক্ষতা উন্নয়নকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করেছে। আমাদের দেশেও তরুণদের দক্ষতা ও মেন্টরশিপকে ঘিরে এমন সমন্বিত প্ল্যাটফর্মের কথা ভাবা যেতে পারে।

শেষ কথা
জনমিতিক লভ্যাংশের জানালা চিরকাল খোলা থাকবে না। এই প্রজন্মের তরুণেরা যদি তাঁদের সময় ও মনোযোগ সঠিক সম্পর্কে বিনিয়োগ করেন, তবে সেটিই হবে দেশের সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ। তাই প্রত্যেক তরুণের প্রতি অনুরোধ—আজই নিজের সম্পর্কের তালিকাটি একবার দেখুন। কোন সম্পর্ক আপনাকে শেখাচ্ছে, কোনটি আপনাকে গড়ছে, আর কোনটি নিঃশব্দে আপনার ভবিষ্যৎ খেয়ে ফেলছে। সম্পর্ক বদলালে অভ্যাস বদলায়, আর অভ্যাস বদলালে বদলে যায় ভবিষ্যৎ। মনে রাখবেন, সঠিক সম্পর্কই তরুণের সবচেয়ে বড় মূলধন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত