যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে জয়ী হলেন যেসব মুসলিম নেতা

প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হওয়া থেকে শুরু করে কৃষ্ণাঙ্গ নারী ও আদিবাসী গভর্নর—যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তৈরি হয়েছে একাধিক ঐতিহাসিক নজির।

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:৫৮ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে। এবারের নির্বাচনে মুসলিম, নারী, কৃষ্ণাঙ্গ, আদিবাসী ও এলজিবিটিকিউ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বে এসেছে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য। বিশেষ করে প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা দেশটির রাজনীতিতে নতুন ইতিহাস তৈরি করেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আইনসভা ও কংগ্রেসে জায়গা করে নিয়েছেন মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত একাধিক রাজনীতিক।

মিশিগানে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করে সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট আবদুল আল-সাইয়েদ। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হলেন তিনি। ৪২ বছর বয়সী আল-সাইয়েদ পেশায় চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। এর আগে মিশিগানের ওয়েইন কাউন্টির স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক এবং ডেট্রয়েটের স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

নির্বাচনী প্রচারে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, করপোরেট প্রভাব নিয়ন্ত্রণ এবং ধনীদের ওপর কর বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আল-সাইয়েদ। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা এবং ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের দাবিও ছিল তার প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে প্রচারের সময় মুসলিম পরিচয়কে কেন্দ্র করে বিভিন্ন আক্রমণ ও বিতর্কের মুখেও পড়তে হয় তাঁকে।

নিউ জার্সিতেও তৈরি হয়েছে নতুন ইতিহাস। ১২তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান গ্রেগ মেলেকে হারিয়ে কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট আদম হামাওয়ি। এর মধ্য দিয়ে নিউ জার্সি থেকে প্রথম মুসলিম কংগ্রেস সদস্য হলেন তিনি।

মিসরীয় বংশোদ্ভূত হামাওয়ি একজন প্লাস্টিক ও পুনর্গঠনমূলক সার্জন। সাবেক মার্কিন সেনা চিকিৎসক হিসেবে ইরাক যুদ্ধে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। আহত সেনাদের চিকিৎসার পাশাপাশি বসনিয়া, সুদান, লেবানন ও সিরিয়ায় মানবিক চিকিৎসা কার্যক্রমেও অংশ নিয়েছেন। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে গাজায় চিকিৎসাসেবা দিতে যান তিনি। নির্বাচনী প্রচারে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা ও শিক্ষাঋণ বাতিল এবং ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের পক্ষে অবস্থান নেন হামাওয়ি।

এদিকে ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের সিনেটে জয় পেয়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম রাজনীতিক নাবিলা সৈয়দ। ২৬তম ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান ডারবি হিলসকে হারিয়ে ৫৭ শতাংশ ভোট পেয়েছেন তিনি। এর আগে ২০২২ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে ইলিনয়ের প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হয়ে আলোচনায় আসেন নাবিলা। এবার সিনেটে নির্বাচিত হয়ে অঙ্গরাজ্যের আইন প্রণয়নে আরও বড় পরিসরে কাজ করার সুযোগ পেলেন তিনি।

নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সিনেটেও নতুন ইতিহাস গড়েছেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মুসলিম নারী আবের কাওয়াস। ১২তম ডিস্ট্রিক্টে জয়ী হয়ে নিউইয়র্কের আইনসভায় প্রথম ফিলিস্তিনি মুসলিম নারী হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। কুইন্সের বাসিন্দা কাওয়াস দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসী ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করছেন। আবাসন, ভাড়াটিয়াদের অধিকার, অভিবাসীদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার ছিল তাঁর নির্বাচনী প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

জর্জিয়াতেও মুসলিম ও ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত রাজনীতিক রুয়া রোমানের রাজনৈতিক অগ্রযাত্রা আলোচনায় এসেছে। ২০২২ সালে জর্জিয়ার প্রতিনিধি পরিষদে প্রথম মুসলিম নারী ও প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। এবার অঙ্গরাজ্যের সিনেটের সপ্তম ডিস্ট্রিক্টে প্রাথমিক ফলাফলে রিপাবলিকান প্রার্থী আইজাজ শেখের চেয়ে এগিয়ে থাকার খবর পাওয়া গেছে। তবে তাঁর বিজয়ের বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান জানতে আনুষ্ঠানিক ফলের অপেক্ষা করতে হবে।

অন্যদিকে কংগ্রেসে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছেন মুসলিম আইনপ্রণেতা ইলহান ওমর, রাশিদা তালিব ও আন্দ্রে কারসন। মিনেসোটার পঞ্চম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন সোমালিয়ায় জন্ম নেওয়া ইলহান ওমর। ২০১৮ সালে কংগ্রেসে নির্বাচিত হয়ে রাশিদা তালিবের সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম দুই মুসলিম নারী কংগ্রেস সদস্যের একজন হন।

মিশিগানের ১২তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে আবারও নির্বাচিত হয়েছেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত রাশিদা তালিব। ২০১৮ সালে কংগ্রেসে নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন তিনি। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচারের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়েও সরব রয়েছেন তালিব।

ইন্ডিয়ানার সপ্তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয় পেয়েছেন আন্দ্রে কারসন। ২০০৮ সালে বিশেষ নির্বাচনের মাধ্যমে কংগ্রেসে আসেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কংগ্রেসে নির্বাচিত দ্বিতীয় মুসলিম সদস্য কারসন। নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কার্যক্রমের পাশাপাশি নাগরিক অধিকার, অভিবাসন, পরিবহন ও কর্মসংস্থান নিয়েও কাজ করেছেন তিনি।

মুসলিমদের বাইরেও একাধিক ঐতিহাসিক অর্জন

২০২৬ সালের নির্বাচনে শুধু মুসলিম প্রতিনিধিত্বই নয়, নারী ও বিভিন্ন জাতিগত জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অগ্রগতিতেও নতুন নজির তৈরি হয়েছে।

নিউ মেক্সিকোর গভর্নর নির্বাচনে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট ডেব হাল্যান্ড। রিপাবলিকান গ্রেগ হালকে হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম আদিবাসী নারী গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। লেগুনা পুয়েবলো জনগোষ্ঠীর সদস্য হাল্যান্ড এর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।

জর্জিয়ার গভর্নর নির্বাচনে রিপাবলিকান রিক জ্যাকসনকে হারিয়ে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট কেইশা ল্যান্স বটমস। তার বিজয়ের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে জর্জিয়ার প্রথম নারী গভর্নরও হচ্ছেন আটলান্টার সাবেক এই মেয়র।

ফ্লোরিডার গভর্নর নির্বাচনে জয় পেয়েছেন রিপাবলিকান বায়রন ডোনাল্ডস। এর মধ্য দিয়ে কোনো অঙ্গরাজ্যের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রিপাবলিকান গভর্নর হওয়ার নজির গড়েছেন তিনি।

ইলিনয়ের সিনেট নির্বাচনেও নতুন ইতিহাস তৈরি করেছেন ডেমোক্র্যাট জুলিয়ানা স্ট্র্যাটন। রিপাবলিকান ডন ট্রেসিকে পরাজিত করে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে ইলিনয় থেকে দ্বিতীয় কৃষ্ণাঙ্গ নারী সিনেটর হলেন স্ট্র্যাটন। বর্তমান সিনেটর ট্যামি ডাকওয়ার্থের সঙ্গে দায়িত্ব নিলে একই সময়ে ইলিনয় থেকে দুজন ভিন্ন জাতিগত পরিচয়ের নারী সিনেটর দায়িত্ব পালন করবেন।

নিউ হ্যাম্পশায়ারের সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান জন ই. সুনুনুকে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট ক্রিস পাপাস। তাঁর জয়ের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে প্রথম প্রকাশ্যে সমকামী পুরুষ সিনেটর নির্বাচিত হলেন তিনি। এর আগে ২০১৮ সালে নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে প্রথম প্রকাশ্যে এলজিবিটিকিউ কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন পাপাস।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অধিভুক্ত অঞ্চল ভার্জিন আইল্যান্ডসে গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন স্টেসি প্লাসকেট। তাঁর বিজয়ের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অধিভুক্ত কোনো অঞ্চলের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর হওয়ার ইতিহাস তৈরি হয়েছে।

কয়েকটি নির্বাচনের ফল এখনো চূড়ান্ত নয়

কিছু নির্বাচনে এখনো চূড়ান্ত ফল নির্ধারণের প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে। আলাস্কায় রিপাবলিকান ড্যান সুলিভানের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ডেমোক্র্যাট মেরি পেলটোলা। প্রাথমিক ভোট গণনায় এগিয়ে থাকলেও র‍্যাঙ্কড-চয়েস ভোট গণনা পদ্ধতির কারণে তার জয়ের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। নির্বাচিত হলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে দ্বিতীয় আদিবাসী নারী হওয়ার সুযোগ পাবেন।

অন্যদিকে মিনেসোটার গভর্নর নির্বাচনে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট অ্যামি ক্লোবুচার। এর মধ্য দিয়ে অঙ্গরাজ্যটির প্রথম নারী গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। মুসলিমদের মধ্যে প্রথম সিনেটর নির্বাচিত হওয়া, নতুন প্রজন্মের মুসলিম ও অভিবাসী বংশোদ্ভূত রাজনীতিকদের জয় এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে নারী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

এসব সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অর্জন নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব ও আইন প্রণয়নের কাঠামোয় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়ার একটি চিত্রও তুলে ধরেছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত