 বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন

মানসম্মত কর্মসংস্থানে গতি চাই

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০৪ এএম

কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকার যে সুবিধা বাংলাদেশ বর্তমানে পাচ্ছে, ২০৪৫ সাল নাগাদ তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এরপর ২০৫১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ প্রবীণ জনসংখ্যাপ্রধান দেশে পরিণত হতে পারে। এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংক গত মঙ্গলবার এক প্রতিবেদনে যে সতর্কবার্তা দিয়েছে, আমরা মনে করি তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। সতর্কবার্তার একটি বড় দিক হলো, বর্তমান জনসংখ্যাগত সুবিধা বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থানের গুণগত মানে  ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটিয়ে ভবিষ্যতে উৎপাদনশীলতায় গতি আনার প্রস্তুতি নিতে সময় আছে মাত্র ১৯ বছর।

দেশে কর্মসংস্থান বেশি হয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে; যার বড় একটি অংশ রয়েছে অনানুষ্ঠানিক খাতে। বর্তমান মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৪ শতাংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। প্রায় ৪৪ শতাংশ স্নাতক অনানুষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। কিন্তু এই খাতে কাজের নিরাপত্তা, নির্দিষ্ট মজুরি কাঠামো ও আইনি সুরক্ষা নেই। কাজেই, বেসরকারি পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানের বিকাশ ও কর্মসংস্থানের মান বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রভাব ফেলবে। তরুণদের কর্মক্ষম মানুষে রূপান্তরের যে গুণগত দিক, তাতে বড় ভূমিকা রাখে সমাজ ও পরিবার। আমরা মনে করি, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী তৈরির ক্ষেত্রে বর্তমানে যেসব সীমাবদ্ধতা বিরাজ করছে, তা কাটিয়ে উঠে ভবিষ্যতে উৎপাদনশীলতায় গতি আনতে সরকার, বেসরকারি খাত ও সামাজিক পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

উৎপাদনশীল মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান বাড়াতে আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে গতি আনতে হবে। তরুণদের বাজারের চাহিদা অনুযায়ী যুগোপযোগী ও কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে; যাতে দক্ষতার ঘাটতি দূর হয়, শ্রম উৎপাদনশীলতা বাড়ে। একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে শ্রমবাজারে নারীদের প্রবেশে প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রক্রিয়াগত বাধা এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। নারী-পুরুষের মজুরির ব্যবধান ঘুচাতে হবে। নিরাপদ যাতায়তসহ কর্মপরিবেশ, ডে-কেয়ার সুবিধা এবং প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে প্রতিবছর কিছু নিয়োগ হলেও তা কাজের বাজারে প্রতিবছর কমপক্ষে যে ২০ লাখ তরুণ-তরুণী আসেন, তাদের জন্য যথেষ্ট নয়। তারা যাতে বেসরকারি খাতের কাজে যেতে উৎসাহিত হয়, সেজন্য ন্যায়সঙ্গত মজুরি, অধিকারভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা এবং আইনি সুরক্ষা কার্যকর করা দরকার। তারা যাতে স্বকর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হতে আগ্রহী হয়, সেজন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরিতেও সরকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক উভয় খাতে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান বাড়াতে মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ব্যবসার নিয়মকানুন সহজ করতে হবে। আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন সহজলভ্য করতে হবে।

সরকারি চাকরিতে আগ্রহী বেশি হওয়ার বড় কারণ বৃদ্ধ বয়সে আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা। বেসরকারিতে তরুণ বয়স পার হয়ে মানুষ যখন বার্ধক্যে উপনীত হয়, তখন কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হবে; সে বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না। আমরা মনে করি, আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক উভয় খাতের কর্মীদের জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্রুপ বীমা ও  টেকসই পেনশনসহ শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা গড়তে হবে। শিশুকালীন পুষ্টি থেকে শুরু করে বয়স্কদের জন্য সুলভে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ও প্রবীণ পরিচর্যা কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে।

বর্তমান সরকারের জন্য বিষয়গুলো যে খুব একটা নতুন, কিংবা বিশ্বব্যাংক বলছে বলেই আমরা বলছি তা নয়। যে নির্বাচনী ইশতেহার সামনে রেখে গত ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হয়েছে, সেই ইশতেহারেই আগামী ৫ বছরে ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেকার ভাতা চালু, তরুণ ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে তরুণদের যুক্ত করা, উন্নত প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিশেষ ঋণ দেওয়ার কথা বলা আছে। আমরা চাই, সরকার ভবিষ্যতের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর দিকটি বিবেচনায় রেখে নিজের প্রতিশ্রুতিই দ্রুত বাস্তবায়ন করুক। মানুষকে কী করে অর্থনৈতিক কর্মকা-ে দ্রুত যুক্ত করা যায়, মানুষের আয় বাড়ে, সেসব বিষয়ে এখুনি সিদ্ধান্ত নিক। সব মিলিয়ে আমরা মনে করি, সরকারি ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজগুলো করতে হবে,  দ্রুত, সময়ক্ষেপণ না করে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত