না বুঝে মুখস্থ নয়, কখনও মিথ্যাচার নয়...

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৪৬ এএম

প্রফেসর ইমেরিটাস ড. অরুণ কুমার বসাক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের বিশিষ্ট শিক্ষক ও গবেষক। বিদেশের ক্যারিয়ার ছেড়ে দেশে ফিরে তিনি গবেষণা ও প্রতিষ্ঠান গড়ায় অবদান রেখেছেন। জীবন ও গবেষণা নিয়ে তিনি দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব

প্রশ্ন : যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করার পর টেনিওর রিসার্চ ফেলোশিপের মতো নিশ্চিত ও লোভনীয় আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ছেড়ে সেই সময়ে দেশে ফিরে আসার পেছনের প্রধান চিন্তা বা প্রেরণা কী ছিল?

অরুণ কুমার বসাক : ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান সরকারের Merit Scholarship নিয়ে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের Imperial College-এ উচ্চশিক্ষার জন্য যেতে প্লেনে ওঠার আগে আমার পাসপোর্টটি বাজেয়াপ্ত করা হয়। এরপর প্রতি বছর বারবার স্কলারশিপ পেলেও আমার পাসপোর্টটি ফেরত পাইনি। সাত বছর দেরিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর, Commonwealth Scholarship  পেয়ে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ পাসপোর্ট নিয়ে আমি বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে Experimental Low Energy Nuclear Physics field-এ পড়তে যাই। এটা আমার পছন্দের ফিল্ড ছিল না (আমার গবেষণা ফিল্ড ছিল কণাবিজ্ঞান)। কিন্তু বয়স বেশি হয়ে যাওয়ার কথা ভেবে আমি তা মেনে নিই।

বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু হওয়ার ৯ মাস পরে problem-based  তত্ত্বীয় পরীক্ষা হলো। ৭ দিন বাদে আমার বিভাগীয় হেড প্রফেসর উইলিয়াম বারচাম এসে আমাকে অভিনন্দন জানালেন। বিভাগে সাড়া পরে গেল Nuclear Physics Group-এ, আমি পরীক্ষাতে first হয়েছি। আমার সুপারভাইজার স্যার খুব গর্বিত হয়েছিলেন। নিউক্লিয়ার গ্রুপের বাইরের বিভাগীয় সিনিয়র শিক্ষকরাও আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন।

১৯৭৫ সালে আমি বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘Polarization Effects in (d,p) Reactions’ শীর্ষক  Ph.D. thesis  জমা দিই। বাইরের পরীক্ষক ছিলেন যুক্তরাজ্যের  University of Surrey-এর বিশ্ববিখ্যাত তত্ত্বীয় বিজ্ঞানী Professor Ron Johnson। প্রফেসর জনসন একজন শক্ত পরীক্ষক । তিনি দুই ঘণ্টা ধরে একের পর এক প্রশ্ন রেখেছিলেন। তারপর বললেন, ‘No more questions. Would you please wait outside?’ প্রফেসর জনসন স্যার পাঁচ মিনিট পর বাইরে এসে হাত মিলিয়ে আমাকে বললেন, ‘Congratulations! You defended your  thesis well. বিষষ.’ এক সপ্তাহ বাদে বাইরের ৬ জন applicant-সহ আমার চাকরির সাক্ষাৎকার শেষ হলো। Tenure-Faculty  as a Research Fellow  পদে আমাকে নিয়োগ দেওয়া হলো। আমার মনে এলো বাংলাদেশ স্বাধীন না হলে তো আমি বিদেশে আসতে পারতাম না। শৈশবে আমি অনেক আর্থিক অনটনের মধ্যে মায়ের আদর্শে বড় হয়েছি। মা আমার সৎ ও দেশপ্রেমিক ছিলেন। আমার মাকে মনে পড়েছিল। ভাবলাম দেশকে সেবা দেওয়া আমার কর্তব্য। ঠিক করলাম, এক বছর চাকরি করে দেশে ফিরব। সবাইকে অবাক করে ১৯৭৬ সালে অক্টোবরের শেষে দেশে ফিরলাম।

প্রশ্ন : দেশে ফেরার পর তৎকালীন প্রেক্ষাপটে গবেষণার পরিবেশ বা ল্যাবরেটরির সুযোগ-সুবিধা কেমন ছিল? প্রাথমিক দিনগুলোতে সংকটগুলো আপনি কীভাবে সামলেছেন?

অরুণ কুমার বসাক : ১৯৭৬ সালে দেশে ফিরে আমার মনে হলো, শক্তিশালী গবেষক গোষ্ঠী তৈরি করতে হবে। এর জন্য কয়েকটা পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবলাম : (১) প্রথম বর্ষ সম্মান ব্যবহারিক ক্লাসে  interactive পদ্ধতিতে পড়ানো শুরু করলাম। প্রথমে শিক্ষক পড়াবেন। দ্বিতীয় ধাপে শিক্ষার্থীরা গ্রুপভিত্তিকভাবে ক্লাসে বসেই পড়াশোনা করবে। তৃতীয় ধাপে ব্যবহারিক ক্লাসের শিক্ষকরা গ্রুপভিত্তিক শিক্ষার্থীদের একে একে বিষয়গত গভীরতা পরীক্ষা করবেন। সবল শিক্ষার্থী দুর্বলদের দরকার মতো বিষয়গত কনসেপ্ট দিয়ে সাহায্য করবে। এতে শিক্ষার্থীদের সবল-দুর্বল উভয়ই উপকৃত হবে।

বিষয়গত কনসেপ্ট উন্নয়নের পর পরের ধাপে পরীক্ষণের যন্ত্রপাতির ব্যবহার শিক্ষা দেওয়া হবে। এখানেও সবল শিক্ষার্থী দুর্বলকে সাহায্য করবে। পরীক্ষণ শিক্ষার্থীকে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রধান হাতিয়ার। দরকার মতো আমরা বাড়তি সময়ে স্কুল-কলেজের বুনিয়াদি বিষয়গুলো পড়িয়েছি। এসব প্রশিক্ষণের প্রভাবে আশীর দশকে মাস্টারস পাস করা শিক্ষার্থী সারা বিশ্বে ভালো করেছে।

কম্পিউটার গবেষণার জন্য একটা বড় হাতিয়ার। তাই বিদেশ থেকে ফিরেই আমার গবেষণার কাজের জন্য কম্পিউটারের প্রয়োজনীয়তা প্রচণ্ডভাবে বুঝতে পারলাম। সে সময়ে ওইগ-এর বিশাল কম্পিউটার ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) এবং ঢাকার Atomic Energy Centre (AEC)-এ। আমাদের গবেষণা কাজে কম্পিউটার ব্যবহারের জন্য ঢাকাতে যাতায়াত করতে হতো। IBM-এর মেইন-ফ্রেম কম্পিউটার কেনা এবং ঢাকার বাইরে রক্ষণাবেক্ষণের খরচ চালানো রাবির জন্য অসম্ভব ছিল। এ ছাড়াও আর্দ্রতা-নিয়ন্ত্রিত ধুলিমুক্ত পরিবেশ কম্পিউটারের জন্য অপরিহার্য। ১৯৮৫ সালে তখনকার রাবির উপাচার্য প্রফেসর এম. আব্দুর রকীব স্যার অনেক চিন্তাভাবনার পর একটা ছোট কম্পিউটার কেনার সিদ্ধান্ত নেন। তখন ওইগ-এর মাইক্রো-কম্পিউটার বাজারে আসেনি। মাননীয় উপাচার্যের নির্দেশে কম্পিউটার-হার্ডওয়্যারে পিএইচডি ডিগ্রি পাওয়া তখনকার রাবির একমাত্র শিক্ষক ড. রমেশচন্দ্র দেবনাথকে নিয়ে আমি ঢাকায় বাজার যাচাই করতে গেলাম। রাবির বরাদ্দ করা টাকায় আমরা কয়েকটি টার্মিন্যালসহ Motorola processor  যুক্ত আলফা-মাইক্রো কম্পিউটার কেনার প্রস্তাব দিয়েছিলাম, যা রাবি প্রশাসন মেনে নিয়েছিল।

আমি নিজেই অনেক ভাবনা-চিন্তা দিয়ে কম্পিউটার-রুমের ও কম্পিউটার-ব্যবহারকারীদের কক্ষের মডেল প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কক্ষগুলোর নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর যথাসময়ে আলফা-মাইক্রো কম্পিউটার চারটি টার্মিনালসহ  install  করা হয়। কেনার পর আমি বাধ্য হয়ে সিস্টেমের ম্যানুয়েল পড়ে পড়ে অপারেশন শিখেছিলাম কারণ তখনকার দিনে সিস্টেম অপারেটর পুরো দেশেই বিরল। আলফা কম্পিউটার বসানোর পর মাননীয় উপাচার্যের নির্দেশে আমার নেতৃত্বে রাবিতে প্রথম ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াও বাংলাদেশে প্রথম রাবির অ্যাকাউন্টসের বার্ষিক হিসাবপত্র (e-accounts) কম্পিউটারে করা হয়েছিল। চার বছরের অ্যাকাউন্টসের হিসাবপত্র তৈরিতে ডেটা সরবরাহের মাধ্যমে যিনি মূল্যবান অবদান রেখেছিলেন তিনি হলেন অ্যাকাউন্টসের ডেপুটি ডিরেক্টর জনাব ষড়ানন প্রামাণিক। অন্যদিকে ভর্তি পরীক্ষার কাজে অসামান্য অবদান রেখেছিলেন অর্থনীতি বিভাগের ড. এম. আহসানুল হাবিব (বর্তমানে প্রয়াত)।

আলফা-মাইক্রো কম্পিউটার সিস্টেম আমার পরিচিত ছিল তাই আমি থাকতেই শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) আলফা মাইক্রো-কম্পিউটার কেনার সিদ্ধান্ত নিই। এই সিস্টেমের জন্য উপযুক্ত প্রোগ্রামিং সফটঅয়ের software) বাজারে পাওয়া যেত না। কিন্তু সুবিধার দিক ছিল কোনো ‘কম্পিউটার ভাইরাসের’ সমস্যা ছিল না আলফা মাইক্রোর অপারেটিং সিস্টেমে। তখনকার দিনে প্রশাসনিক দপ্তরগুলোতে চিঠিপত্র ছাপানোর জন্য টাইপ-রাইটার ব্যবহার করা হতো। শাবিপ্রবিতে কম্পিউটার কেনার কারণে কোনো দপ্তরে নতুন টাইপ-রাইটার না কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে কর্মচারী, কর্মকর্তা ও শিক্ষকরা কম্পিউটার ব্যবহার দ্রুত শিখে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। শাবিপ্রবিতে কেন্দ্রীয়ভাবে কয়েকটি টার্মিনালসহ ১টি মাইক্রো কম্পিউটারের সরবরাহ পাওয়ার আগেই সেটা বসানোর জন্য উপযুক্ত পরিবেশসহ একটি কম্পিউটার কেন্দ্র খুব তাড়াতাড়ি স্থাপন করার পুরো দায়িত্ব আমার ওপর এসে পড়ে। আমাদের দেশে ধূলিমুক্ত ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রিত ইনসুলেটেড কম্পিউটার রুম এবং ব্যবহারকারীদের জন্য টার্মিনাল কক্ষের ডিজাইন-প্ল্যানিং, ড্রেসিং এবং পেইন্টিং আমাকে নিজের হাতেই করতে হয়েছিল। এ সময় ভিসি স্যার ও সিলেটের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা আমাকে অনেক উৎসাহ জুগিয়েছিলেন। কম্পিউটার বসানোর পর আমি একজন ভালো টেকনিশিয়ান এ এস এম খয়রুল আকতার চৌধুরী, স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাকে কম্পিউটার কেন্দ্র চালাতে সাহায্য করেছিলেন।

আমার মৌলিক অবদান প্রসঙ্গে আমি APS Fellowship Certificate-এ উল্লেখ করা Citation-এর উদ্ধৃতি দিচ্ছি, ‘For breakthroughs in using the nucleus-nucleus potential to solve long-standing challenges in nuclear and astrophysics, and for promoting computer awareness and science education in Bangladesh as a dedicated researcher, teacher, and capacity-builder.’

প্রশ্ন : ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি থেকে আপনার লেখা ব্যবহারিক পদার্থবিজ্ঞান বইটি প্রকাশিত হয়, যা আজও শিক্ষার্থীদের খুব কাজে লাগে। বাংলায় বিজ্ঞানের এমন বই লেখার পেছনের অনুপ্রেরণা কী ছিল?

অরুণ কুমার বসাক : আমি আগেই বলেছি, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে শিখতে পারে। পদার্থবিজ্ঞান ব্যবহারিক বই মাতৃভাষা বাংলায় লেখার উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীরা যেন বিষয়গত কনসেপ্ট এর গভীরে যেতে পারে।

প্রশ্ন : আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটির Physical Review  এবং Physical Review Letters-এর মতো শীর্ষস্থানীয় জার্নালে আপনার বহু গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের এমন কাজ দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে বসে ধারাবাহিকভাবে করা কীভাবে সম্ভব হলো?

অরুণ কুমার বসাক : এটা সম্ভব হয়েছে, আমাদের নিষ্ঠা, সততা, প্রচুর পরিশ্রম, অপরিসীম সহ্যশক্তি, সরল জীবন-যাপন, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, দেশকে বিশ্বে তুলে ধরার দৃঢ় প্রত্যয়, ও লোভ-লালসার প্রতি অনীহার কারণে।

প্রশ্ন : আপনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় উভয় প্রতিষ্ঠানেরই কম্পিউটার সেন্টার এবং পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠালগ্নে নেতৃত্ব দিয়েছেন। একদম শূন্য থেকে বিভাগ বা গবেষণার কাঠামো গড়ে তোলার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

অরুণ কুমার বসাক : অভিজ্ঞতা হয়েছে খুব চ্যালেজ্ঞিং কাজের মাধ্যমে। সপ্তাহে সাত দিন প্রতিদিন সকাল ৭টার থেকে রাত ১১ থেকে ১২টা পর্যন্ত কাজ করার অভিজ্ঞতা সঞ্চয়। অভিজ্ঞতার ফসল : ৫ ঘণ্টার বিশ্রাম সত্যিই উপভোগ্য এবং এটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এর প্রভাবে তো আমি রুগ্ন শরীর নিয়ে আমার বর্তমান বয়সেও গবেষণা কাজ করতে পারছি। যিনি কাজ কম করেন, তিনি এটা বুঝতে পারবেন না। একদম শূন্য থেকে সব কাঠামো গড়ে তোলা চরম আনন্দদায়ক!

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও সিলেটে শাবিপ্রবিতে কিছু তো অবদান রাখতে পেরেছি। বিচারের ভার জনগণের। তবে আমার তো কোনো অনুশোচনা করার প্রয়োজন নেই। এটা বড় আনন্দ আমার!

প্রশ্ন : আপনার সরাসরি তত্ত্বাবধানে বহু শিক্ষার্থী পিএইচডি ও এমএসসি সম্পন্ন করে আজ বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত। শিক্ষক ও মেন্টর হিসেবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গবেষণার আগ্রহ তৈরি করতে আপনি মূলত কোন দর্শনে বিশ্বাস করেন?

অরুণ কুমার বসাক : আমার দর্শন মায়ের কাছ থেকে পাওয়া দেশপ্রেম, সততা, নিষ্ঠা, পরিশ্রম, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, মমত্ববোধ এবং ক্লাসের বাইরে পড়িয়ে পয়সা না নেওয়া।

প্রশ্ন : বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনার বক্তৃতায় আপনি ‘Quality Research and Our Uplift’ নিয়ে কথা বলেছেন। বাংলাদেশে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণার প্রধান অন্তরায়গুলো কী এবং এর থেকে উত্তরণের উপায় কী?

অরুণ কুমার বসাক : অন্তরায় বহুবিধ, যেগুলো উল্লেখ না করাই ভালো। তবে যা করা উচিত তাই বলছি।

শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। দরকার মতো তাদেরকে জনগণের কাছে দায়বদ্ধতার ব্যবস্থা রাখতে হবে। আমাদের অভিভাবকদের অন্ধ স্নেহ ছেড়ে সন্তানদের পরিশ্রম ও নিষ্ঠা দিয়ে স্বাবলম্বী হতে সাহস দিতে হবে। এতে তাদের মেধার বিকাশ ঘটবে ও তারা সৃজনশীল হতে পারবে। আমাদেরকে লোভমুক্ত হয়ে পারস্পরিক বিভেদ ভুলে এক কাতারে আসতে হবে। কোয়ালিটি শিক্ষক/গবেষককে বেশি মূল্য দেওয়া প্রয়োজন। ছোটবেলায় দেখেছি, আমাদের স্কুলের প্রধান স্যার স্বনামধন্য রাধাবিনোদ বসাক। একজন উচ্চস্তরের আদর্শ শিক্ষক হিসেবে তার সুনাম ছিল। ধনী পরিবারের সন্তান হয়েও তিনি ৬৮ বছর বয়সে প্রতিদিন প্রায় ১ মাইল পায়ে হেঁটে স্কুলে আসতেন। কারণ হিসেবে জেনেছি, ছাত্রদেরকে আরাম-আয়েশ থেকে বিরত থাকার জন্য এটা ছিল তার প্রচ্ছন্ন নির্দেশ। তিনি প্রতি বছর একজন ছাত্রকে বাড়িতে পড়াতেন, সম্ভবত বিনা পয়সায়। তার প্রশিক্ষিত ছাত্রগণ ঢাকা বোর্ডে ম্যাট্রিক পরীক্ষাতে মেধা তালিকাতে প্রথম দশের মধ্যে স্থান পেত। বাবার মুখে শুনেছি তার পড়া স্বাগত বক্তব্য, ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড জর্জ কার্জন (George Curzon) এর প্রশংসা কুড়িয়েছিল। বসাক স্যারের ইংরেজি উচ্চারণ ব্রিটিশ সাহেবদের মতো ছিল । তিনি মাঝেমধ্যে আমাদেরকে অঙ্ক শেখাতেন, যা ছিল অসাধারণ। স্যারকে রাস্তায় দেখলেই জেলা প্রশাসক সাহেব গাড়ি থেকে নামতেন এবং স্যালুট করে আবার গাড়িতে উঠতেন।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং শিক্ষার্থী-শিক্ষার্থীর একাডেমিক আলোচনা খুবই ফলপ্রসূ। আমাদের পারস্পরিক বিভেদ ভুলে ‘যার যা আছে তাই নিয়ে’ যদি আমরা একত্রিত হতে পারি, তাহলে সব রকম দুর্বলতাকে জয় করে আমরা এগোতে পারব। এতে বৈশিকভাবে আমাদের সন্তানদের সাফল্য নিশ্চিত হবে। তাতে আমরা সবাই নির্মল আনন্দ উপভোগ করব।

প্রশ্ন : রিচার্ড ফাইনম্যানের উক্তি উল্লেখ করে আপনি বলেছে ‘Science is a long history of learning how not to fool ourselves।’ বিজ্ঞানচর্চায় পক্ষপাতহীনতা বা সততা বজায় রাখা একজন গবেষকের জন্য কতটা জরুরি?

অরুণ কুমার বসাক : পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ী রিচার্ড ফাইনম্যান পদার্থবিজ্ঞানে সর্ব যুগের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তিনি অঙ্গভঙ্গি করে ও নৃত্য পরিবেশন করে পড়াতেন। তিনি অপ্রিয় সত্য কথা বলতে ভয় পেতেন না।। তিনি ড্রাম বাজাতেন। তিনি একজন উচ্চ মানের পেইন্টার ছিলেন। তার মানবিক বোধ ছিল অসাধারণ। চল্লিশ দশকে তার প্রেমিকার যক্ষা রোগ ধরা পরলেও তিনি মানবিক বোধে তাকে বিয়ে করেছিলেন। তার এই স্ত্রী অল্প দিন পর মারা যান। সত্য ঘটনার পরিবেশন ছাড়া বিজ্ঞান গবেষণা এগোতে পারে না। নতুন আবিষ্কার সম্ভব হয় না।

অরুণ কুমার বসাক :  না বুঝে মুখস্থ নয়। কখনও মিথ্যাচার নয়। প্রথমে পরিশ্রম করে বিষয়ের গভীরে যাও। বিষয়গত কনসেপ্ট সহজ হয়ে আসবে। শুধু নোট চালাচালি নয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং শিক্ষার্থী-শিক্ষার্থীর বিষয়গত আলোচনা খুবই ফলপ্রসূ। ড্রাগ থেকে দূরে থাক।

প্রশ্ন : স্টিভ জবসের ‘Stay hungry, stay foolish

উদ্ধৃতিটি আপনি তরুণদের প্রায়ই স্মরণ করিয়ে দেন। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তরুণ গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য এর প্রায়োগিক অর্থ আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

অরুণ কুমার বসাক : জ্ঞান অর্জনে শিক্ষালাভের জন্য ‘ক্ষুধার্ত’ থাকা ও ‘বোকা বোধ নিয়ে’ বিনয়ী হওয়া খুবই দরকার।

প্রশ্ন : ৮৫তম জন্মবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ বিজ্ঞানযাত্রার দিকে তাকালে আপনার ভেতর কোন প্রাপ্তিটি সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয়, আর কোনো অপূর্ণতা কি অনুভব করেন?

অরুণ কুমার বসাক : দেশের সম্মানে উচ্চ মানের গবেষণা করতে পেরেছি। আমার ছাত্র-ছাত্রীরা উন্নত বিশ্বে উচ্চ পদে আছেন। এতে আমি আনন্দ পাই। অপূর্ণতার অনুভূতি থেকে দূরে থাকার শিক্ষা, আমার মা দিয়েছিলেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত