ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার ইতিহাসে যোগেন চৌধুরী এমন এক শিল্পী, যার শিল্পভাষা যেমন স্বতন্ত্র, তেমনি তার শিল্পভাবনা ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সদ্যপ্রয়াত এই শিল্পীর শিল্পকর্ম, রাজনীতি ও জীবনদর্শনের নানা দিক ফিরে দেখেছেন শিল্প-ইতিহাসের শিক্ষক ড. সঞ্জয় চক্রবর্ত্তী। তার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে শিল্পীর সৃজনপ্রক্রিয়া, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সময়কে দেখার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো
শিল্পীর কি দেশ আছে? শিল্পীকে কি কোনো কাল অথবা সীমারেখায় বন্দি করা যায়? শিল্পী কার হয়? মানুষের, সমাজের নাকি পৃথিবীর। যোগেন চৌধুরীকে আলোচনায় আনতে গেলে এই প্রসঙ্গগুলো প্রাসঙ্গিক হয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়। কারণ যোগেন চৌধুরীর জন্ম ১৯৩৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটিশ ভারতে। পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) তদানীন্তন ফরিদপুরের গোপালগঞ্জ সাবডিভিশনের ডহরপাড়া গ্রামে তার জন্ম। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশের শিল্পী শওকতুজ্জামানকে এক চিঠিতে তিনি লিখেছেন ফরিদপুর থেকে পাঠানো গুড় খেয়ে তৃপ্তির কথা। গত দুই দশক ধরে বেশ কয়েকবার যোগেন চৌধুরী বাংলাদেশে এসেছেন। যদিও বর্ডার ক্রস করার সময় তিনি ভারতীয় নাগরিক হিসেবে ইমিগ্রেশন ক্রস করেছেন। কিন্তু শিল্পীর দেশ কি রডক্লিফের তৈরি করা রেখার মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হয়? যোগেন চৌধুরী গত হওয়ার পর ফেসবুক যখন খুললাম দেখতে পাই কত শত মানুষের সঙ্গে যোগেনদার স্মৃতি। বাংলাদেশের শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক কার সঙ্গে যে যোগেনদার স্মৃতি নেই তা বলা কঠিন।
ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম যোগেন চৌধুরীর শিল্পসত্তা শৈশবে পারিবারিকভাবেই পেয়েছিলেন। বাবা প্রমথনাথ চৌধুরী পৌরাণিক কাহিনি ও দেবদেবীর চিত্র নির্মাণে ছিলেন আগ্রহী, অন্যদিকে মা ইন্দুদেবী চৌধুরানী ছিলেন আলপনা আঁকায় দক্ষ। নয় বছর পর্যন্ত পূর্ববঙ্গেই কেটেছিল তার শৈশব। পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী সময়ের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিল শিল্পীর পরিবারের জ্ঞাতি বংশ এবং পূর্ববঙ্গে একই এলাকার বাসিন্দা। কিন্তু দেশভাগ পূর্ববঙ্গের অনেকের মতো যোগেন চৌধুরীর পরিবারকেও বাস্তুচ্যুত করে। উদ্বাস্তু হিসেবে যোগেন চৌধুরীর পরিবার আশ্রয় নেয় কলকাতায় কাকার বাসায়। প্রথম দিকে যোগেন চৌধুরীর বাবা নিজের বাড়ি ছাড়েননি। হয়তো বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়েছিল নিজ ভূমি, জমিদারি কীভাবে অন্য দেশের হয়ে গেল। কিন্তু বাস্তবতা মেনে নিয়েই ১৯৫১ সাল থেকে পিতার সঙ্গে পূর্ববঙ্গের জমিদারপুত্র যোগেনের আশ্রয় হয় কলকাতার ঢাকুরিয়ার শহিদনগর কলোনিতে। শৈশবের স্মৃতি মানুষের অনুভূতি ও কল্পনার জগৎ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যোগেন চৌধুরীর ক্ষেত্রেও শৈশবে দেখা বাংলার প্রকৃতি, পারিবারিক স্মৃতি, সামাজিক পরিবেশ তার শিল্পীসত্তার বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল নিঃসন্দেহে। দেশভাগের পর যে সংকটের মধ্যে তৎকালীন কলকাতা, যোগেন চৌধুরীর স্মৃতিচারণে তা অনেকবার উপস্থাপিত হয়েছে।
যৌবনে যোগেন চৌধুরীর শিল্পীসত্তা বিকাশে প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। একদিকে কলকাতার গর্ভমেন্ট আর্ট কলেজের অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে ছিল ফ্রান্সের École nationale supérieure des Beaux-Arts এবং উইলিয়াম হ্যাটারের অঃবষরবৎ ১৭-এ তার শিক্ষাজীবন। ১৯৫৫ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্রাফটে পড়াশোনা করেন। শিক্ষক পেয়েছিলেন মানিক লাল বন্দ্যোপাধ্যায়, ধীরেন ব্রহ্ম, দেবকুমার রায়চৌধুরী, অপর্ণা রায়, বরেন নিয়োগী, রথীন মৈত্র, সত্যেন ঘোষাল, হরেন দাস, গোপাল ঘোষ এবং কিশোরী রায়কে। গর্ভরমেন্ট আর্ট কলেজে শিক্ষা গ্রহণকালে পঞ্চাশের দশকে দেখা বামপন্থি আন্দোলন, মার্কসিস্টদের রাজনীতির প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তার মনোজগতে প্রভাব বিস্তার করেছিল। কারণ এ সময় দেশভাগ-উত্তর কলকাতায় শরণার্থীর চাপ তৈরির কারণে খাদ্য, শিক্ষা, চাকরি, জীবিকা নির্বাহের নানাবিধ সমস্যা তৈরি হয়। নিজের স্মৃতিচারণায় তিনি বলেছিলেন শরণার্থী কলোনিগুলোতে মানবেতর জীবনযাপনের চিত্র তার ছবির বিষণœতার উৎস। কিন্তু শিল্পী শিল্পচর্চার মধ্য দিয়ে বিষণœতা এবং শোককে শক্তিতে রূপান্তর করেছিলেন। জীবনের সব নিপীড়নকে তিনি ছবির মধ্যে প্রকাশ করে দিয়েছিলেন। এ কারণেই হয়তো যোগেন চৌধুরীর কাজ বাহুল্যতা বিবর্জিত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তার চিত্রের মূল বিষয় বা সাবজেক্ট কালো অথবা কালচে খয়েরি অন্ধকার বেকগ্রাউন্ডের বিপরীতে দর্শকের সামনে উপস্থিত হয়। এই বৈশিষ্ট্যের ছবির চরিত্রগুলো যার কারণে সরাসরি দর্শকের মনোজগতে প্রবেশ করে। দর্শক তখন শুধু সেই ছবির চরিত্রের হয়ে যায় অথবা চরিত্রটি শুধু সেই দর্শকের হয়ে যায়। এর ফলে যোগেনের ছবির প্রভাব তার দর্শকের ওপর অনেক বেশি। এই প্রবণতা যোগেন কোথা থেকে পেলেনÑ তা যদি আমরা বুঝতে চাই, তবে তার মধ্যকার অস্তিত্ববাদীতাকে বোঝা প্রয়োজন, সঙ্গে প্রয়োজন ছবির যে রাজনীতি থাকে তাকে। যে অস্তিত্ববাদিতার জন্ম হয়েছিল তার জীবনের ক্রমপরিবর্তিত সমাজ বাস্তবতার মধ্যে। যোগেন চৌধুরীর শৈশব ও বড় হয়ে ওঠার মধ্যে একদিকে ছিল দেশভাগ আর অন্যদিকে ছিল কলকাতার অনিশ্চিত জীবনের বাস্তবতা। অনেক মানুষের মধ্যে হারিয়ে না গিয়ে অস্তিত্বের রক্ষার লড়াইয়ের প্রত্যক্ষ উপস্থাপন তার চিত্রের চরিত্রগুলো। যে চরিত্রগুলো হতাশার কথা বলছে, মধ্যবিত্তের দুঃখের কথা বলছে, জীবনযুদ্ধের ক্লান্তির কথা বলছে কিন্তু হেরে যাচ্ছে না। দৃঢ়তার সঙ্গে কোনো ধরনের বাহুল্যতা ছাড়া জীবনের বয়ান নির্মাণ করে যাচ্ছে। কারণ তার অনিশ্চিত জীবনের অন্ধকারের বিপরীতে নিজেকে গড়ে তোলার মতো তার ছবির চরিত্রগুলোও অন্ধকারের বিপরীতে অদ্ভুত এক স্পষ্টতা নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়। অন্ধকারের বিপরীতে এই উপস্থাপন এতই সত্য ও স্পষ্ট যেন তাকে অগ্রাহ্য করা যায় না। এটাই তার ছবির রাজনীতি।
১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি ভবনের আর্ট মিউজিয়ামের কিউরেটর হিসেবে কাজ শুরু করেন যোগেন চৌধুরী। যোগেন চৌধুরী যখন ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে কাজ করতে শুরু করলেন তখন দুটি বিষয় তার মধ্যে ধরা দেয়Ñ একটি ভারতীয় ঐতিহ্য ও শিল্পকে খুব কাছ থেকে দেখা এবং আরেকটি সমাজের প্রতিনিধিত্বশীল মানুষের চরিত্রকে খুব কাছ থেকে দেখা। এই দেখার প্রভাব কিন্তু সরাসরি তার কাজে ধরা দেয়। শিল্পে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক অভিব্যক্তির প্রকাশ এই সময় থেকেই তার কাজে আসতে থাকে। শিল্পে এই মনস্তাত্ত্বিক অভিব্যক্তির প্রকাশকে শিল্প ঐতিহাসিক শিবকুমার বলেছেন, ‘সাইকোলজিক্যাল ডাইমেনশন’। যোগেন চৌধুরীর কাজে যে রবীন্দ্রনাথের প্রভাবের বিষয়টি যোগেন চৌধুরী নিজে নানা জায়গায় উল্লেখ করেছেন এবং এই প্রভাব যে শুধু মনোজগতের আবহে ধরা পড়েছে তা নয়, যোগেন চৌধুরী যেন সর্বোতভাবে রবীন্দ্রনাথকে আতস্ত করতে চেয়েছেন। যোগেন চৌধুরী কলা ভবনের শিক্ষক অধ্যাপক সৌমিক নন্দী মজুমদারের এক সাক্ষাৎকারে বলেন, রবীন্দ্রনাথকে তিনি বুঝতে পারেন কারণ তিনি শান্তিনিকেতনের বাইরে থেকে এসেছেন। কারণ রবীন্দ্রনাথের তৈরি শান্তিনিকেতনে জন্ম নেওয়া অনেকে রবীন্দ্রনাথকে বুঝতে পারে না। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে যোগেন চৌধুরীর যে সম্পর্ক তা ধরা পড়ে শিল্পী চিত্রের ‘প্রসেস অব ভিসুয়াল মেকিং’-এর মধ্য দিয়েই। রবীন্দ্রনাথের ছবিতে যেমন রঙরেখার নিচে থাকে যোগেন চৌধুরীর বেলায়ও তা-ই। অধ্যাপক শোভন সোমের ব্যাখ্যায় রবীন্দ্রনাথের রঙরেখার ভেতর থেকে উঁকি দেয়, যা যোগেন চৌধুরীর ছবির বেলায়ও সত্য। এই রঙের উঁকি দেওয়া কালোর মধ্যে আলোর নাচন। একই বিষয়টি রোমান্টিক ব্রিটিশ চিত্রকর কনস্টেবলের বিষয়েও সত্য। শিল্পী কনস্টেবলের ক্যানভাস উজ্জ্বল মনে হওয়ার একটা বড় কারণ ছিল, তিনি ক্যানভাসের প্রথম আস্তরে হলুদের কাছাকাছি একটা উষ্ণ রঙ দিয়ে তার ওপর ডার্ক রঙ চাপাতেন, ফলে পরবর্তী সময় দেওয়া তুলির আঁচড়ের ফাঁকে ফাঁকে নিচের আস্তরে বা লেয়ারে থাকা উষ্ণ রঙ উঁকি মারত। রবীন্দ্রনাথের ছবিতে এই রঙের এই বৈশিষ্ট্য আমরা দেখতে পাই। একই বিষয় যোগেন চৌধুরীর বেলায়ও সত্য। যোগেন চৌধুরীর ছবির অবয়বগুলো মাঝে মাঝে হতাশা ও রতিক্লান্ত মুখভঙ্গি নিয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত হলেও অবয়বগুলোর মধ্যে ব্যবহৃত কালো রঙের হ্যাচিং লাইন যার মধ্যে উষ্ণ রঙের আভা অবয়বগুলোকে রক্তমাংসের জীবন্ত করে তোলে। ফলে ছবিতে মুখভঙ্গিগুলো যতটা নির্মোহ হয়ে উপস্থিত হয় অবয়বগুলো ততই জীবনী শক্তি নিয়ে দর্শকের সামনে হাজির হয়। অবয়বের এই স্পর্শকাতরতা নিঃসন্দেহে একান্তই যোগেন চৌধুরীর আবিষ্কার। এমন চরিত্রের কারণেই যোগেন চৌধুরীর ছবি আমাদের দৃশ্যানুভূতিকে ছবির মধ্যে আটকে রাখে।
১৯৮৭ সালে দিল্লির চাকরি ছেড়ে শিল্পী চলে আসেন শান্তিনিকেতন। শান্তিনিকেতনে আসার পর যোগেন চৌধুরীর কাজে আলপনা অথবা সুস্পষ্টভাবে বললে আলপনার রেখার প্রভাব অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে বলা যায়, শান্তিনিকেতনের বিভিন্ন উৎসবে আলপনা কেন্দ্রিক
সংস্কৃতি। রবীন্দ্রনাথ এবং শান্তিনিকেতনের সঙ্গে আলপনার সম্পর্ক একেবারে শুরু থেকেই। রবীন্দ্র অনুরাগী যোগেন চৌধুরী প্রাসঙ্গিকভাবেই আলপনাকে তার কাজের অবিচ্ছেদ্য করে তোলেন। বাংলার আলপনার রেখার একটি সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ভূ-ভারতে আলপনা মূলত দুধরনেরÑ তুলনামূলক পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতের রঙ্গোলী
অথবা কোলাম এবং পূর্বভারতের আলপনা। সব ধরনের আলপনাই কৃষি সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত এবং মাটিতে দেওয়া হলেও রঙ্গোলীর সঙ্গে আলপনার পার্থ্যক্য হলো একটি শুকনো এবং অন্যটি ভেজা। রঙ্গোলী চালের গুঁড়া ব্যবহার করে করা হয় আর আলপনা চাল বেটে পানির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়। ফলে রঙ্গোলীর রেখা হয় তীক্ষè আর আলপনার রেখা হয় মোলায়েম। রঙ্গোলীর কাঠামো অনেক বেশি কৌনিক আর আলপনার কাঠামোতে থাকে বক্রতা। যোগেন চৌধুরী যেহেতু বাংলার আলপনার রেখা গ্রহণ করেছেন ফলে তার রেখার মধ্যেও বৃত্তাকার বক্রতা সুস্পষ্টভাবে লক্ষণীয়। বাংলার আলপনার রেখার জলবৎ চলন যোগেন চৌধুরীর রেখার মধ্যেও আমরা দেখতে পাই। আর এই আলপনা বিষয়টি যেহেতু শৈশব থেকে মায়ের কাছ থেকে দেখে এসেছিলেন, ফলে পরিণত বয়সে বিশ^ভারতীর কলাভবনে যখন অধ্যাপনার সূত্রে আসলেন তখন তার স্ফুরণ ঘটল। তার ছবি হয়ে উঠল একেবারেই রেখাপ্রধান। তার অবয়বগুলো শুরু থেকেই লোকশিল্পের অনুগ্রহপ্রাপ্ত ছিল। আলপনার রেখা সংস্পর্শ পেয়ে অবয়বগুলো হয়ে উঠল আরও বেশি সরল আর জৈব গুণ সম্পন্ন। যা যোগেন চৌধুরীর ছবিকে অনেক বেশি বাঙালির করে তুলল।
জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, এস এম সুলতানের মতো নন্দলাল, বিনোদ বিহারী, রামকিংকরের ধারাবাহিকতায় যোগেন চৌধুরী মতো শিল্পীরা একটা সময় ও যুগকে প্রতিনিধিত্ব করে। রাজনীতির দেশ, কাল, সময়ের গ-িতে এদের সীমাবদ্ধ করা যায় না। সম্ভবত এর কারণ এদের প্রত্যেকের জন্ম অবিভক্ত এক ভূখণ্ডে, ১৯৪৭-এর আগে। যে ভূখণ্ড তখনো রাজনীতির কূটকৌশলে বিভাজিত হয়নি। এই শিল্পীদের প্রত্যেকে সারাটা জীবন বাঙালি জাতিসত্তা এবং তার সাংস্কৃতিক পরিচয়কে শিল্পচর্চার একমাত্র শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে গেছেন। বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের রাজনীতিতে এরা ছিল এক এবং অভিন্ন। নিজ ভূমি ছেড়ে চলে যেতে হলেও সেই ভূমিকে সারাটা জীবন যোগেন চৌধুরীর মতো শিল্পীরা মনোভূমিতে লালন পালন করে রেখেছিলেন। যোগেনদা শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতীতে যখনই কোন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে পেয়েছেন, তাকেই আপন করে নিয়েছেন পরম মমতার। আজ বাংলাদেশের শিল্পজগতে যোগেন চৌধুরীর প্রয়াণবেদনার যে হাহাকার তার উৎস বাঙালি সংস্কৃতির বরপুত্র যোগেন চৌধুরীকে বাংলাদেশের মানুষ অন্তরের অন্তরস্থলে বসবাসের কারণে। দেশভাগ যোগেন চৌধুরীকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নিয়ে গেলেও তিনি পূর্ববঙ্গের মানুষের মনোভূমিতে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবেন। ২০১৬ সালে জগদ্বিখ্যাত এই শিল্পীকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ ‘জয়নুল সম্মাননা’য় ভূষিত করে।