এখনো পড়ান ড. অরুণ কুমার বসাক

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৩৯ এএম

প্রফেসর ইমেরিটাস ড. অরুণ কুমার বসাক বাংলাদেশের পদার্থবিজ্ঞান গবেষণা ও শিক্ষার একজন নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিত্ব। ১৯৪১ সালের ১৭ অক্টোবর তার জন্ম। শৈশব কেটেছে আর্থিক অনটনের মধ্যে। মা ছিলেন সৎ ও দেশপ্রেমিক আর তার আদর্শই পরে ড. বসাকের জীবনদর্শনের ভিত্তি হয়ে ওঠে। বর্তমানে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ইমেরিটাস।

১৯৬৫ সালে পাকিস্তান সরকারের মেধাবৃত্তি নিয়ে লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়ার আগে তার পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করা হয়। দীর্ঘ সাত বছর অপেক্ষার পর বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে ১৯৭২ সালে তিনি যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। সেখানে পরীক্ষামূলক নিম্নশক্তি নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞানে ১৯৭৫ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তার গবেষণাপত্রের বিষয় ছিল ‘Polarization Effects in (d,p) Reactions’। সেখানে টেনিওর-ফ্যাকাল্টি রিসার্চ ফেলো হিসেবে নিয়োগ পেলেও দেশপ্রেমের টানে বিদেশের নিশ্চিত ক্যারিয়ার ছেড়ে ১৯৭৬ সালের অক্টোবরে তিনি দেশে ফিরে আসেন।

দেশে ফিরে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও গবেষণায় নিজেকে নিবেদন করেন। শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহারিক ক্লাসে নতুন পদ্ধতি চালু করেন, যেখানে সবল শিক্ষার্থী দুর্বলদের সাহায্য করে। ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি থেকে তার লেখা ব্যবহারিক পদার্থবিজ্ঞান বইটি প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে আরও একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন।

গবেষণায় তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান ‘নন-মনোটনিক পোটেনশিয়াল’। তিনি এবং তার গবেষণা দল বিশ্বে প্রথমবারের মতো নিউক্লিয়াসের মধ্যকার বলের ক্ষেত্রে এই বিভব ব্যবহারের পথ খুলে দেন। এর সাহায্যে ফিউশন বিক্রিয়ায় ‘হিনড্রান্স’-এর ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এই কাজ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সাড়া ফেলেছে এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিষয়ে গবেষণা এখনো চলছে।

তার মোট গবেষণাপত্র ১৯৩টি। এর মধ্যে ১১৪টি আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে প্রকাশিত। আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটির খ্যাতনামা ‘Physical Review জার্নালে তার প্রায় ২৫টি প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে, এবং ‘Physical Review Letters-GI’-এও একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটির ফেলোশিপ সনদে তাকে গবেষক, শিক্ষক ও সক্ষমতা-নির্মাতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

প্রতিষ্ঠান গড়ার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা অসামান্য। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কম্পিউটার সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। তার নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভর্তি পরীক্ষা এবং হিসাব বিভাগের বার্ষিক হিসাব কম্পিউটারে সম্পন্ন হয়। পরে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা বিভাগীয় প্রধান, প্রতিষ্ঠাতা ডিন এবং কম্পিউটার সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবে শূন্য থেকে কাঠামো গড়ে তোলেন।

শিক্ষক হিসেবে তার সরাসরি তত্ত্বাবধানে ৮ জন শিক্ষার্থী পিএইচডি, ২ জন এমফিল এবং ৬৮ জন এমএসসি গবেষণা শেষ করেছেন। তার অনেক ছাত্রছাত্রী আজ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে প্রতিষ্ঠিত। তার ৮৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইন্টারডিসিপ্লিনারি রিসার্চ তাদের গবেষণা সাময়িকী ‘Varendra International Journal for Interdisciplinary Research’-এর একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে।

সততা, নিষ্ঠা, পরিশ্রম ও সরল জীবনযাপনই তার পরিচয়ের মূল কথা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত