দীর্ঘ ২৩ বছরের শিরোপা-খরা কাটানোর স্বপ্ন নিয়ে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আজ রাত ৮টায় ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে নিজেদের প্রথম ম্যাচে ভুটানের মুখোমুখি হবেন স্বাগতিকরা। ঘরের মাঠে দর্শকদের সমর্থনকে পুঁজি করে শিরোপা জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী বাংলাদেশ কোচ টমাস ডুলি। তার বিশ্বাস, এবারের দলটির সামর্থ্য আছে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটানোর। ম্যাচটি সরাসরি সম্প্রচার করবে টি স্পোর্টস।
সর্বশেষ ২০০৩ সালে সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বাংলাদেশ। এরপর কেটে গেছে ২৩ বছর। এবার আট বছর পর আবারও দেশের মাটিতে ফিরেছে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর। তাই শিরোপা পুনরুদ্ধারের এই সুযোগ কাজে লাগাতে চায় লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। বুধবার টুর্নামেন্টের আগে সংবাদ সম্মেলনে লাল-সবুজদের ব্রিটিশ কোচ টমাস ডুলি বলেন, ‘গত ২৩ বছরে হয়তো চাপ আরও বেশি ছিল। এখন আমাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস আছে যে, আমরা ভালো করতে পারব। আমার মনে হয়, ২৩ বছর পর এই দলের পক্ষে টুর্নামেন্ট জেতা বাস্তবসম্মত। এই শিরোপা আমাদের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা সবাইকে দেখাতে চাই।’
ঘরের মাঠে খেলা হওয়ায় সমর্থকদের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। দর্শকদের সমর্থন খেলোয়াড়দের বাড়তি প্রেরণা জোগাবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ কোচ। তবে সেই সমর্থনের প্রতিদান মাঠের পারফরম্যান্সেই দিতে হবে দলকে। অবশ্য প্রথম ম্যাচেই পূর্ণশক্তির দল পাচ্ছে না বাংলাদেশ। ক্লাবের ব্যস্ততার কারণে ভুটানের বিপক্ষে খেলতে পারবেন না দলের অন্যতম দুই গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলার হামজা চৌধুরী ও ফারহান আলী ওয়াহিদ। ফলে আক্রমণভাগে গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিকল্প ছাড়াই মাঠে নামতে হবে স্বাগতিকদের। হামজার অনুপস্থিতি দলের জন্য বড় ক্ষতি বলে স্বীকার করেছেন নতুন অধিনায়ক তপু বর্মণ। লেস্টার সিটির এই মিডফিল্ডারের নেতৃত্ব, অভিজ্ঞতা ও সতীর্থদের দিকনির্দেশনা দলকে অনেক সাহায্য করে বলে মনে করেন তিনি। তবে হামজার ফেরার আগে জয় উপহার দিতে চান সতীর্থদের। তপু বলেন, ‘তাকে (হামজা) আমরা অনেক মিস করব। আমাদের দলে তার মতো নেতৃত্ব খুব প্রয়োজন, বিশেষ করে যেভাবে সে সবাইকে দিকনির্দেশনা দেয়। ভুটানের বিপক্ষে জিতে আমরা তার পথটা সহজ করতে চাই, যেন সে হাসিমুখে দলে ফিরতে পারে। আমরা তাকে জয় উপহার দিয়ে স্বাগত জানাতে চাই।’ নিয়মিত অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়ার পরিবর্তে এবার নেতৃত্ব দেবেন তপু। টুর্নামেন্টে প্রথম ম্যাচের গুরুত্ব তুলে ধরে সমর্থকদের পাশে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন এই ডিফেন্ডার। তার ভাষায়, ‘টুর্নামেন্টে প্রথম ম্যাচ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা অবশ্যই জয়ের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামব। বাংলাদেশের মানুষকে ভালো একটি ফুটবল ম্যাচ উপহার দিতে চাই। ২৩ বছর পর আমাদের সামনে ভালো একটি সুযোগ এসেছে। আমরা সেটি হারাতে চাই না। সমর্থকদের কিছু ফিরিয়ে দিতে চাই, আর সেটি হলো শিরোপা।’
অধিনায়কত্বের পরিবর্তনকে খুব বড় করে দেখছেন না কোচ ডুলি। তার মতে, জামাল, হামজা ও তপুর মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রা দলের নেতৃত্বে ভূমিকা রাখেন। সেন্টারব্যাক হিসেবে তপুর অভিজ্ঞতা ও মাঠে সতীর্থদের সংগঠিত করার দক্ষতার কারণেই তাকে অধিনায়ক করা হয়েছে। টুর্নামেন্টের আগে কোনো প্রস্তুতি ম্যাচ না খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েও ব্যাখ্যা দিয়েছেন ডুলি। তার মতে, প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু খেলোয়াড়দের চোটের শঙ্কা এবং উপযুক্ত প্রতিপক্ষ না পাওয়ায় ঝুঁকি নিতে চাননি তিনি। প্রস্তুতির একপর্যায়ে তপুও পুরো ৯০ মিনিট খেলার মতো ফিট ছিলেন না। আরও কয়েকজন ফুটবলার ছোটখাটো চোট সমস্যায় ভুগছিলেন।
এবারের প্রস্তুতিতে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক এশিয়ান কাপ অভিযানে ধরা পড়া টেকনিক্যাল দুর্বলতা কাটানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন কোচ। বিশেষ করে প্রতিপক্ষের চাপের মধ্যে পাস দেওয়া ও বল নিয়ন্ত্রণে রাখার ভুলগুলো শুধরে নিতে কাজ করেছেন তিনি। অন্যদিকে প্রস্তুতি নিয়ে খুব একটা সন্তুষ্ট নয় ভুটানও। দলটির কোচ গ্যারি মাইকেল ফিলিপস জানিয়েছেন, ঘরোয়া লিগের ব্যস্ততার কারণে তারা প্রস্তুতি ম্যাচ আয়োজন করতে পারেননি। ফলে অন্যান্য দলের তুলনায় প্রস্তুতিতে পিছিয়ে রয়েছে ভুটান। দলটিতে বেশ কয়েকজন তরুণ ও অনভিজ্ঞ খেলোয়াড় থাকলেও নিজেদের সামর্থ্যরে ওপর আস্থা রাখছেন কোচ।
ভুটানের অধিনায়ক চেনচো গিয়েলতশেনও বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচ নিয়ে আশাবাদী। হামজা খেলতে না পারায় কিছুটা আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন তিনি। বাংলাদেশের এই তারকা মিডফিল্ডারের বিপক্ষে খেলার পাশাপাশি তার কাছ থেকে শেখার সুযোগ পেতে চেয়েছিলেন ভুটান অধিনায়ক। চেনচো বলেন, ‘আসলে আমি চেয়েছিলাম হামজা খেলুক। সে খেললে তার মতো একজন তারকার কাছ থেকে শেখার সুযোগ পেতাম। তবে প্রতিটি দলেরই স্বপ্ন সাফ কাপ জেতা। আমরা প্রথম ম্যাচ জিতে সেমিফাইনালের পথে নিজেদের অবস্থান নিরাপদ করতে চাই।’
বাংলাদেশের জন্য ভুটানের বিপক্ষে ম্যাচটি কেবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী লড়াই নয়, বরং ২৩ বছরের অপেক্ষা ঘোচানোর অভিযানের প্রথম ধাপ। ঘরের মাঠ, সমর্থকদের প্রত্যাশা আর শিরোপার স্বপ্ন সব মিলিয়ে বাড়তি চাপ থাকলেও আত্মবিশ্বাসী ডুলির দল। এখন সেই আত্মবিশ্বাস মাঠের খেলায় কতটা প্রতিফলিত হয়, সেটিই দেখার অপেক্ষা।