তাইজুল এখন নিজেরই ছায়া

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:২৫ এএম

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মিরপুর টেস্টের আগের দিন অনুশীলনে হঠাৎ আঙুলে চোট পান মুশফিকুর রহিম। সেদিনই তার চোটের জায়গায় স্ক্যান করায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। সেখানে কোনো সমস্যা ধরা পড়েনি। মেডিকেল বিভাগের সূত্রে জানা যায়, পরদিন খেলতে বাধা নেই অভিজ্ঞ এই ক্রিকেটারের। তবে ম্যাচের দিন অবাক করা খবর শোনা যায়। চোটের কারণে সে ম্যাচে একাদশে ছিলেন না মুশফিক। অথচ আগের দিন রাতেও ১২ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকায় তার নাম ছিল। ম্যাচটি স্পিন উইকেটে হওয়ায় টিম ম্যানেজমেন্টের সদস্যরা তাকে খেলাতে চান। কিন্তু ম্যাচের দিন সকালে দলীয় বৈঠকে নিজে না খেলার সিদ্ধান্ত জানান তিনি।

মূলত আঙুলের পুরনো চোটের জায়গায় নতুন করে আঘাত পাওয়ায় কিছুটা অস্বস্তি অনুভব করেন মুশফিক। এ কারণে শেষ পর্যন্ত ঝুঁকি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। চোট ম্যানেজ করে বা লুকিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মাঠে নামার উদাহরণ নতুন নয়। মুশফিক চাইলে খেলতেই পারতেন। যেহেতু বাংলাদেশের হয়ে এখন শুধু টেস্ট সংস্করণেই খেলছেন তিনি, সেহেতু এই ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগও ছিল তার। তবে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, ‘দেশের সঙ্গে প্রতারণা’ করবেন না জানিয়ে এ পথে নিজেই হাঁটেননি মুশফিক।

তবে ভিন্নভাবেই হয়তো ভেবেছেন তাইজুল ইসলাম। জাতীয় দলের কোচিং স্টাফের এক সদস্য জানান, আফগানিস্তানের বিপক্ষে সর্বশেষ একমাত্র টেস্টে চোটে ভোগেন এই বাঁহাতি স্পিনার। বোলিং হাতের কাঁধে ব্যথা নিয়ে আবুধাবি টেস্টে ছন্দ খুঁজে পাননি তিনি। যদিও তার এই ব্যথা আরও পুরনো বলেই জানা গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে দেশে ফিরে এমআরআই করান তাইজুল। বিসিবির মেডিকেল বিভাগের একজন সদস্য নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, ‘তাইজুল এখন সুস্থ আছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের আগে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শেষ করেছে। কাঁধে ব্যথা ছিল। তবে এটা মানিয়ে খেলা যাবে।’

তবে টিম ম্যানেজমেন্ট সূত্রে জানা গেছে, ঢাকায় ফিরে করানো পরীক্ষায় তাইজুলের কাঁধে ‘টেন্ডন টিয়ার’ ধরা পড়ে। এতে জায়গাটা ফুলে যায় এবং ব্যথা অনুভূত হয়। মূলত ‘ওভারহেড’ অ্যাকশনের কারণে এই সমস্যায় ভুগতে হচ্ছে এই বাঁহাতি স্পিনারকে। এই সমস্যা থেকে পুরোপুরি সেরে উঠতে বেশ কয়েক মাস সময় লাগবে তার। ততদিন তাসকিন আহমেদ, এবাদত হোসেনদের মতো চোট মানিয়ে খেলতে হবে তাকে। তবে সে জন্য অপেক্ষা করেননি তিনি। এর প্রভাব পড়েছে পারফরম্যান্সে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ২ ইনিংসে ৬৯ ওভার হাত ঘুরিয়ে মাত্র ১ উইকেট পান। মিরপুরে ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে ঘূর্ণি উইকেটে নির্বিষ বোলিংয়ে ৩৯ ওভারে তার শিকার ২টি। সফরকারী বাঁহাতি স্পিনার জোমেল ওয়ারিক্যান যেখানে গড়ে ৩.৬ ডিগ্রি বল টার্ন করান, একই উইকেটে তাইজুলের গড় ৩ ডিগ্রির নিচে। হারারে টেস্টের পর সাত ইনিংসে মাত্র ৫টি উইকেট পেয়েছেন তাইজুল।

খুব বেশিদিন আগের কথাও নয়। গত বছর চট্টগ্রামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে তাইজুল ৬ উইকেট নেওয়ার পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তামিম ইকবাল লেখেন, ‘এ মুহূর্তে সে বিশ্বের সবচেয়ে আন্ডাররেটেড বোলার। এখনকার অন্যান্য বোলারের পরিসংখ্যান দেখুন, তাহলে আমার কথা বুঝতে পারবেন।’ অথচ সে সিরিজের আগের ম্যাচেই সিলেটে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হারে বাংলাদেশ। স্পিনারদের জন্য সহায়ক পিচে মাত্র ২টি উইকেট পান তাইজুল। যা জিম্বাবুয়ের ওয়েসলি মাধেভেরের সঙ্গে যৌথভাবে ম্যাচের সর্বনিম্ন স্পিন পারফরম্যান্স ছিল।

ক্রিকেটের বনেদি সংস্করণ টেস্টে ২০১৪ সালে অভিষেক তাইজুলের। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশি বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উইকেট নিয়েছেন তাইজুল, মোট ২৭৫টি। যা বিশ্বের সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রাহকদের মধ্যে তাকে ৪৭তম স্থানে রেখেছে। শুধু বাঁহাতি স্পিনারদের মধ্যে পঞ্চম স্থানে রয়েছেন তিনি। ৬৪টি টেস্ট খেলা এই অভিজ্ঞ বোলার বাংলাদেশের খেলা ৬৯টি ম্যাচের মধ্যে মাত্র ১৬টি মিস করেছেন। অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান দলে না থাকায় বাংলাদেশের স্পিন আক্রমণের মূল ভরসা এখন তাইজুল।

একসময় সাকিবের আড়ালে থাকলেও সময়ের সঙ্গে নিজের সামর্থ্য ও ধারাবাহিকতা দিয়ে আলাদা অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি। তাইজুলকে এখন আর উপেক্ষিত বলার সুযোগ নেই, বরং বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করেছেন এই বাঁহাতি স্পিনার। কিন্তু পরিসংখ্যানে বেশ পিছিয়ে তিনি। তার গড় এবং স্ট্রাইক রেট হিসাব করলে বিশ্বমানের সেরা বোলারদের কাতারে অনেক পিছিয়ে। তাইজুলের অভিষেকের সময় থেকে ধরলে তার বোলিং গড় ও স্ট্রাইক রেট যথাক্রমে ১৫০তম ও ১৯৭তম। শুধু বাঁহাতি স্পিনারদের তালিকায় ৩১ ও ৩৫ নম্বর স্থানে আছেন।

তবু সাকিবের অবর্তমানে এখন টেস্টে বাংলাদেশের বাঁহাতি স্পিন একাই সামলাচ্ছেন তাইজুল। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, স্পিন বিভাগেরই নেতা তিনি। চোট নিয়েও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিলেট টেস্টে সমতায় ফেরানোর লড়াইয়ে দলের ভার তার কাঁধে। তার বিকল্পও দলে রাখেননি নির্বাচকরা। অথচ চলমান জাতীয় ক্রিকেট লিগে (এনসিএল) ৫ ম্যাচে ২৮ উইকেট নিয়ে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি বাঁহাতি স্পিনার হাসান মুরাদ। সর্বশেষ ম্যাচেও ৮ উইকেট নেন তিনি।

ঘরোয়া ক্রিকেটে এমন নিয়মিত পারফর্ম করেও উপেক্ষিত মুরাদ। ২০২৩ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথমবার টেস্ট দলে ডাক পান। এরপর আরও ৪টি সিরিজের দলে ছিলেন তিনি। সর্বশেষ গত বছর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে অভিষেকও হয় তার। এরপর টানা দলের বাইরে মুরাদ। এমনকি আরেক বাঁহাতি স্পিনার তানভীর ইসলামকেও দলে নিয়েছিলেন নির্বাচকরা। সবাইকে ছাপিয়ে চোটে পড়া তাইজুলই দেশের ক্রিকেটে বাঁহাতি স্পিনের শেষ কথা!

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত