নতুন রূপে সাজবে পতেঙ্গা-খেজুরতলা সৈকত

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৫২ পিএম

চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে খেজুরতলা পর্যন্ত প্রায় আড়াই কিলোমিটার সমুদ্রসৈকত উন্মুক্ত করে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। পতেঙ্গায় আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। অন্যদিকে খেজুরতলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ রেখে এলাকাটিকে সবুজ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণের পাশাপাশি পর্যটন থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন সুযোগ তৈরি করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।

রোববার (৮ নভেম্বর) খেজুরতলা সমুদ্রসৈকতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও নান্দনিক চট্টগ্রাম গড়ার কার্যক্রমে এসব পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউটের (এনআইএলজি) মহাপরিচালক (সচিব) মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, খেজুরতলা সমুদ্রসৈকতের আড়াই কিলোমিটার এলাকা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অনন্য। এখান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত—দুটিই উপভোগ করা যায়। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে এলাকাটিকে আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

আমিনুল ইসলাম বলেন, জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের যৌথ পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিবেশ সংরক্ষণ, ডেঙ্গু প্রতিরোধ এবং পর্যটন খাতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, তৈরি পোশাকশিল্প, কৃষি ও প্রবাসী আয়ের পাশাপাশি পর্যটন দেশের অর্থনীতির চতুর্থ বৃহৎ শক্তি হয়ে উঠতে পারে। এ জন্য আন্তর্জাতিক মানের বিশেষায়িত পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, খেজুরতলা সমুদ্রসৈকতকে বিশ্বমানের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা গেলে বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণের মাধ্যমে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ও রাজস্ব আয়ের সুযোগ তৈরি হবে।

চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন জেলা প্রশাসনের সাপ্তাহিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমকে কার্যকর উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে সহায়ক হবে। চট্টগ্রামের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর আধুনিকায়নের পাশাপাশি পুরো জেলাকে পরিচ্ছন্নতার একটি অনুকরণীয় মডেল হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, গত জুলাই থেকে চট্টগ্রামকে পরিচ্ছন্ন, সুন্দর ও পর্যটনবান্ধব করে গড়ে তুলতে জেলা প্রশাসন কাজ করছে। এরই ধারাবাহিকতায় পতেঙ্গা ও খেজুরতলা সমুদ্রসৈকতকে নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘পতেঙ্গার ওয়েস্ট পয়েন্ট থেকে খেজুরতলার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পুরো সৈকত আমরা উন্মুক্ত করতে চাই। এলাকাটিকে নান্দনিকভাবে সাজানো হবে। তবে খেজুরতলার প্রাকৃতিক সবুজ পরিবেশ যতটা সম্ভব অক্ষুণ্ণ রাখা হবে।’

জাহিদুল ইসলাম জানান, গত বৃহস্পতিবার রাতে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।

তিনি বলেন, পতেঙ্গা ও খেজুরতলায় পর্যটনের জন্য আলাদা বৈশিষ্ট্যের পরিবেশ গড়ে তোলা হবে। পতেঙ্গায় আধুনিক পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও খেজুরতলায় প্রাধান্য পাবে সবুজ পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।

খেজুরতলার পর্যটন সম্ভাবনা তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমরা এই সৈকতকে নতুনভাবে বিশ্বের কাছে পরিচিত করতে চাই। এখানকার নির্মল বাতাস, সবুজ পরিবেশ এবং সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সৌন্দর্য পর্যটকদের আকৃষ্ট করবে।’

পর্যটনকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে উল্লেখ করে জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাকশিল্পের পাশাপাশি পর্যটন থেকেও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ রয়েছে। চট্টগ্রামের সমুদ্রসৈকত ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারলে এ খাত দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

জেলা প্রশাসক বলেন, চট্টগ্রামে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে এখানকার সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দৃশ্য বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে পারলে এবং পর্যটকদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে পর্যটন খাত দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।

তবে বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। পর্যটকদের নিরাপত্তা, সেবার মান ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন জেলা প্রশাসক।

তিনি বলেন, ‘অন্যান্য দেশে বিদেশি পর্যটকদের যেভাবে সেবা দেওয়া হয়, আমাদেরও সেই মানের সেবা নিশ্চিত করতে হবে।’ এ জন্য প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ, গণমাধ্যম ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

চট্টগ্রামকে নান্দনিক রূপ দিতে বিভাগীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন যৌথভাবে কাজ করছে বলে জানান জেলা প্রশাসক। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেনের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

জাহিদুল ইসলাম বলেন, শুধু পতেঙ্গা ও খেজুরতলা নয়, চট্টগ্রামের অন্যান্য সম্ভাবনাময় ও তুলনামূলকভাবে অপরিচিত পর্যটন এলাকাকেও পর্যায়ক্রমে নতুনভাবে তুলে ধরা হবে। এসব এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত করতে গণমাধ্যমের সহযোগিতা চান তিনি।

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমরা চাই, গণমাধ্যম চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটনের সম্ভাবনাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরুক। বিশ্বের মানুষ জানুক, বাংলাদেশ কত সুন্দর একটি দেশ।’

পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ রোধে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে চট্টগ্রামে প্রতি শনিবার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে ৭ নভেম্বর রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি থাকায় এবারের কার্যক্রম এক দিন পিছিয়ে রোববার আয়োজন করা হয়।

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমরা শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করছি না, চট্টগ্রামকে নান্দনিকভাবে সাজানোর কাজও করছি। আমাদের সন্তানেরা যাতে সুন্দর পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে, সে জন্য নির্মল আনন্দের জায়গা তৈরি করতে হবে।’

মানুষ প্রকৃতিরই অংশ উল্লেখ করে জাহিদুল ইসলাম বলেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সংরক্ষণ ও তা উপভোগের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন। সেই লক্ষ্য থেকেই খেজুরতলাকে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

খেজুরতলা সমুদ্রসৈকতকে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগকে পর্যটন উন্নয়নের নতুন যাত্রা হিসেবে উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আজকে আমাদের একটি নতুন যাত্রা শুরু হলো। আমরা শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নয়, এই সমুদ্রসৈকতকে কীভাবে সুন্দরভাবে সাজানো যায়, তা নিয়েও কাজ করব। বিশ্বের পর্যটকদের এখানে আসার আহ্বান জানাব।’

চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে এবং পর্যটনবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে জেলা প্রশাসনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত