দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না। আনা যায় না ঘরে। রাখা যায় না ব্যাংকে। তবু সেটি মুদ্রা! ইন্টারনেট দুনিয়ায় দিনকে দিন এই মুদ্রার লেনদেন বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি ফেইসবুকও ঘোষণা দিয়েছে ২০২০ সাল নাগাদ তারা নিজস্ব ক্রিপটোকারেন্সি বা ভার্চুয়াল মুদ্রা লিবরার প্রচলন শুরু করবে। রহস্যময় এই মুদ্রার বিস্তারিত জানাচ্ছেন অমৃত মলঙ্গী
মনে করুন, আপনার কাছে এক লাখ টাকা আছে। আপনি সেগুলো ব্যাংকে রাখতে চান না। আবার নিজের কাছেও রাখতে চান না। এমন একটা স্থানে রাখতে চান, যেখান থেকে যেকোনো সময় নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে অনলাইনে কেনাকাটা করতে পারবেন, অর্থের মান আবার হঠাৎ করে কয়েক গুণ বাড়ার সম্ভাবনাও থাকবে। এটি করতে হলে ওই এক লাখ টাকা দিয়ে আপনাকে ভার্চুয়াল মুদ্রা কিনতে হবে।
বাংলাদেশের মুদ্রার নাম যেমন টাকা, আমেরিকার যেমন ডলার, ভারতের যেমন রুপি ভার্চুয়াল মুদ্রারও আলাদা নাম আছে। সবচেয়ে জনপ্রিয় মুদ্রার নাম বিটকয়েন। সম্প্রতি যোগ হয়েছে ফেইসবুকের লিবরা। এমন প্রায় এক হাজার মুদ্রা প্রচলিত আছে।
এটি মূলত ডিজিটাল মানি। অর্থাৎ অনলাইনে আপনার অ্যাকাউন্ট থাকবে, সেই অ্যাকাউন্টে ডিজিটাল কোডের মাধ্যমে আপনার মুদ্রা সংরক্ষিত থাকবে।
লিবরা জমা রাখতে ফেইসবুক কর্র্তৃপক্ষ ‘ক্যালিব্রা’ নামে একটি সাবসিডিয়ারি চালু করেছে, যা ডিজিটাল ওয়ালেট হিসেবে ভার্চুয়াল মুদ্রা সংরক্ষণ, আদান-প্রদান ও খরচ করার সুবিধা দেবে। ক্যালিব্রা ফেইসবুকের কয়েক শ কোটি ব্যবহারকারীর মেসেজিং প্ল্যাটফরমের মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। বিটকয়েনের জন্যও এমন আলাদা ওয়ালেট আছে।
যেভাবে হয় লেনদেন
ভার্চুয়াল মুদ্রা লেনদেনের জন্য কোনো ব্যাংকিং ব্যবস্থা নেই। ইলেকট্রনিক মাধ্যমে অনলাইনে দুজন ব্যবহারকারীর মধ্যে সরাসরি (পিয়ার-টু-পিয়ার) আদান-প্রদান হয়। লেনদেনের নিরাপত্তার জন্য ব্যবহার করা হয় ক্রিপ্টোগ্রাফি নামের একটি পদ্ধতি। এই পদ্ধতির কারণে আপনার লেনদেনের খবর অন্য কেউ জানতে পারে না।
দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালে প্রথম ভার্চুয়াল মুদ্রার প্রচলন শুরু করেন সাতোশি নাকামোতো ছদ্মনামের এক সফটওয়্যার ডেভেলপার। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের সময় ব্যবহার করা ক্রিপ্টোগ্রাফি পদ্ধতির সাহায্য নেন তিনি। ওই সময় এই পদ্ধতিতে সেনারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। আধুনিক যুগে গাণিতিক তত্ত্ব এবং কম্পিউটার বিজ্ঞান ব্যবহার করায় এই ক্রিপ্টোগ্রাফি পদ্ধতি আরও উন্নত হয়েছে, যার কারণে ভার্চুয়াল মুদ্রা ব্যবহারকারীর সব তথ্য গোপন থাকে।

যেভাবে ব্যবহার করা হয়
সংশ্লিষ্ট মুদ্রার অ্যাপ নামিয়ে কিংবা তাদের ওয়েবসাইটে গিয়ে নিবন্ধন করে এর ব্যবহার শুরু করতে হয়। আপনার অ্যাকাউন্ট চালু হয়ে গেলে টাকার বিনিময়ে সেখানে বিটকয়েন জমা করতে পারেন।
ফেইসবুক তাদের লিবরা ব্যবহার করার জন্য মাস্টার কার্ড, পেপাল, ভিসা, ভোডাফোন, উবারের মতো বিশ^খ্যাত ২৭টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে। অর্থাৎ আপনি যদি টাকার বিনিময়ে লিবরা নিজের অ্যাকাউন্টে নিয়ে রাখেন, তবে এক ক্লিকে উবারের ভাড়া দিয়ে দিতে পারেন। কোনো দেশের কিংবা বৈশি^ক বাধ্যবাধকতা না থাকায় আপনার টাকাকে লিবরায় পরিবর্তন করতে খুব বেশি খরচ হবে না। লেনদেনের সময় অল্প কিছু অর্থ ফেইসবুক হয়তো কাটবে। তবে এখানে ব্যাপার হলো, লেনদেনে আপনার অল্প অর্থ গেলেও অসংখ্য লিবরা ব্যবহারকারীর থেকে প্রচুর অর্থ কামিয়ে নেবে ফেইসবুক।
ঠিক একইভাবে বিটকয়েনের সঙ্গেও মাইক্রোসফটের মতো নামিদামি শত শত প্রতিষ্ঠানের চুক্তি আছে। এই মুদ্রা ব্যবহার করে সেখান থেকে কেনাকাটা করা যায়। বিটকয়েন ব্যবহারের নির্দিষ্ট হিসাব ব্যবস্থা রয়েছে। সেটি অনুসরণ করে তাদের বাজারদর ওঠানামা করে। বর্তমানে বিটকয়েন ছাড়া এথেরিয়াম, রিপল, লাইটকয়েন মুদ্রাও বেশ জনপ্রিয়।
সুবিধা-অসুবিধা
ব্যাংকিং পদ্ধতির মতো ভার্চুয়াল মুদ্রার ব্যবহার জটিল না হওয়ায় এর জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। এটি ব্যবহার করে রাতারাতি লাখপতি হওয়ার নজির আছে।
২০১১ সালে এরিক ফিনম্যান নামে এক ১২ বছর বয়সী কিশোর ১২ ডলারের বিটকয়েন কিনে এক হাজার ডলারে অন্যের কাছে বিক্রি করে দেয়। তার কাছে এখন ৪০৩টির মতো বিটকয়েন আছে। যার বাজারদর কয়েক কোটি টাকা! বিটকয়েন যত বেশি বেশি লেনদেন হয়, বাজারদর তত ওঠানামা করে।
এমনটি যেভাবে হয়
কারও কাছে যদি বিটকয়েন থাকে, যা সে পাঁচ শ ডলার দিয়ে কিনেছে এবং সেটা যদি সে ১৯ হাজার ডলারে বিক্রি করতে চায়, শুধু সেই দামেই সেটি কিনতে হবে। কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক এর সঙ্গে জড়িত না থাকায় একজন ব্যবহারকারী এভাবে বিটকয়েন লেনদেন করতে পারেন। অর্থাৎ তার ইচ্ছা না হলে বিক্রি করবেন না। বালক ফিনম্যান তার দাদির কাছে ১২ ডলারের বিটকয়েন ১ হাজার ডলারে বিক্রি করে। এরপর ধীরে ধীরে আরও বিটকয়েন জমা করেছে সে।
বিটকয়েনের বাজারদর মারাত্মকভাবে ওঠানামা করে বলে একে ‘জুয়াখেলা’র সঙ্গে তুলনা করা হয়। বিটকয়েন ভগ্নাংশ আকারেও কেনা যায়। একসময় এর দাম ছিল ১০০ ডলার। এক বছরের মধ্যে তা বেড়ে হয় ১ হাজার ডলার। এরপর দাম ১৯ হাজার ডলারেও উঠে গিয়েছিল। এই আর্টিকেল লেখার সময় এক বিটকয়েনের দাম ছিল ৯ হাজার ২৪১ মার্কিন ডলার বা ৭ লাখ ৭৮ হাজার টাকা।
বাংলাদেশে ব্যবহার
ভার্চুয়াল মুদ্রা ব্যবহার করতে দেশভেদে একাধিক অ্যাপের প্রচলন দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কয়েকটি ওয়েবসাইট ব্যবহার করে বাংলাদেশ থেকে এগুলো কেনা যায়। এ জন্য বিকাশ, রকেট কিংবা নগদে টাকা পরিশোধ করা যায়। এই ধরনের লেনদেন বাংলাদেশ ব্যাংক সমর্থন করে না। দেশে ভার্চুয়াল মুদ্রা চালুর ব্যাপারে কয়েকবার আলোচনা হলেও বিটকয়েন কিংবা অন্য মুদা ব্যবহার না করতে বলা হয়েছে। এগুলো কোনো ব্যাংক বা কোনো দেশের জারি করা মুদ্রা নয় বলে এমন সিদ্ধান্তে এখনো অটল আছে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এই সতর্কতার আরও কারণ আছে। হঠাৎ করে এর পেছনের লোকরা বাজার থেকে সরে গেলে বিনিয়োগকারীরা বিপদে পড়বেন। তা ছাড়া শেয়ারবাজারের মতো হুটহাট দাম পড়ে যাওয়ায় মারাত্মক ঝুঁকি থেকে যায়।
এ ছাড়া অনেক সময় হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে এই মুদ্রা চুরি হয়ে যেতে পারে। অন্য দেশে বসে কেউ অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে আপনার জমানো মুদ্রা নিয়ে যেতে পারে। বিশ^জুড়ে একাধিকবার এমন ঘটনা ঘটেছে।
বিটকয়েন কি অসীম সংখ্যক
এতক্ষণের আলোচনা শুনে আপনার মনে হতে পারে বিটকয়েনের মালিকানা প্রতিষ্ঠান যত খুশি, তত বিটকয়েন প্রস্তুত করে বিক্রি করতে পারে। ব্যাপারটি কিন্তু মোটেই তা নয়। ব্যবহার সীমাবদ্ধ বলেই এর জনপ্রিয়তা এত।
বিটকয়েনের উদ্ভাবক আগেই ঠিক করেছেন সর্বোচ্চ ২১ মিলিয়ন বিটকয়েন তৈরি করা যাবে। একটি অ্যালগরিদমের মাধ্যমে এটি ঠিক করা হয়েছে। এভাবে বিটকয়েন সীমাবদ্ধ করা হয়েছে বলে এর দর ওঠানামা করে। তাতে ক্রেতাদের একটা আগ্রহ থাকে।
বিটকয়েন তৈরির উপায়কে বলা হয় ‘মাইনিং’। মূলত স্বর্ণখনি থেকে মাটি খুঁড়ে স্বর্ণ তুলে আনার মতোই কঠিন কাজ বিটকয়েন মাইনিং, তাই এই নাম দেওয়া। যে বিটকয়েন ‘মাইনিং’ করে তাকে ‘বিটমাইনার’ বলে। মাইনার বিশেষায়িত হার্ডওয়্যারে চালানো কম্পিউটার প্রোগ্রাম ব্যবহার করে ‘মাইনিং’ করে থাকেন। সারা বিশে^ এমন হাজার হাজার ‘মাইনার’ আছেন। কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ে আপনি দক্ষ হলে মাইনার হিসেবে বিটকয়েন প্রস্তুত করতে পারবেন। আর করতে না পারলে অন্যের কাছ থেকে প্রচলিত মুদ্রার বিনিময়ে কিনে ব্যবহার করতে হবে।
