বাড়িতে প্রবেশ করার পর সবার আগে চোখে পড়বে সমবয়সীদের সাথে খেলা করছে পাঁচ বছরের শিশু রামিশা তাবাসসুম ইলমা। সমবয়সীদের সাথে খেলা করে পার করে দিন চলে যায় ইলমার। বাবা কথা মনে থাকে না তখন। সারাদিন বাবাকে ভুলে থাকলেও সন্ধার সাথে সাথে ঠিকই মনে পড়ে তার। অপেক্ষায় থাকে কখন বাবা পাউরুটি নিয়ে আসবে। সেই পাউরুটি খেয়েই রাতে ঘুমাতে যাবে ইলমা। বাবা আসছে না দেখে সবার কাছে তার একটাই প্রশ্ন কখন আসবে বাবা? তার এই ছোট প্রশ্নের উত্তর পরিবারের কোনো সদস্যেরেই জানা নেই। কারণ না ফেরার দেশে চলে গেছে ইলমার বাবা জাকির হোসেন।
শিশু রামিশা তাবাসসুম ইলমার বাবা জাকির হোসেন রানা (৩২) গত ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।
স্থানীয়রা জানান, গত ৫ আগস্ট ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পল্লীবিদ্যুৎ মোড় এলাকায় জাকির হোসেন গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। ছাত্রজনতার আন্দোলনের ভিরে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে লুটিয়ে মহাসড়কে পড়ে ছিলেন দীর্ঘক্ষণ। পরে এক ফাঁকে অন্যরা আরও ৪ জন গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিসহ তাকে উদ্ধার করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালে নিয়ে গেলে দায়িত্বরত চিকিৎসক জাকিরকে মৃত ঘোষণা করেন।
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা ইউনিয়নের কপাটিয়াপাড়া গ্রামের জামাল উদ্দীন দয়ালের ছেলে পোশাক শ্রমিক জাকির হোসেন রানা। পরিবারের ৫ সদস্য নিয়ে জামাল উদ্দীন দয়ালের ছোট্ট পরিবার। এ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিল ছেলে জাকির। পাশের ঢাকা ফারিস্ট গার্মেন্টসে কোয়ালিটি অফিসার হিসাবে চাকরি করতেন জাকির। অসুস্থ বাবা, মা, স্ত্রী ও এক মাত্র মেয়ে ইলমাকে নিয়ে ছিল তার দুনিয়া।
স্বজনরা জানান, জাকির হোসেন দেখতে নায়কের মত ছিল। এলাকায় সবাই তাকে খুব আদর করত। তার বাবাও এক সময় সংসারের হাল ধরতে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা চালাতেন। পরে অসুস্থ হয়ে পড়লে অটো চালানো ছেড়ে দেন। ছেলের আয়েই তাদের সংসার চলত। এখন পুরো সংসারই অথৈ সাগরে পড়ে গেছে। জাকিরের স্ত্রী বাড়িতে সেলাই কাজ করে সামান্য আয় করে তাতে এখন কোনো মতে টেনেটুনে চলছে সংসার। মেয়েকে পাশের একটি কেজি স্কুলে শিশু শ্রেণিতে ভর্তি করেছে। এখনত তার পড়াশুনাও করা কঠিন হয়ে পড়বে।
নিহত জাকিরের স্ত্রী মনি আক্তার বলেন, ‘ঘটনার দিন দুপুরের পর একটা ফোন পেয়ে বাড়ি থেকে বের হযে যান ইলমার বাবা। পরে সন্ধ্যায় খবর আসে সে গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসতালে মৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এমন খবর পেয়ে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। তিনি বলেন ইলমা তার বাবার জন্য খুব পাগল। প্রতিদিন সকালে তার আবদার থাকতো রাতে পাউরুটি নিয়ে আসতে হবে। তার বাবাও প্রতিদিন রাতে পাউরুটি নিয়ে আসতেন। পরে রাতে সেই রুটি খেয়ে ঘুমাতে যেত ইলমা।’
তিনি আরও বলেন, ‘সারাদিন কাটে খেলেধূলা করে কিন্তু রাত হলেই ইলামা এখনো পাউরুটির আবদার করে। তখন আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারিনা। তাকে বলি তোমার বাবা চলে আসবে। কিন্তু আর কোনো দিন তার বাবার হাতে আনা পাউরুটি তার কপালে জুটবে না। বাবার হাতে যত্ন করে পাউরুটি খেয়ে ঘুমাতে পারবে না ইলমা। খুব জেদ ধরলে মোবাইলে তার বাবার ছবি দেখাতে হয়। বলতে হয় রাতে পাউরুটি নিয়ে আসবে তোমার বাবা। এমনভাবে বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন জাকিরের স্ত্রী মনি আক্তার।’
নিহত জাকিরের বাবা জামাল উদ্দীন দয়াল বলেন, ’৪ আগস্ট জাকিরদের কারখানাও বন্ধ করে দেওয়া হয়। সে কারণে বাড়িতে ছিল । সারা দিন পাশের মোড়ে আড্ডা দিয়ে রাতে বাড়ি আসে। পরের দিন (৫ আগস্ট) দুপুরে জাকিরকে একজন ফোন করে। ফোন পেয়ে দুপুর পৌনে ৩টার দিকে জাকির শার্ট গায়ে দিতে দিতে বাড়ি থেকে খুব দ্রুত বের হয়ে যায়। এরপর বিকেলের দিকে ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে খবর পান।
তিনি বলেন, ‘আমার নাতনীর দিকে তাকাতে পারিনা। ছেলের বউয়ের দিকে তাকাতে পারি না। রাত হলেই নাতী ইলমা বাবার হাতের পাউরুটির আবদার করে বসে। এ সময় আমরা সবাই কান্নাকাটিতে পড়ে যাই। আল্লাহ কি পরীক্ষায় আমাদের ফেললেন। এখন আমাদের দুবেলা ভাত ডালের ব্যবস্থাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্বজনরা আরও জানান, জাকিরের দাফন হয়েছে তাদের বাড়ির পূর্ব দিকে সড়কের পাশে লিচু গাছের নিচে। ঘরের বারান্দায় বসে কবর দেখা যায়। মেয়ে ইলমা অন্য শিশুদের সাথে খেলা করার ফাঁকে ফাঁকে উকি দিয়ে বাবার কবর দেখে। সে জানে তার বাবা মারা গেছে । কবরে শুয়ে আছে। তবে মারা যাওয়ার ব্যাখ্যা সে করতে পারে না। তার দাবি রাতে বাবা আসবে পাউরুটি নিয়ে। রুটি খেয়ে সে ঘুমাতে যাবে।’