পড়ালেখার পাশাপাশি রাজধানীর মিরপুরের একটি কসমেটিকসের দোকানে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করেন তামান্না ইসলাম (ছদ্মনাম)। বয়স ২১ বছর। অন্যান্য দিনের মতো দোকান থেকে বাসায় যখন ফিরছিলেন, তখন তুরাগ নদে ধর্ষণের শিকার হন তিনি। এ ঘটনায় মামলা হলে আসামি মোসলেম মোল্লা (৪০) ও সেলিমকে (৩৮) গ্রেপ্তার করে নৌ-পুলিশ। আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিলেও এখন জামিনে আছে ধর্ষকরা।
আসামিরা ভুক্তভোগী পরিবারকে নানাভাবে হয়রানি করছে, মোবাইলে গালাগালি ও হত্যার হুমকি দিচ্ছে, বাড়ির সামনে ও পথেঘাটে তাদের সম্মানহানির চেষ্টা করছে। এদিকে এ মামলার সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা নৌ-পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) আজিজুল হকের এক ফোনকলে শোনা গেছে, ‘টাকা না দিলে মামলা হালকা করে দেওয়া হবে। আসামিপক্ষ অনেক টাকা নিয়ে বসে আছে। টাকা ছাড়া মামলা চালানো যায় নাকি।’
ভুক্তভোগীর বাবা অভিযোগ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার মেয়ে ধর্ষিত হয়েছে। মামলা করলে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়। তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় ধর্ষণের বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। কিন্তু এখন তারা জামিনে আছে। ধর্ষিত হলো আমার মেয়ে, অথচ নানা হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে আমাদের। আসামিরা পথেঘাটে সম্মান নষ্ট করছে, মোবাইলে বিভিন্ন নম্বর থেকে ফোন করে গালাগালি ও হত্যার হুমকি দিচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘এ মামলার সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আজিজুল হক বিভিন্ন সময় টাকার কথা বলতেন। আসামি ধরতে টাকা খরচ হয়েছে, এখান থেকে সেখানে দৌড়াতে টাকা খরচ হয়েছে বলেও জানান। তাকে একবার বিকাশে ৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। ওই এসআই ৩ লাখ টাকা দবি করেন। আসামিপক্ষ নাকি অনেক টাকা নিয়ে বসে আছে। টাকা না দিতে পারলে মামলা হালকা করে দেওয়ার কথাও বলেছেন এসআই।’
ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে এসআইর ফোন আলাপে শোনা গেছে, ‘মামলার বিষয়ে সরাসরি কথা বলতে হবে। মামলার দায়ভার কি আমি (এসআই) নেব? খুলনা থেকে আসামি ধরতে ১৩ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। মামলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ১৬ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ভুক্তভোগীর শ্বশুর মাত্র ৫ হাজার টাকা পাঠিয়েছে। আসামিপক্ষ আমার পেছনে টাকা নিয়ে ঘুরছে। তারা ৩ লাখ টাকা অফার করেছে। ভুক্তভোগী টাকা না দিলে মামলা হালকা হয়ে যাবে। যাই হোক, এ মামলার পেছনে আমার যে টাকা খরচ হয়েছে, সেটা তো আমি আশা করতেই পারি। আজও একটা স্পিডবোট নিয়ে যাচ্ছে। একটা স্পিডবোট নিয়ে যেতে খরচ হয় ১৮০০-১৯০০ টাকা। মামলার বিষয়ে অভ্যন্তরীণ কথা আছে। সেগুলো দেখা হলে বলব।’
এজাহারে ভুক্তভোগী উল্লেখ করেন, তিনি একজন ছাত্রী। পাশাপাশি একটি কসমেটিকসের দোকানে বিক্রয়কর্মী হিসেবে ঢাকায় চাকরি করেন। গত ২৭ জানুয়ারি রাত ৯টা ৪০ মিনিটে কর্মস্থল থেকে বাসায় ফেরার জন্য রওনা দেন। রাত ১০টা ২০ মিনিটে সাভার মডেল থানাধীন বেগুনবাড়ি গুদারাঘাট থেকে পাঁচকানিঘাট, কাউন্দিয়া যাওয়ার ডিঙি নৌকায় ওঠেন। নৌকায় মোসলেম মোল্লা যাত্রী ও সেলিম মাঝি হিসেবে ছিল। তারা পরস্পর কথা বলতে থাকে ও নৌকা মাঝনদীতে পৌঁছলে মোসলেম তার মুখ চেপে স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করতে থাকে। চিৎকার দিয়ে নিজেকে রক্ষা করার জন্য চেষ্টা করেন তিনি। পরে ডিঙি নৌকার মাঝি সেলিম হুমকি দিয়ে বলে, চিৎকার দিলে মেরে নদীতে ফেলে দেব। পরে তারা জোরপূর্বক তাকে ধর্ষণ করে। তখন তিনি অচেতন হয়ে যান। অচেতন অবস্থাতেই ধর্ষকরা তাকে নসুমপুর মসজিদ ঘাটে ফেলে রেখে চলে গেলে রাতে (পরে জেনেছেন তখন রাত ১২টা ১৫ মিনিট) স্বামী ও শ্বশুর উদ্ধার করেন তাকে।
টাকা না দিলে মামলা হালকা করে দেওয়ার বিষয়টি মিথ্যা দাবি করে এ মামলার সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা আজিজুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসামিদের আমি খুলনা থেকে গ্রেপ্তার করেছি। পরে তাদের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে ও তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। ডিএনএ টেস্টের জন্য চার্জশিট জমা দিতে দেওয়া হয়নি। আসামিরা যে জামিনে আছে, তা সম্পূর্ণ আদালতের বিষয়। আমার বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীর পরিবার মিথ্যা তথ্য দিয়েছে। তাই এ মামলা থেকে আমাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।’
